আন্তর্জাতিক অভিবাসনের ক্ষেত্রে ২৭ জুলাই ছিল আরেকটি কালো দিন। ওই দিন ইউরোপগামী ৫৭ জন মানুষ ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারান। এর ঠিক পাঁচ দিন আগে গত ২২ জুলাই লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে তিউনিসিয়ার সমুদ্রতটে নৌযানডুবিতে ১৭ জন বাংলাদেশি অভিবাসীর মৃত্যু ঘটে। ২০২১ সালের জানুয়ারি হতে এ পর্যন্ত ভূূমধ্যসাগর রুটে নৌযানডুবিতে প্রায় ৯৭০ মানুষের জীবনাবসান হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের ব্যথিত না করে পারে না। এই পরিস্থিতিতে আজ আমরা পালন করছি আন্তর্জাতিক মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস।

এ বছর আন্তর্জাতিক মানবপাচার প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- 'ভুক্তভোগীর কণ্ঠস্বর আমাদের পথ দেখায়'। প্রশ্ন হলো, গত ২৭ জুলাই যে ৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে কিংবা বিগত সময়ে নৌকাডুবিতে যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের কণ্ঠ কি আদৌ পথ দেখিয়েছে? এটাই ভাবার বিষয়। এ ধরনের একেকটি ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমে খবর হয় এবং মানব পাচার চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মাঝেমধ্যে তাদের গ্রেপ্তারের তথ্যও সংবাদমাধ্যমে প্রচার হয়। গ্রেপ্তারের কিছুদিন পরই তারা জামিনে ছাড়া পায়। সামান্য সংখ্যকের হয়তো বিচার হয়। কিন্তু মানব পাচার চক্রের মূল 'গডফাদার' বা মূল হোতাদের চেহারা আমরা কখনই দেখতে পাই না। শত শত মৃত অভিবাসীর চেয়ে এই গডফাদারদের কণ্ঠহীন কণ্ঠ অনেক বেশি শক্তিশালী।

২০১২ সালে বাংলাদেশে মানব পাচারবিরোধী আইন হয়েছে। ২০১৭ সালে এই আইনের অধীনে বিধি তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বিশেষ আদালত গঠন করা হয়েছে। কিন্তু নারী ও শিশু পাচার এবং ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইউরোপের পথে মানবপাচার রোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ আমরা দেখতে পাইনি। মানব পাচার নিয়ে সবার মধ্যে উদ্বেগ কাজ করছে, সরকারও ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু আমরা ফলাফল পাচ্ছি না। ২০২০ সালের মার্চে পৃথিবীব্যাপী কভিড-১৯-এর বড় ধাক্কা আসে। ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে রামরু এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, কভিড-১৯-এর কারণে বৈধ পথে অভিবাসনের সুযোগ কমে যাবে এবং বহু মানুষকে আগামীতে অভিবাসনের দেশগুলো থেকে ফিরে আসতে হবে। এর ফলে পরবর্তীকালে মানব পাচার বহুলাংশে বেড়ে যাবে। এখন আমরা সেই বাস্তবতাই দেখতে পাচ্ছি। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমাদের তৎপর হতে হবে।

আমরা জানি, পাচার চক্র শুধু একটি রুট ব্যবহার করে না। তারা বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে অভিবাসন ইচ্ছুকদের সুদান, লিবিয়া কিংবা অন্য কোনো দেশে পৌঁছে দেয়। ওইসব দেশে পৌঁছে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর অন্য আরেক চক্রের সাহায্য নিয়ে খুবই বিপদসংকুল জলপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করে। প্রশ্ন হলো, এই মানুষগুলো তো আকাশপথেই লিবিয়া কিংবা সুদানে যাচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা ভ্রমণ ভিসায় ওইসব দেশে যাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে সাধারণত এসব দেশে কেউ ভ্রমণে যায় না, সহজেই বোঝা যায় যারা এই ভিসা ব্যবহার করছে তাদেরও বিদেশে ভ্রমণ করতে যাওয়ার কথা নয়। এই দুটি বিষয় আমলে নিলেই খোলাসা হয়ে যায় তাদের উদ্দেশ্য আসলে কী। বিষয়টি আমরা যেমন বুঝতে পারি, আমাদের ইমিগ্রেশন শাখার কর্মকর্তাদের এটি বোধগম্য না হওয়ার কথা নয়। তাহলে তারা কেন এ ধরনের অনিশ্চিত যাত্রা বন্ধ করতে পারছেন না? অনেকেই মনে করেন এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় কাজ করে। এক. ইমিগ্রেশন অফিস মনে করে তারা কাজের জন্য বাইরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে তাই চলে যাক। দুই. এই প্রক্রিয়ায় অনিয়ম-দুর্নীতি বা আর্থিক লেনদেন থাকতে পারে বলে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে অবৈধ পথে অভিবাসনের গতি অব্যাহত রয়েছে।

