সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, কৃষক-শ্রমিক ও নিরীহ জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সদাসংগ্রামী ছিলেন কমরেড রতন সেন। অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি জীবনযাপন করে গেছেন অনাড়ম্বরভাবে। অতি সাধারণ খাবার খেতেন, বসবাস করতেন ছিন্নমূলের মতো। পরিধানে থাকত মোটা সুতির পায়জামা-পাঞ্জাবি। শীত নিবারণের জন্য অতি সাধারণ চাদর। বেশিরভাগ সময়ই ঘুরেফিরে কাটিয়ে দিতেন। ফলে নিয়মিতভাবে তার ঘরে উনুন জ্বলত না। নিত্য কোনো পারিবারিক জীবন ছিল না তার। থাকতেন খুলনার রূপসা উপজেলার ডোমরা গ্রামের নির্জন পরিবেশে।

কমরেড রতন সেন ১৯২৩ সালের ৩ এপ্রিল বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তবে জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন খুলনায়। তার পরিবারের সদস্যরা ১৯৪৭ সালের পরে ভারতে চলে গেলেও দেশমাতৃকার টানে তিনি খুলনায় থেকে যান। খুলনা অঞ্চলের বাম রাজনৈতিক দলের ভিত্তি স্থাপন করতে গ্রাম-গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন খেয়ে না খেয়ে। তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দলের জন্য কাজ করেছেন। নানা কষ্ট-যন্ত্রণার মধ্যেও মানুষের কল্যাণে ছুটে আসতেন। অথচ স্বার্থান্বেষী মানুষের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ১৯৯২ সালের ৩১ জুলাই দুস্কৃতকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন তিনি। তার ব্যক্তিগত কোনো শত্রু না থাকলেও আদর্শবিরোধী ছিল অনেকেই। রতন সেনের মৃত্যুতে শোকবিহ্বল হয়েছেন দেশ-বিদেশের অনেকেই।

রতন সেনের মতে, রাষ্ট্র শ্রেণি শোষণের এক হাতিয়ার এবং সমাজের দুর্বলতম গোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নকারী প্রতিষ্ঠান। আর তাই মনে হয় রাষ্ট্র কমরেড রতন সেনের হত্যাকারীদের বিচার করতে পারেনি। রাজনীতিতে নিজের জীবনকে সোপর্দ করায় দলের কাছ থেকে যে সামান্য ভাতা পেতেন তাই দিয়ে চলত তার জীবনযাপন। এই অর্থ থেকেও যদি কিছু বাঁচত তাও দিয়ে দিতেন মানুষের কল্যাণে। শিক্ষকতা করে এবং পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করে যা উপার্জন করেছেন তাও তিনি দলীয় তহবিলে জমা দিয়েছেন। মানুষের কল্যাণে তিনি নিজের বলে কিছুই মনে করতেন না।

খুলনা শহরের প্রাণকেন্দ্র পিটিআই মোড়ে লাল সাইনবোর্ডের ওপর লেখা কমরেড রতন সেন পাবলিক লাইব্রেরি। কমরেড রতন সেনের স্মৃতি রক্ষার্থে গড়ে তোলা হয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় জনসাধারণ এই লাইব্রেরির মাঝে খুঁজে পায় রতন সেনকে। ১৯৯৯ সালে আহসান আহমেদ রোডে রতন সেন পাবলিক লাইব্র্রেরির যাত্রা শুরু হয়। সে সময় কয়েকটি ভাঙা চেয়ার, দুটি টেবিল জোড়া দিয়ে একত্রিত করে পড়ার ব্যবস্থা করা হয়। টেবিলে অতি যত্নে বিছানো হয়েছিল একটি পুরোনো লালসালু। এখন কম্পিউটার সুবিধাসহ লাইব্রেরির কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকগুণ, পরিবেশেরও বেশ উন্নতি হয়েছে। তবে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার পেছনে যার অবদান অপরিসীম এবং নিজেকে যিনি এই লাইব্রেরি ও মানব সেবায় নিয়োজিত করেছিলেন, সেই মহান ব্যক্তিত্ব বাম রাজনৈতিক সংগঠক ছাইফুল হক ছিপুর শূন্যতা এখনও সেখানে বিরাজমান। সবই আছে শুধু নেই তিনি।

রতন সেনের স্মৃতি ধরে রাখার প্রয়াসে উত্তরসূরি উদীচী পরিবারের মোজ্জাম্মেল হক, সুব্রত সাহা, অধ্যাপক মজিবুর রহমান, তারক কুণ্ড, অসীম কুমার, জানে আলম বাবু, অপর্ণাসহ বেশ কয়েকজনের শ্রম এবং সুধী মহলে তাদের যোগাযোগ ও সুসম্পর্কে এনে দিয়েছে লাইব্রেরির দ্রুত উন্নয়ন। তারা দিনরাত খেটে যাচ্ছেন লাইব্রেরিটাকে ব্যাপক জ্ঞানভান্ডারের উপকরণে সমৃদ্ধ করার জন্য। যার মাধ্যমে কালকালান্তরে সমাজের মানুষের মাঝে বাহিত হবে রতন সেনের স্মৃতি ও সেবা। যারা এই লাইব্রেরিতে পড়তে আসেন তারাও পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে সহায়তা করেন। নিজেরাই বই টেনে নিয়ে পড়েন এবং তা যথাস্থানে রাখেন। এখানে বিজ্ঞান, ধাঁধা ও সাহিত্যচর্চা চলে নিয়মিত। প্রতিদিন অনেকদূর থেকে হেঁটেও এখানে আসেন অনেকে। বিনা পয়সায় বই ধার পাওয়ার সুবিধাও রয়েছে এই লাইব্রেরিতে। প্রতিদিন এখানে আগমন ঘটে অনেক জ্ঞানপিপাসুর।

যারা সৃষ্টির মাঝে অমর হয়ে থাকেন তারা চিরভাস্বর, আর কমরেড রতন সেন সে রকম একজন মানুষ হওয়ায় তার স্মৃতির সম্মানার্থেই এই লাইব্রেরির পরিচিতি হয়তো একদিন ছড়িয়ে যাবে দেশের সীমানার বাইরেও। সবার প্রচেষ্টায় কমরেড রতন সেনের স্মৃতিবিজড়িত এই লাইব্রেরি দিনে দিনে এগিয়ে যাবে আরও অনেকদূর। একদিন রতন সেন পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিটি বিষয়ের পুস্তক, জার্নাল, চিত্র, শিল্প ও ডকুমেন্টেশনে সমৃদ্ধ হবে এটাই কামনা।

গবেষক; আঞ্চলিক ,পরিচালক, বাউবি

মন্তব্য করুন