রংপুর বিভাগের আট জেলার মানুষের চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির বড় কেন্দ্র রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতাল। প্রতিদিন অসংখ্য রোগী ভর্তি হন এ হাসপাতালে। অতিরিক্ত রোগীর চাপে বেড না পেয়ে হাসপাতালের মেঝে কিংবা বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নেন অনেকেই। এটি খুব বেশি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন নয়; হাসপাতালজুড়ে দুর্গন্ধ। নানাবিধ স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর্যাপ্ত উপকরণ থাকলেও রোগীরা তা থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত। ওষুধও কিনতে হয় বাইরে থেকে। রমেক হাসপাতালের এ ধরনের সংকট, সীমাবদ্ধতা ও সংকীর্ণতা মেনে নিয়েই রোগীরা সেখানে ভর্তি হন, চিকিৎসা নেন। কিন্তু এ হাসপাতালে নিত্যই কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। এগুলো অনেকটা 'ওপেন সিক্রেট'। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রমেকের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যন্ত পদে পদে অসদাচরণের শিকার হতে হয় রোগী ও রোগীর স্বজনদের। হাসপাতালের এক শ্রেণির কর্মচারী অনৈতিকভাবে রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে মুখিয়ে থাকেন। অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে নানাভাবে হয়রানি করেন কর্মচারীরা। অনেক সময় মারধরের ঘটনাও ঘটে। গত ১১ জুন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ূয়া দুই ভাই গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর থেকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছিলেন অসুস্থ মাকে নিয়ে। হাসপাতালে ভর্তি ফি ৩০ টাকা হলেও জোর করে জরুরি বিভাগে তাদের কাছে ১০০ টাকা চাওয়া হয়। তারা অতিরিক্ত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। টাকা ফেরত না পেয়ে রসিদ চেয়েছিলেন। এ কারণে জরুরি বিভাগের কর্মচারীরা স্বজনকে নির্মম নির্যাতন করেন। এ খবর সংবাদমাধ্যমে আসে।

শুধু তাই নয়, ২৫ জুলাই রাতে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বজনকে ভর্তি করতে গিয়েছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। এ সময় জরুরি বিভাগের কর্মচারীরা তার কাছে ভর্তির জন্য ২০০ টাকা দাবি করেন। ওই শিক্ষার্থী ২০০ টাকার বদলে ৫০ টাকা (যদিও সরকারি ফি ৩০ টাকা) দিতে চাইলে কর্মচারীরা রোগী ভর্তিতে অস্বীকৃতি জানান। এক পর্যায়ে ওই শিক্ষার্থীকে মারধর করে পঙ্গু বানানোর হুমকি দেন তারা।

রংপুর মেডিকেলে রোগী ভর্তি করতে গেলে জরুরি বিভাগের কর্মচারীরা রোগীর স্বজনদের হাতে সরকার নির্ধারিত ৩০ টাকার ভর্তি রসিদ ধরিয়ে দেন; আর গ্রহণ করেন ১০০ থেকে ২০০ টাকা। রমেকের জরুরি বিভাগের কর্মচারীরা এতই ক্ষমতাবান যে, কেউ তাদের অনৈতিকভাবে অর্থ গ্রহণে বাধা দেন না। কেউ প্রতিবাদ করলে উল্টো এ দুটি ঘটনার মতো শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিষয়টি যেমন না জানার কথা নয়, তেমনি বছরের পর বছর এভাবে যেহেতু রোগীর স্বজনদের পকেট কাটা হচ্ছে, সুতরাং বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও অজানা থাকার কথা নয়।

কর্মচারীদের এমন অসদাচরণে এখন পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। রংপুরের নাগরিক সমাজ মাঝেমধ্যে এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল কয়েকজন দালালকে আটক করা হয়। অথচ মারধর কিংবা রোগী ভর্তিতে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণে এই দালালচক্রের সম্পৃক্ততা নেই। দালালরা মূলত রোগীর স্বজনদের সঙ্গে মিষ্টি আচরণ করে; তাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে রোগীদের মানহীন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি করায়। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে যারা রোগী ও রোগীর স্বজনদের ওপর বল প্রয়োগ করছেন; অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন; সেই অসাধু কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না- এ প্রশ্ন থেকেই যায়।

এক সময় রংপুরে সাংবাদিকতা করার কারণে আমাদের জানা, রংপুর নগরীতে গজিয়ে ওঠা বেশ কিছু ক্লিনিকের মালিক রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কিছু কর্মচারী। তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির চাকরি করে ক্লিনিকের মালিক- ভাবা যায়! আবার তাদের ক্লিনিকে পার্টটাইম সেবা দেন সরকারি হাসপাতালের কিছু চিকিৎসক। এই কর্মচারীরা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে বেশ প্রভাবশালী। শত অপরাধেও তাই ধরাছোঁয়ার বাইরে তারা। তাদের একচেটিয়া সিন্ডিকেট রমেক হাসপাতালে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। অনেক সময় তারা সাধারণ মানুষের মতো ডাক্তার-নার্সদেরও লাঞ্ছিত করে থাকে। তাদের হাতে জিম্মি সবাই। একটি সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে এই ত্রাসের রাজত্ব চলতে দেওয়া যায় না। জনসাধারণের স্বার্থে অতিদ্রুত অসাধু কর্মচারীদের এই সিন্ডিকেটের মূলোৎপাটন করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে আতঙ্কমুক্ত করা হবে- সেই প্রত্যাশা রইল।

সাংবাদিক

মন্তব্য করুন