তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওকলা বিশ্বব্যাপী মোবাইল এবং ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতি নিয়ে মাসভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গত জুন মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী গতির দিক থেকে মোবাইল ইন্টারনেটে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৭টি দেশের মধ্যে ১৩৫তম। আর ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে ১৮১টি দেশের মধ্যে ৯৮তম। ওকলা প্রতিবেদন বলছে, মোবাইল ইন্টারনেটে বাংলাদেশ গত মাসের চেয়ে (মে ২০২১) এক ধাপ পিছিয়েছে। বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেটের গড় ডাউনলোড গতি ১২ দশমিক ৪৮ এমবিপিএস আর আপলোডের গড় গতি ৭ দশমিক ৯৮ এমবিপিএস। গড় গতির দিক থেকে বাংলাদেশের চেয়ে নিচে আছে দুটি দেশ ভেনেজুয়েলা আর আফগানিস্তান।

প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের সার্ক প্রতিবেশীদের মধ্যে মালদ্বীপ ৪০, নেপাল ১০৫, ভারত ১২২ এবং শ্রীলংকা ১২৯তম অবস্থানে।

প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে সেটা যে নতুন, তা কিন্তু নয়। ভোক্তা পর্যায়ে গ্রাহকরা সব সময় তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলেন। আর এই সত্যিটা টেলিকমিউনিকেশনের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষেরও অজানা থাকার কথা নয়। কিন্তু এ অবস্থা সরকার ঘোষিত 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' নীতির সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বরং পরস্পরবিরোধী। অথচ 'ডিজিটাল বাংলাদেশে' ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন ও ব্রডব্যান্ড সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

গত জানুয়ারি মাসে বিটিআরসি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় কোয়ালিটি অব সার্ভিস ড্রাইভ টেস্ট চালিয়ে দেখেছে, ঢাকার গ্রাহকরা ফোর জিতে ৩ থেকে ৬ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট পাচ্ছেন। অথচ বিটিআরসির বেঁধে দেওয়া নিয়মে গ্রাহকদের সর্বনিম্ন ৭ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট দিতে হবে। ঢাকা শহরের প্রায় ১১২১ কিলোমিটারজুড়ে পরিচালিত এই টেস্টের ফলাফলকে বিটিআরসি নন-কমপ্লায়েন্ট বলে মন্তব্য করেছে। অর্থাৎ, আমাদের মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো যা বলছে, সেভাবে কিন্তু সেবা দিচ্ছে না। বিটিআরসি গত জানুয়ারিতে দেশের ৩০০ উপজেলায় মোবাইল সেবার ভয়েস কল ও ডাটা সেবার মান যাচাইয়ে ছয় মাসব্যাপী ড্রাইভ টেস্টও উদ্বোধন করেছে। তার ফলাফল হয়তো খুব শিগগিরই পাওয়া যাবে। খোদ ঢাকা শহরের টেস্টের ফলাফলকে যদি বিটিআরসি নন-কমপ্লায়েন্ট বলে, তবে উপজেলা পর্যায়ে সেই টেস্টের কী ফলাফল আসবে, তা সহজেই অনুমেয়।

বাস্তবতা যে অনেকটাই ভিন্ন, সেটা এ রকম আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্ত এবং দেশি-বিদেশি গবেষকদের গবেষণা প্রবন্ধে মাঝেমধ্যে বেরিয়ে আসে। অবশ্য তাতে জনগণের মধ্যে কিছুটা আলোড়ন তোলা ছাড়া কাজের কাজ কিছুই হয় না। মোবাইল ফোন অপারেটররা খুব একটা পাত্তাও দেয় না। এবারও মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব মহাসচিব বলেছেন, সাম্প্রতিককালে ইন্টারনেটের গতি নিয়ে যে রিপোর্টগুলো পাওয়া যাচ্ছে, তাতে র‌্যাংকিং যেটাই হোক না কেন, আমাদের ইন্টারনেটের গড় গতি কমেনি, বরং বেড়েছে (সমকাল, ২৭ জুলাই ২০২১)।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ অবস্থা থেকে বের হওয়ার রাস্তাটা কী? রাস্তা একটাই- নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও গতিশীল, উদ্যোগী এবং উদ্যমী ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু ব্যান্ডউইথের দাম কমানোই মূল কাজ নয়। সেবার মান বেঁধে দিয়ে যে বিধিমালা বিটিআরসি নিজেই জারি করেছিল, সেটা সব অপারেটর যথাযথভাবে অনুসরণ করে গ্রাহকদের সেবা দিচ্ছে কিনা, সেটা নিশ্চিত করার দায় কিন্তু এই নিয়ন্ত্রক সংস্থারই। পাশাপাশি বিটিআরসিকে ব্যবহারকারী-বান্ধব ভূমিকাও পালন করতে হবে।

