নদী, সবুজ মাঠ, ফুল ও পাখির প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল প্রবল আকর্ষণ; যা তার লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা ও আমার দেখা নয়াচীনে বারবার ধরা দিয়েছে।

কারাগারের ভেতরে বঙ্গবন্ধু বাগান করতেন। পরম মমতায় গাছের পরিচর্যা করতেন। শুস্ক মাটিতে সবুজের পরশ বুলাতেন। গাছে গাছে ফুল ফোটার দৃশ্য দেখার জন্য উৎসুক হয়ে থাকতেন। কারাগারের রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, 'দুপুরের দিকে সূর্য মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারতে শুরু করছে। রৌদ্র একটু উঠবে বলে মনে হয়। বৃষ্টি আর ভালো লাগছে না। একটা উপকার হয়েছে আমার দুর্বার বাগানটার। ছোট মাঠটা সবুজ হয়ে উঠেছে। সবুজ ঘাসগুলি বাতাসের তালে তালে নাচতে থাকে। চমৎকার লাগে, যেই আসে আমার বাগানের দিকে, একবার না তাকিয়ে যেতে পারে না। বাজে গাছগুলি আমি নিজেই তুলে ফেলি। আগাছাগুলিকে আমার বড় ভয়, এগুলি না তুললে আসল গাছগুলি ধ্বংস হয়ে যাবে। যেমন আমাদের দেশের পরগাছা রাজনীতিবিদ- যারা সত্যিকার দেশপ্রেমিক তাদের ধ্বংস করে এবং করতে চেষ্টা করে। তাই পরগাছাকে আমার বড় ভয়। আমি লেগেই থাকি। কুলাতে না পারলে আরও কয়েকজনকে ডেকে আনি।' বঙ্গবন্ধু কারাগারের বাইরেও একটি বিশাল বাগান সাজিয়েছিলেন- সেটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। দলটিকে তিনি তিল তিল ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন। সুদীর্ঘ সেই ইতিহাস।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আসাম প্রত্যাগত মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি ও শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের যাত্রা শুরু হয়। মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী-হাশিম গ্রুপের কর্মীরাই ছিলেন দলের প্রাণশক্তি। এই অংশের অন্যতম নেতা শেখ মুজিব তখন কারাগারে। কারারুদ্ধ শেখ মুজিব যুগ্ম সম্পাদক হন। সেদিনের পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগই 'মুসলিম' ও 'পূর্ব পাকিস্তান' খোলস ছেড়ে এখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক অসুস্থ হয়ে পড়ায় ১৯৫২ সালে শেখ মুজিবকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হতে হয়। ১৯৫৩ সালে সাধারণ সম্পাদক হন। তিনি ছিলেন দলের প্রতি অন্তঃপ্রাণ। দেশের নানা প্রান্তে ছুটে যেতেন, কর্মীদের উদ্দীপ্ত করতেন। এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন কর্মীদের প্রিয় মুজিব ভাই। সারাদেশের তৃণমূলের নামধাম থাকত তার ঠোঁটস্থ। কাউকে একবার দেখেই তাকে চিনে রাখতেন, নামও মনে রাখতেন। অসাধারণ স্মরণশক্তি। কামরুদ্দিন আহমেদ লিখেছেন, শেরেবাংলার পর একমাত্র শেখ মুজিবই এই গুণটি রপ্ত করতে পেরেছিলেন। সভাপতি মওলানা ভাসানী নানা সময়ে বলেছেন, এমনকি ভাগ হয়ে যাওয়ার পরও বলেছেন, শেখ মুজিব তার কাছে পুত্রবৎ। মওলানা ভাসানীর বলা ঘটনা। একবার তিনি শেখ মুজিবকে একটি টাকা দিয়ে নারায়ণগঞ্জে পাঠিয়েছিলেন। শেখ মুজিব পরদিন টাকাটা ফেরত দিলেন। মওলানা জিজ্ঞেস করেন, 'মজিবর, তুমি নারায়ণগঞ্জ যাও নাই?' শেখ মুজিব বলেন, 'সাইকেল চালায় গেছিলাম। টাকা লাগে নাই।' মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ-ন্যাপের সভাপতি থাকাকালে অনেকেই সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন। ভাসানীর কথা- 'মজিবরের সঙ্গে কারও তুলনা হয় না।' অক্লান্ত শ্রম দিয়ে শেখ মুজিব 'আওয়ামী লীগ' নামক বাগানটি পরিচর্যায় নিবেদিত ছিলেন। যদিও দলটি তখন মওলানা ভাসানীর আওয়ামী লীগ হিসেবেই পরিচিত।

