গত মাসের শুরুর দিকে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত কিউএস বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিংয়ে বলা হয়েছে, গত বছরের মতো এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানের কোনো উন্নতি হয়নি। বৈশ্বিক এই র‌্যাংকিংয়ের অবস্থান ৮০১-১০০০-এর স্তরে। উল্লেখ্য যে, ২০১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৬০১-এর স্তরে ছিল, যেখান থেকে ২০১৪ সালে এর অবনমন ঘটে ৭০১-এর স্তরে, ২০১৯-এ আরও অবনমন ঘটে। অথচ গত শতাব্দীর বিশ ও ত্রিশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে 'অক্সফোর্ড অব দ্য ইস্ট' বা 'প্রাচ্যের অক্সফোর্ড' বলা হতো। যারা এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই ব্রিটিশ শাসকরাই এটিকে 'প্রাচ্যের অক্সফোর্ড' বলতেন। কেননা, কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একদম স্বতন্ত্রভাবে গড়ে তোলা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। লন্ডনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে আবাসিক ও টিউটোরিয়াল পদ্ধতিসমেত পূর্ববঙ্গের ঢাকায় এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। 

আমার অনুজপ্রতিম এক অধ্যাপক একান্ত আলাপচারিতায় বেশ রাগত স্বরেই আমাকে প্রশ্ন করলেন, র‌্যাংকিং দিয়ে কী হবে ভাই? আপনি যদি বিদেশি মেধাবী শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করতে চান এবং প্রত্যাশা করেন যে, বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের গন্তব্য হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তাহলে আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য র‌্যাংকিং প্রয়োজন। কেননা, বিভিন্ন দেশের বিদেশগামী শিক্ষার্থী ও গবেষকরা কোন দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন, সেটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে র‌্যাংকিং একটি কার্যকর মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। 

মানতেই হবে যে, অনুজপ্রতিম অধ্যাপকের যুক্তি অকাট্য। আপনি যদি বিভিন্ন দেশের মেধাবী শিক্ষার্থী ও গবেষকদের আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখতে না চান, তাহলে র‌্যাংকিং দিয়ে আপনি কী করবেন? তবে কিউএস র‌্যাংকিংয়ের আরও নানা গুরুত্ব আছে বলে আমি মনে করি। কেননা, কিউএস প্রতিবছর যেসব মানদণ্ডের ভিত্তিতে র‌্যাংকিং প্রকাশ করে, সেগুলো হচ্ছে- বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা, উদ্ভাবন, চাকরিতে স্নাতকদের কর্মক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক, গবেষণা প্রবন্ধের সাইটেশন, পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক-কর্মকর্তার সংখ্যা, আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী বিনিময়ের হার। এতে করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক মূল্যায়ন যেমন হয়, তেমনি মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি ও সামর্থ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। 

দুই.  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল পূর্ববঙ্গের দরিদ্র, বৈষম্যপীড়িত ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জন্য এক নাক্ষত্রিক আলোকবর্তিকা, যার আলোতে শুধু হতদরিদ্র মুসলমানেরাই উপকৃত হয়নি; গরিব হিন্দু এবং অবরুদ্ধ নারীরাও অবগুণ্ঠনের আড়াল অতিক্রম করে উদার বিশ্বের সুপরিসর জমিনে এসে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠতে শুরু করে একটি বৌদ্ধিক গোষ্ঠী এবং এ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকরাই পরে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করেন। 

সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন, 'আধুনিক বাঙালি মুসলমানের উচ্চশিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তির ইতিহাস যদি রচনা করতে হয়, তাহলে তার শুরু করতে হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হল বা সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ইতিহাস থেকে... ১৯২১ সালে যেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়- মুসলিম হলের জন্ম হয়, সেদিন থেকে পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমানের অতি ক্ষুত্র অংশের মধ্যে জ্ঞানবিভাসিত যুগের সূচনা হয়।'  মহাত্মা এই লেখক ও গবেষক লিখেছেন, 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যে কোনো একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে অবমূল্যায়ন করা হবে... ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ও চেতনার নাম।' (সৈয়দ আবুল মকসুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা।)

তিন. 

২০২১ সালের কিউএস র‌্যাংকিংয়ে দেখা যাচ্ছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ভারতের আইআইটির (দি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি) অবস্থান ১৭৭তম। তালিকার শীর্ষ ৫০০-এর মধ্যে ভারতের আটটি ও পাকিস্তানের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, নেই কেন? অথচ বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে সমগ্র ভারত উপমহাদেশ, মিয়ানমার (তখনকার বার্মা) ও শ্রীলঙ্কাসহ বিস্তৃত এক ভূখণ্ডের কলোনিয়াল মাস্টার ছিল ব্রিটিশ রাজ। ওই সময়ে ঔপনিবেশিক শাসকেরা ভারতে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় ও বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয়। ওই তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যান্ত্রিক পরীক্ষা পদ্ধতি, পড়ানোর কায়দা-কানুন, 'লার্নিং আউটকাম' বা উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য ও ফল নিয়ে ব্রিটিশ শাসকরা খুব সন্তুষ্ট ছিলেন না। ফলে তারা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ধাঁচে ভারতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার প্রয়াস পান। সেই বিশ্বদ্যিালয়টিই হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

