এই তো সেদিন কিশোরগঞ্জ আওয়ামী লীগের তৃণমূলের এক কর্মী বাংলাদেশের প্রবীণ রাজনীতিক কমরেড অজয় রায়ের ম্যুরালের একটি ছবি ফেসবুকে আপলোড করেন। অজয় রায়ের জন্মভিটা কিশোরগঞ্জের বনগ্রামে স্থাপিত নেট আকৃতির লোহার গ্রিল দিয়ে মোড়ানো ওই ম্যুরালটির ছবি দেখে আমি ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। একজন কীর্তিমান মানুষ কমরেড অজয় রায়। তার মৃত্যুর পর এলাকাবাসী ও স্বজনরা মিলে স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এটি তৈরি করেছেন। তার জন্ম কিংবা মৃত্যুদিনে সবাই মিলিত হয়ে ফুলেল শ্রদ্ধায় সাজিয়ে দেবে ম্যুরালটি। তাহলে কেন অজয় রায়ের প্রতিকৃতিতে লোহার নেটের ব্যবহার করা হলো? তাহলে কি প্রাণহীন এই ম্যুরালটিও দুর্বৃত্তদের কাছে নিরাপদ নয়? দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে, তা প্রত্যন্ত এক গ্রামে নির্মিত লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা কমরেড অজয় রায়ের ম্যুরালটির দিকে তাকালেই ধারণা পাওয়া যায়। সেই সময় মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, এবার কিশোরগঞ্জ গেলেই অজয়দার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বনগ্রাম যাব। এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ফেসবুক সূত্রে জানতে পারলাম, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ম্যুরাল ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। আমরা জানতে পারি, কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের আখড়াবাজার সেতুসংলগ্ন শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম চত্বরে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার উদ্যোগে নির্মিত সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ম্যুরালটি বৃহস্পতিবার রাতে ভাঙচুর করা হয়েছে। ঠিক তখনই কমরেড অজয় রায়ের আবদ্ধ ম্যুরালটির কথা আমার মনে পড়ে।

ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মঞ্চে কমরেড অজয় রায়ের সভাপতিত্বে জঙ্গিবাদবিরোধী মঞ্চের সমাবেশে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা দিতে দেখেছি। ধীর-স্থির অথচ কী তেজস্বী বক্তব্য রেখেছেন সৈয়দ আশরাফ। বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলটির সাধারণ সম্পাদক কথা বলছেন, আর মিলনায়তনটিতে উপচে পড়া উপস্থিত জনতা মুহুর্মুহু করতালিতে সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছে প্রিয় নেতাকে। নেতা যেন তাদের মনের কথাই বলে চলেছেন। আমি মিল খুঁজে পাই তাদের মাঝে। সভার সভাপতি ও প্রধান অতিথি দু'জনেই যে কিশোরগঞ্জের সন্তান, সেইসঙ্গে উপস্থিত জনতার একজন আমিও কিশোরগঞ্জেরই। দু'জনের একজনও আজ বেঁচে নেই। তাহলে কি রাজনীতির ময়দানে দাঁড়িয়ে যে আশঙ্কা তারা করতেন, আজ সেই আশঙ্কাই তাদের ছুঁয়ে যাচ্ছে। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ম্যুরাল ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা- এই সংবাদটি শোনার পর থেকে ভেতরটা কেমন যেন দুমড়েমুচড়ে ভেঙে যাচ্ছে। অস্থির আমার দু'চোখের পাতা কোনোভাবেই এক হয় না।

জানতে চাই, কেন এমন হয়েছে। নজর রাখি সংবাদমাধ্যমের দিকে, সোশ্যাল মিডিয়াতেও সতর্ক চোখ। আশা রাখি, খুব দ্রুতই জানতে পারব এর পেছনে কে, কারা প্রকৃত অপরাধী? স্থানীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, পৌর মেয়র, জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। আমি আশান্বিত হই এই অশুভ তৎপরতার বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে স্থানীয় সাধারণ মানুষ। স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন ম্যুরাল ভাঙচুরের প্রতিবাদে ঘটনাস্থলে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। মানববন্ধন থেকে বক্তারা এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছে। তাদের সঙ্গে একমত হয়ে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করার দাবি জানাই। আমাদের জানতেই হবে ঘটনার আড়ালের ঘটনা। ম্যুরাল ভাঙচুরের ঘটনায় কিশোরগঞ্জ পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে পুলিশের তৎপরতায় সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে আটকও করা হয়েছে।

প্রয়াত নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ম্যুরাল ভাঙচুরের এই ঘটনায় অনেক প্রশ্ন নতুন করে আমাদের সামনে উত্থাপিত হয়েছে। যে প্রশ্নগুলোর জবাব স্থানীয় আওয়ামী লীগ তথা রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সুশীল সমাজ ও তরুণদের খুঁজে বের করতে হবে। ঠিক করতে হবে দ্বিধাবিভক্ত রাজনীতি, পারস্পরিক কলহ ও পশ্চাৎপদতার দিকেই যাত্রা অব্যাহত থাকবে, না সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের দেখিয়ে যাওয়া পথ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্য আর প্রগতির দিকেই হাঁটবে কিশোরগঞ্জবাসী। সিদ্ধান্ত আপনাদের। আর দ্রুতই নিতে হবে সে সিদ্ধান্ত, নয় তো চূড়ান্ত অন্ধকারে পতিত হওয়ার সময় যে আর বাকি নেই।

লেখক ও গবেষক

মন্তব্য করুন