১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনের পর মওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে স্বায়ত্তশাসন ও পররাষ্ট্রনীতি প্রশ্নে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে। পরিণতিতে আওয়ামী লীগ দুই ভাগ হয়ে যায়। মওলানা ভাসানী তার সমর্থকদের নিয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ গঠন করেন। মূল আওয়ামী লীগ তখন সোহরাওয়ার্দীর আওয়ামী লীগ বলে পরিচিত হয়। কারও অজানা ছিল না যে, শেখ মুজিব দলের মূল সংগঠক। মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দলের হাল ধরেন।

শেখ মুজিব ছিলেন সোহরাওয়ার্দীর শিষ্য। তবে দুই নেতার মধ্যে পার্থক্যও ছিল বিস্তর। সেই পার্থক্য নিয়েই তারা পথ চলেছেন। সোহরাওয়ার্দী তখন পাকিস্তান রক্ষা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। পাকিস্তানি রাষ্ট্র কাঠামোতে শেখ মুজিবের আস্থা ছিল না। তিনি ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদী, স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে আপসহীন, অন্তরে তার স্বাধীনতার স্বপ্টম্ন। সোহরাওয়ার্দী সংখ্যাসাম্য নীতির অন্যতম প্রবক্তা। শেখ মুজিব এর ঘোরতর বিরোধী। ১৯৫৬ সালে গণপরিষদে স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে শেখ মুজিব ছিলেন সোচ্চার। পূর্ব বাংলার স্থলে পূর্ব পাকিস্তান নামকরণের বিরোধিতা করেন।

গুরু-শিষ্যের মধ্যে নতুন বিরোধ দেখা দেয় আইয়ুবের সামরিক শাসনের পর। সোহরাওয়ার্দী চাইছিলেন নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের (এনডিএফ) মাধ্যমে আইয়ুবের স্বৈরশাসন মোকাবিলা করতে। শেখ মুজিব দল পুনরুজ্জীবনের পক্ষপাতী। তখন লন্ডনে অবস্থানরত সোহরাওয়ার্দীর কাছে দল পুনরুজ্জীবনের প্রস্তাব নিয়ে দেখা করেন। ব্যর্থ মনোরথে শেখ মুজিব ফিরে এলেন।

সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর ১৯৬৪ সালে তিনি আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করেন। একই বছর সম্মেলনের মধ্য দিয়ে মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশকে সভাপতি এবং শেখ মুজিবকে সাধারণ সম্পাদক করে দল পুনর্গঠিত হয়। তখন থেকে এটি পরিণত ও পরিচিত হয় শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগে। দলে 'স্বায়ত্তশাসন, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্বমূলক' পররাষ্ট্রনীতি গৃহীত হয়। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা দেওয়ার পর কারও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, আওয়ামী লীগ কোন পথে হাঁটছে।

এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে আবুল মনসুর আহমদ, আতাউর রহমান খান, মওলানা তর্কবাগীশ, জহিরউদ্দিন, আবদুস সালাম খানসহ প্রবীণ নেতারা একে একে সরে গেছেন। তখন শেখ মুজিবের রানিংমেট তাজউদ্দীন আহমদ, যিনি ১৯৬৪ সালে সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ১৯৬৬ সালে সাধারণ সম্পাদক হন।

শেখ মুজিবের এই সাজানো বাগানে আগাছা-পরগাছা গজানোর সুযোগ ছিল না। দলে ত্যাগী ও আদর্শবাদী কর্মীদের সমাবেশ ঘটেছিল। তবে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা রাজনীতিকের ভিড় বেড়েছিল। অনেকেই আওয়ামী লীগের টিকিটে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্টম্ন দেখেছিলেন। হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ও সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের সেই স্বপ্টম্ন পূরণ হয় না। তখন দলের পরীক্ষিত নেতাদেরই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। সত্তরের নির্বাচনের আগে রটে গেল যে, ফরিদপুর সদরে প্রাদেশিক পরিষদে ফুড বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ধনাঢ্য এক ব্যক্তি মনোনয়ন পেতে যাচ্ছেন। ওই ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে মনোনয়নের প্রস্তাব করেন এবং দলের তহবিলে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা দেওয়ার কথাও বলেন। বঙ্গবন্ধু তাকে সাফ জানিয়ে দেন- ওখানে আমার ইমাম আছে; আওয়ামী লীগকে ভালোবাসলে ওর হয়ে নির্বাচন করুন।

ফরিদপুরের পোড় খাওয়া তরুণ নেতা ইমামউদ্দিন আহমেদ। সারাদেশে ছড়িয়ে ছিল একঝাঁক ইমাম। যারা ছিলেন ত্যাগী ও আদর্শবাদী। দুর্ভাগ্যজনক- সেই দলে এখন আগাছা-পরগাছা, 'হাইব্রিড', 'কাউয়া', 'কীটপতঙ্গ' সাহেদ, হেলেনা জাহাঙ্গীরদের দৌরাত্ম্য। না, কেবল আওয়ামী লীগে নয়; বিএনপি-জাপাতেও হাইব্রিডদের অবস্থা রমরমা। পচনের ক্ষত দেখা যায় বাম দলগুলোতেও। তবে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগে এদের ভিড় বেশি।

আওয়ামী লীগে কেবল অনুপ্রবেশকারী নয়, দলের সভাপতি শেখ হাসিনা বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া সত্ত্বেও নানা স্থানে অবাঞ্ছিতদের ফুল দিয়ে মিষ্টি খাইয়ে বরণ করেও নেওয়া হয়েছে। কিছু 'হাইব্রিড' নেতা মনোনয়ন বাগিয়ে এমপি-মন্ত্রীও হয়েছেন। এসবের পরিণতি ভয়ানক। আগাছা-পরগাছার উপদ্রবে আসল গাছ যেমন নির্জীব হয়ে পড়ে, তেমনি এই ঐতিহ্যবাহী দলটিতে হাইব্রিড নেতানেত্রীর দৌরাত্ম্যে সৎ ও ত্যাগীরা আজ হতাশ, নির্জীব।

কোনো কোনো হাইব্রিড নেতা-নেত্রী আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন-সদৃশ সংগঠন খুলে বসেছেন। এসব সংগঠনের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যেরও অভিযোগ রয়েছে। এমনই একজন আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপকমিটির সদস্য হেলেনা জাহাঙ্গীর। 'দোকান'টির নাম বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ। এই সংগঠনের জেলা, উপজেলা ও প্রবাসের কমিটিতে বিভিন্ন পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিলেন। অবশেষে হেলেনা জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কৃত হয়েছেন। নানা অভিযোগে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। দল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। এমন দুই-একটি পদক্ষেপ আগেও নেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে- এতে আগাছা-পরগাছা কতখানি কমেছে?

একজন সাহেদ বা একজন হেলেনা জাহাঙ্গীরের বহিস্কারই শেষ কথা নয়। দলের ভেতরের আগাছা-পরগাছা সাফ করা নিত্যদিনের কাজ, রুটিন ওয়ার্ক। বঙ্গবন্ধু যেমন কারাগারের বাগান থেকে নিয়মিত আগাছা উপড়ে ফেলতেন, তেমনি দলের ভেতরের আগাছা-পরগাছা নিয়মিতভাবেই উপড়ে ফেলতে হবে; নইলে বঙ্গবন্ধুর সাজানো বাগানের সমূহ ক্ষতি।

সাংবাদিক

মন্তব্য করুন