সাঁওতালি ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করছিলাম। দুজনেই সম্মত হয়েছিলাম ভাষার দেশ হিসেবে বিশ্বদরবারে পরিচিত এই বাংলাদেশেও বাংলা ও ইংরেজি ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষার কার্যত দাপ্তরিক ব্যবহার নেই। বাংলা ভাষা ব্যবহারের যে অর্থনৈতিক মূল্য, সেটিও দিন দিন কমতে শুরু করেছে। এখনকার বাঙালি বাবা-মায়েরাও তাদের সন্তানদের বাংলা মাধ্যমে না পড়িয়ে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে বেশি আগ্রহী। তাই তো আজকাল ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলোর চাহিদাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার যখন এই অবস্থা, তখন সাঁওতালি ভাষার মতো অন্য আদিবাসী ভাষাগুলোর অবস্থা কোন পর্যায়ে আছে সেটি সহজে অনুমেয়। সাঁওতাল শিশুরা বিদ্যালয়ে গিয়ে তাদের মাতৃভাষায় পড়ার বা কথা বলার সুযোগ পায় না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও কোনো সুযোগ নেই। চাকরিসহ কোনো ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সাঁওতালি ভাষার কোনো ব্যবহার নেই। এমনকি নিজ বাড়ির বাইরে হাটে-বাজারে এখন একজন সাঁওতাল আরেক সাঁওতালের সঙ্গে বাংলায় কথা বলতে বাধ্য হচ্ছে। এই ভাষার ব্যবহারিক পরিসর বাড়ানোর জন্য সরকারেরও বাস্তবসম্মত কোনো উদ্যোগ নেই।

ইংরেজি ভাষা ও রোমান বর্ণমালার আগ্রাসীমূলক আচরণ, বর্ণমালা বিতর্ক, সরকারের উদ্যোগের অভাব, ভাষা ও সাহিত্য চর্চার অনুকূল পরিবেশ না থাকা ইত্যাদি কারণে সাঁওতালি ভাষা অনেক দিন ধরেই বিপন্ন হওয়ার পথে থাকলেও সাঁওতাল কিছু তরুণ-তরুণীর নতুন উদ্যোগে সাঁওতালি ভাষা যেন আবারও নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে ২০১৮ সালের ২ আগস্ট উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন পরিচালিত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ অনলাইন মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ার সাঁওতালি সংস্করণ  (sat.wikipedia.org) চালুর মাধ্যমে। এর মাধ্যমে বিশ্বদরবারে আবারও নতুন করে সাঁওতালি ভাষার পরিচয় হয়েছে। এটিকে ধরে রাখার জন্য নিরলসভাবে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের সাঁওতাল তরুণ-তরুণীরা কাজ করে চলেছে। ২৩ জুলাই এর হিসাব অনুযায়ী সাঁওতালি উইকিপিডিয়ায় নিবন্ধের সংখ্যা ৬,৩০১টি, নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩,৯৫২ জন, সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৪ জন এবং প্রশাসক আছেন দুইজন। এছাড়া সাঁওতালি উইকিপিডিয়াসহ সাঁওতালি ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের সাঁওতালি উইকিপিডিয়ানরা গঠন করেছে 'উইকিমিডিয়ানস অব সাঁওতালি ল্যাঙ্গুয়েজ ইউজার গ্রুপ' যা ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের স্বীকৃতি পায়। এই ইউজার গ্রুপটি সাঁওতালি ভাষাকে সমৃদ্ধকরণে তিন দেশেই অনলাইন ও অফলাইন নানা কর্মসূচি পালন করে চলেছে।

এখন নিঃসন্দেহে সাঁওতালি উইকিপিডিয়াকে সাঁওতালি ভাষায় লিখিত সবচেয়ে সমৃদ্ধ কনটেন্ট বলা যায়। কারণ সাঁওতালি ভাষায় এত বিপুল পরিমাণ বিষয়বস্তু আর কোথাও নেই। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো আপনি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই থাকেন না কেন, শুধু ইন্টারনেট সংযোগ এবং উপযুক্ত ডিভাইস থাকলেই আপনি সাঁওতালি ভাষায় যে কোনো বিষয়বস্তু পড়তে পারবেন। আবার যদি মনে করেন কোনো তথ্য যোগ করা বা বাদ দেওয়া প্রয়োজন, সেটিও আপনি সহজেই করতে পারবেন। শুধু আপনাকে সাঁওতালি ভাষা পড়তে ও লিখতে জানতে হবে। ও হ্যাঁ, সাঁওতালি ভাষার বর্ণমালা বিতর্কের ভেতরেই সাঁওতালি উইকিপিডিয়ায় সাঁওতালদের নিজস্ব লিপি 'অলচিকি' ব্যবহার করা হয়েছে, যা ১৯২৫ সালে সাঁওতাল পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু আবিস্কার করেন। এখানে অলচিকি ব্যবহারের পেছনে বড় যে যুক্তিটা ছিল, তা হলো একমাত্র অলচিকি লিপিতে প্রাতিষ্ঠানিক পঠন-পাঠন প্রক্রিয়া ভারতে চলমান রয়েছে এবং এই লিপিটির সব অক্ষরের নাম ও আকার-আকৃতি সাঁওতালি সংস্কৃতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। যার ফলে যে কোনো সাঁওতাল যে কোনো বয়সে সহজেই এই লিপিটি শিখতে পারে। এখন পর্যন্ত এই উন্মুক্ত বিশ্বকোষে সাঁওতালদের নানা ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আচার-ব্যবহার, জীবন-যাপন প্রণালি, ব্যবহার্য্য জিনিসপত্র, পোশাক-আশাক, অলংকার, সাংস্কৃতিক উৎসব, বিশ্বাস ইত্যাদি বিষয়সহ বৈশ্বিক সব ধরনের বিষয় নিয়ে নিবন্ধ লেখা হচ্ছে। আশা করি আগামী কয়েক বছরে এটি আরও সমৃদ্ধ হবে এবং কোনো বিষয়ই হয়তো বাদ থাকবে না। সাঁওতালি ভাষায় ইন্টারনেটে যাই খোঁজা হোক না কেন, সার্চ ইঞ্জিনগুলো সাঁওতালি উইকিপিডিয়ার নিবন্ধগুলোই আগে দেখাবে। এভাবে সাঁওতালি উইকিপিডিয়ানদের বেশি বেশি অবদানে সাঁওতালি ভাষা সমৃদ্ধ হতেই থাকবে এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপারটি ঘটবে সেটি হলো, যেহেতু উন্মুক্ত বিশ্বকোষে যুক্ত হওয়া বিষয়বস্তুগুলো ডিজিটালি সংরক্ষণ হচ্ছে, তাই সেগুলো কাগুজে বই-পুস্তকের মতো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না এবং নিত্য নতুন আপডেটের কারণে কোনো নিবন্ধ পুরোনো হওয়ার আশঙ্কাও থাকবে না। 

এ বছর ২ আগস্ট সাঁওতালি উইকিপিডিয়ার তৃতীয় বর্ষপূর্তি। আশা করি এমন সময়ে বিশ্বজুড়ে চলমান করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সাঁওতালি উইকিপিডিয়ানরা তাদের কর্মসূচি শুধু অনলাইনেই সীমিত রাখবেন। আর একটি বিষয় হলো, যে কোনো উইকিপিডিয়ায় অবদানকারীরা স্বেচ্ছাশ্রমের মধ্য দিয়ে ভাষাকে সমৃদ্ধ ও বাঁচিয়ে রাখার কাজটি করে। অনেক সময় ফাউন্ডেশন অবদানকারীদের কম্পিউটার, ল্যাপটপ, নানা ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করে থাকে। অনেক প্রতিষ্ঠানও ইন্টারনেট খরচ দিয়ে থাকে। যদিও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে বাংলাদেশে এই ধরনের সহযোগিতা অনেক কম। উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ চ্যাপ্টারও অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে ভাষাকে সমৃদ্ধ করার এই কাজে সরকার সহযোগিতা করতে পারে। আর আমাদের সাঁওতাল তরুণ-তরুণীরা আরও বেশি করে এই কাজে শামিল হোক এই আহ্বান রাখি।

প্রশাসক, সাঁওতালি উইকিপিডিয়া
maniksoren@gmail.com

মন্তব্য করুন