মানব পাচারের একটি লিঙ্গভিত্তিক দিকও রয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোতে মূলত পুরুষরা পাচারকারীদের সহায়তা নিয়ে অভিবাসিত হতে চাচ্ছে। আফ্রিকার দেশগুলোতে আটকেপড়া অভিবাসীদের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তাদের বেশির ভাগই বিভিন্ন মফস্বল এলাকার মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বল্পশিক্ষিত মানুষ। তবে একেবারেই প্রত্যন্ত এলাকার অশিক্ষিত মানুষও যে সেখানে যায় না, তা নয়। তাদের অনেকেই জমিজমা বিক্রি করে, সুদে টাকা নিয়ে কিংবা আত্মীয়স্বজনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে অভিবাসনের অর্থ সংগ্রহ করে। সুতরাং বলা যায়, পরিবার ও সমাজ সচেতন হলে এবং ইমিগ্রেশন শাখার কর্মকর্তাবৃন্দ একটু কঠোর হলে এ ধরনের অভিবাসন কিছুটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

নারী শ্রমিকাদের একাংশ বৈধ পথে বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশে গেলেও আরেক অংশ অনিয়মিত অভিবাসী হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যাচ্ছে। পরবর্তীকালে তারা পাচারের মতো প্রক্রিয়ায় পড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসনের নামে নারীদের ওইসব দেশে নিয়ে যৌনকর্মে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া, বাংলাদেশ থেকে অনেক নারীকে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় পাচার করা হচ্ছে। আমরা কিছুদিন আগে ব্যাঙ্গালুরুর ঘটনাটি জেনেছি। এই নারীদের অভিবাসনের নাম করে সেখানে নিয়ে বিক্রি করা হয়েছে। বিদ্যমান সার্ক কনভেনশনকে কার্যকর করে ভারতে পাচার হওয়া নারীদের দ্রুত ফেরত আনতে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। মধ্যপ্রাচ্য থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে ফেরত আসা নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে হবে তারা কার মাধ্যমে অভিবাসন করেছিল। এটা করা গেলে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ট্রাভেল এজেন্সি, অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি বা অসাধু কর্মচারীর সিন্ডিকেটকে জবাবদিহিতার ভেতরে আনা সম্ভব হবে। এই কাজ যে খুব কঠিন নয়, তা আমরা জানি।

আমরা মানব পাচারবিরোধী দিবস পালন করি। বিভিন্ন ফোরামে এ নিয়ে কথা বলি। মানব পাচার ও শ্রমিক পাচার রোধে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এখনও ততটা তীব্র নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা তীব্র হলে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনের মতো মানব পাচার রোধেও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যেত। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে সত্যিকার অর্থেই মানব পাচার রোধ করা যেত।

আমাদের মানব পাচারবিরোধী আইনের অধীনে ছয় হাজারের বেশি মামলাও হয়েছে। কিন্তু এসব মামলায় খুব বেশি রায় হয়নি। যে মামলাগুলোর রায় হয়েছে সেগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে আসামিরা খালাস পেয়েছে। আমরা জানি, মানব পাচার চক্র একক কোনো দেশে কাজ করে না। এটি আন্তর্জাতিক চক্র। মাদক ও অস্ত্রের পর মানব পাচার বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম 'আন্ডারগ্রাউন্ড' বাণিজ্য। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এই আন্তর্জাতিক চক্রগুলো ধরার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও কার্যকর ভূূমিকা রাখছে না। বিভিন্ন দেশে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আটকের পর তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যতটা তৎপর, এই চক্রগুলোকে ধরার ক্ষেত্রে তারা ততটা তৎপর নয়। দাতা সংস্থাগুলোও মূল জায়গায় কাজ করছে না বিধায় কোনো ইতিবাচক ফলাফল আসছে না।

মানব পাচারের আন্তর্জাতিক চক্রগুলো পরিচালিত হয় উন্নত রাষ্ট্র থেকে। ওইসব রাষ্ট্রে আবার শ্রমিক চাহিদাও রয়েছে। কিন্তু ওইসব দেশ বৈধভাবে অভিবাসী গ্রহণ করে না। ফলে অনেকেই অবৈধ অভিবাসনে উৎসাহিত হয়। এই দেশগুলো তাদের অর্থনীতির প্রয়োজন অনুযায়ী অভিবাসী গ্রহণ করলে অবৈধ পথে বা অনিয়মিত অভিবাসন কমে আসবে।

অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন, রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)
tsiddiqui59@gmail.com

মন্তব্য করুন