বিটিআরসি গত জুন মাসের প্রথম দিকে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবার দাম (ঊর্ধ্বসীমা) বেঁধে দিয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে সারাদেশে এক রেটে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা পাবেন গ্রাহকরা। ৫ এমবিপিএস ৫০০, ১০ এমবিপিএস ৮০০ ও ২০ এমবিপিএস এক হাজার ২০০ টাকায় কিনতে পারবেন গ্রাহকরা। কিন্তু মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহকদের জন্য উদ্যোগটি নেওয়া হয়নি। বিটিআরসি ইন্টারনেটের 'কস্ট মডেলিং'য়ের জন্য পরামর্শক নিয়োগ করলেও তা ফাইলবন্দি হয়েই আছে। যদিও ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী বলেছেন, পর্যায়ক্রমে সবই হবে। মোবাইল ইন্টারনেটের গ্রাহক (ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর প্রায় ৮৩ শতাংশ) ব্রডব্যান্ডের চেয়ে অনেক বেশি। তারপরও ব্রডব্যান্ড গ্রাহকরা ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের (৫৮ শতাংশ) দিকে এগিয়ে থাকায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। বিটিআরসি এর আগে মোবাইলের ভয়েস কলের কস্ট মডেলিংয়ের বেলায় সফল হয়েছে এবং দেশের সব অপারেটরই কিন্তু বেঁধে দেওয়া সীমার মধ্যে ভয়েস কলের ইউনিটপ্রতি মূল্য রাখছে। এখন কত দ্রুত মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেটাই দেখার বিষয়।

মোবাইল ইন্টারনেটের দাম বেঁধে দেওয়ার উদ্যোগের পাশাপাশি বিটিআরসিকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তা হচ্ছে ডেটার মেয়াদ ও ইউনিট মূল্য। উদাহরণ হিসেবে, সর্ববৃহৎ অপারেটর গ্রামীণফোনের ১ জিবি ভলিউম ইন্টারনেট প্যাকেজ ৭৭ টাকা এবং স্থায়িত্বকাল ৭ দিন। আবার ৩ জিবি পাওয়া যাচ্ছে ৬৩ টাকায়, যার মেয়াদ ৩ দিন। এখানে ১ জিবির দাম ২১ টাকা। আবার ৩০ দিন মেয়াদের ৬ জিবি প্যাকেজের দাম ৩০৮ টাকা, যেখানে ১ জিবির দাম পড়ছে ৫১ টাকা ৩৩ পয়সা। অর্থাৎ ইউনিট মূল্য মেয়াদের প্যাকেজ অনুযায়ী বদলে যাচ্ছে। আর যদি গ্রাহক এই পরিমাণ ইন্টারনেট ভলিউম শেষ করতে না পারেন এবং অন্য কোনো প্যাকেজ নেন তবে অব্যবহূত ভলিউম কোনোভাবেই গ্রাহক আর পাবেন না। এই নীতিটা গ্রাহকদের ওপর একটা বড় চাপ। কেননা, তখন গ্রাহককে অব্যবহূত ভলিউম শেষ করার উপায় খুঁজতে হয় অথবা ক্ষতিটা মেনে নেওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে হয়। যদি যে কোনো প্যাকেজে এই অব্যবহূত ভলিউম নেওয়ার সুযোগটা থাকে তবে তা ইন্টারনেট ব্যবহারে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, কোনো সন্দেহ নেই।

আত্মতৃপ্তির ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে এসে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি এরকম অসংখ্য বিষয়ে ব্যবহারকারী-বান্ধব ভূমিকা এবং অপারেটরদের সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর নিরীক্ষণ নিশ্চিত করতে পারলে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে সত্যিকার অর্থেই একটা সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারবে। কেননা, ডিজিটাল বাংলাদেশে ব্যবহারকারীর একটা তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এখন তা কবে নাগাদ, সেটিই দেখার বিষয়।

সহযোগী অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
s.hasan@du.ac.bd

মন্তব্য করুন