ঊনবিংশ শতাব্দী জুড়েই উপমহাদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে নানা রকম এক্সপেরিমেন্ট হয়েছে। ব্রিটিশ শাসকদের উদারপন্থিরা ভেবেছিলেন, নব-প্রতিষ্ঠিত উচ্চশিক্ষা উঁচুমানের মহৎ মানুষ তৈরি করবে; কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিতদের মূল লক্ষ্য উত্তম একটি চাকরি। চরিত্রের দিক দিয়ে এই উচ্চশিক্ষিতরা ছিলেন সুবিধাবাদী এবং দুর্নীতির 'সুবাস' পেলে নীতি বিসর্জন দিতেও তাদের কোনো কুণ্ঠা ছিল না।

আদতেই ইংরেজ-প্রবর্তিত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থ বিদ্যাই প্রধান হয়ে ওঠে। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা অর্জিত জ্ঞানকে চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা হিসেবে ব্যবহার করেন; জনমানুষ ও সমাজের কল্যাণে তাদের মেধা ও উচ্চশিক্ষা কোনো কাজে আসেনি বললেই চলে। লর্ড কার্জনের কথায় এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা প্রতিফলিত হলে, সেটি প্রশংসিত না হয়ে উষ্ফ্মা ও বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে এটি কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। লর্ড কার্জন উচ্চশিক্ষাকে সংখ্যায় বিস্তৃত না করে, মানের দিক দিয়ে এটিকে উঁচু ও মহৎ করতে চেয়েছিলেন। 

চার. 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য ও ভারতকেন্দ্রিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত করা ও সুদূরপ্রসারী রূপকল্প নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি আদর্শ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বারংবার যে নামটি আসবে, সেই নমস্য ব্যক্তি হচ্ছেন স্যার ফিলিপ হার্টগ। মনে রাখতে হবে, তিনি ছিলেন তার সময়ের সমগ্র কমনওয়েলথ দেশগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংগঠক। তার দৃঢ় প্রত্যয় ছিল- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তৎকালীন কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুলিপি হবে না, হবে ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চেয়ে উচ্চতর প্রতিষ্ঠান। আধুনিক ও যুগোপযোগী একটি পাঠ্যক্রম তৈরির ব্যাপারে তিনি ভারতীয় ও পশ্চিমের শিক্ষাবিদদের পরামর্শ গ্রহণ করেন। শুধু ইংলিশ শিক্ষাব্যবস্থা নয়- ফরাসি ও জার্মান উচ্চশিক্ষার ব্যাপারেও তার অভিজ্ঞতা থাকায় হার্টগ তার সেরাটা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি শক্ত ভিত্তি প্রদান করতে সক্ষম হয়েছিলেন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য স্যার ফিলিপ হার্টগ লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক রেজিস্ট্রারের দায়িত্বও পালন করেছিলেন। স্যার ফিলিপ হার্টগ এবং পুরাতাত্ত্বিক ও ইতিহাস বিষয়ক লেখক এইচ ই স্টেপলটন সুস্পষ্ট করেই বলেছিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলবে অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মকানুন অনুযায়ী। নন্দিত ও উদারমনা একদল ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা প্রশাসক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে 'অক্সফোর্ড অব দ্য ইস্ট' বলে অভিহিত করা শুরু করেন। একশ বছর পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য যখন মুখ থুবড়ে পড়েছে; শিক্ষা ও গবেষণার মান যখন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে; এবং জাতির গণতান্ত্রিক ও সুশাসনের সংকটে বিশ্ববিদ্যালয় তার কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখনই তৈরি হয়েছে শতবর্ষী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেজ সংকট।  

১৯২১ সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই এটি কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা ছিল। অবকাঠামো, উচ্চশিক্ষার দর্শন, পরীক্ষা পদ্ধতি, আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় ও এর অনন্য টিউটোরিয়াল সিস্টেমের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃত অর্থেই ভারতের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে অনুসরণীয় হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত- প্রতিষ্ঠার প্রথম ৫০ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার মূল কাজ, অর্থাৎ মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণা ঠিক রেখে আরও অনন্য যে কাজগুলো করেছে, সেগুলো হচ্ছে- অনগ্রসর পূর্ববঙ্গের দরিদ্র মুসলিম কৃষক ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিয়ে একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে তোলা, জাতিসত্তার বিকাশ ঘটানো, নারীশিক্ষার ভিত্তি স্থাপন, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার বিকাশে অনুঘটকের ভূমিকা পালন ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবনমন শুরু হয়। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ৫০ বছর ছিল গৌরবের, অর্জনের, উন্মেষ ও বিকাশের; কিন্তু পরের ৫০ বছর অবনমন, পতন ও অবক্ষয়ের। তবে যে বিশ্ববিদ্যালয় অর্ধশতাব্দী ধরে উচ্চশিক্ষার মধ্য দিয়ে পিছিয়ে পড়া এক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষাদীক্ষা, জাতিসত্তার বিকাশ, রাষ্ট্রচিন্তা, সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা ও বিশ্ববোধে ঋদ্ধ করেছে; সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘুরে দাঁড়াবার ক্ষমতাটি নিঃশেষ হয়ে যায়নি বলে মনে হয়।                                       

অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন