অর্থমন্ত্রী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে ৩ লাখ ৯২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে- যার মধ্যে ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২৭ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, আয়করের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, আমদানি ও সম্পূরক শুল্ক্কের লক্ষ্যমাত্রা ৯২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুসারে আয়কর থেকে ৮৫ হাজার কোটি টাকা, ভ্যাট থেকে ৯৭ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা এবং আমদানি ও সম্পূরক শুল্ক্ক থেকে ৭৭ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক্ক থেকে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। তার মধ্যে শুধু ভ্যাট থেকে আয় হয়েছে ৮৪ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয় ছিল ২ লাখ ২৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক্ক আইন ২০১২-তে চলতি অর্থবছরের বাজেটের মাধ্যমে নিম্নলিখিত উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে :

কভিড পরীক্ষার কিট, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই), টিকা এবং ওষুধ পরিষেবাগুলোতে ভ্যাট অব্যাহতি এই বছরও অব্যাহত থাকবে।

স্যানিটারি ন্যাপকিনের ভ্যাট মওকুফ করা হয়েছে। বকেয়া মূল্য সংযোজন কর বা মূসকের ওপর মাসিক সুদের হার ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্য যেমন- ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রো ওয়েভ ওভেন, ইলেকট্রিক ওভেন, ব্লেন্ডার ও কম্পিউটার সম্পর্কিত অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস ইত্যাদি পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানিতে ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক্ক ও আগাম কর অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। এসি রেস্তোরাঁগুলোতে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। নন-এসি রেস্তোরাঁগুলোতে ভ্যাট ৭.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

সারাদেশে ইএফডির (ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস) ব্যাপক স্থাপনের মাধ্যমে ভ্যাট সংগ্রহের প্রবৃদ্ধির রোডম্যাপ ঘোষিত হয়েছে। শিল্পের কাঁচামাল ও উপকরণ আমদানিতে আগাম কর ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হয়েছে। অটোমোবাইল ও এয়ার কন্ডিশনারসহ বিভিন্ন পণ্যের ভ্যাট অব্যাহতি বাড়ানো হয়েছে। এলপি গ্যাসের ব্যবসায়ী পর্যায়ের ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে।

অনিবাসী করদাতাদের ভ্যাট এজেন্টের ক্ষেত্রে যৌথ ও একক দায়-দায়িত্ব প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে অনিবাসী করদাতাদের কোনো দায়-দেনার জন্য ওই অনিবাসী করদাতা এককভাবে দায়ী থাকবেন না।

ব্যাংক, বীমা কোম্পানি ও বন্দর কর্তৃক ইস্যুকৃত ইনভয়েসকে মূসক চালান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

ব্যবসা করতে গেলে সবার ভ্যাট বিভাগের দেওয়া ব্যবসায় শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) লাগবে, যা ভ্যাট নিবন্ধন নামে সমধিক পরিচিত। দুঃখজনক হলেও সত্য, রাজধানী ও আশপাশের বড় বিপণিবিতানগুলোর শত শত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এই নিবন্ধন নেই বলে জানা গেছে। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তরের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটিরই বিআইএন নেই। অর্থাৎ নিবন্ধন ছাড়াই দিব্যি ব্যবসা করে যাচ্ছে তারা।

রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর নামকরা ১৭টি বিপণিবিতানে ওই জরিপ করে ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর। গত ২৪ থেকে ৩১ মে ভ্যাট গোয়েন্দাদের চারটি দল জরিপটি চালায়। জরিপের ফল বলছে, ভ্যাট গোয়েন্দারা বিপণিবিতানগুলোর ২ হাজার ১৩৩টি দোকানে গিয়ে মাত্র ৪৮২টিতে ভ্যাট নিবন্ধন থাকার প্রমাণ পেয়েছেন। বাকি ১ হাজার ৬৫১টি প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়াই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তার অর্থ হচ্ছে- ৭৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ দোকানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই। আরেকটা মজার আবিস্কার হচ্ছে, দোকানি বা পণ্য বিক্রেতারা ক্রেতার কাছ থেকে ভ্যাট নিলেও তা ঠিকভাবে সরকারি কোষাগারে জমা পড়ে না। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা করার কোনো সুযোগই থাকার কথা নয়।

পত্রিকান্তরে জানা গেছে, ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর শুধু দেখতে চেয়েছে কারা ভ্যাট নিবন্ধন নেননি, ভয়ভীতি দেখানোর জন্য নয়। যেসব প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধন পায়নি বা নেয়নি, তাদের নিবন্ধন নেওয়ার অনুরোধ করেছে ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর।

প্রীতিকর বিষয় হচ্ছে, জরিপের পর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভ্যাট নিবন্ধন নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। জরিপের পরের এক মাসে ভ্যাট নিবন্ধন নেওয়ার সংখ্যা পাঁচগুণ বেড়েছে।

জরিপে জানা গেছে, ৪৮২টি প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন আছে, তাদের মধ্যে নিয়মিত রিটার্ন দেয় ৪৪৫টি। নিয়মিত রিটার্ন প্রদানকারীদের মধ্যে আবার মাসে ৫ হাজার টাকার বেশি ভ্যাট দেয় এমন প্রতিষ্ঠান মাত্র ১১৩টি। বাকিগুলো ৫ হাজার টাকার কম ভ্যাট দেয়।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৮টি অভিজাত বিপণিবিতানের ১ হাজার ৬৪টি দোকানে জরিপ করা হয়। এর মধ্যে মাত্র ৪৮২টি প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন আছে। ভ্যাটের আওতায় আছে মাত্র ৪০ শতাংশ। এক দশকের বেশি সময়ের পুরোনো সুবাস্তু নজর ভ্যালি শপিংমলের ৫২৬টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২৬টির ভ্যাট নিবন্ধন আছে। ধানমন্ডির সানরাইজ প্লাজায় ৫৫টি দোকানের মধ্যে মাত্র ২৫টির ভ্যাট নিবন্ধন আছে।

নতুন ভ্যাট আইন অনুযায়ী, অবস্থান নির্বিশেষে দেশের যে কোনো এলাকায় সুপারশপ বা কোনো শপিংমলে কোনো ব্যবসা চালু করতে হলে বাধ্যতামূলক ভ্যাট নিবন্ধন নিতে হবে। এসব এলাকার বাইরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক লেনদেন ৩ কোটি টাকার কম হলে ভ্যাট নিবন্ধন নিতে হবে না।

অন্যান্য বিকাশমান দেশের মতো ব্যক্তি বা পরিবারের ভোগ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে মূল্য সংযোজন কর বা পরোক্ষ করই যে হবে বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতিতে রাজস্ব আয়ের প্রধান ক্ষেত্র, তাতে সন্দেহ নেই। যে দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তির আয়ের সঙ্গে ভোগ, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা ব্যয় বা ভ্রমণ ব্যয়ের খুব একটা মিল নেই, সেখানে ব্যয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজন করই ভরসা। কিন্তু শুরুতেই বলেছি, আমরা ভ্যাট আদায় বাড়াতে পারছি না, তথাপি দোকান বা ক্রয় পর্যায়ে যে ভ্যাট আদায় হয় তাও পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হচ্ছে না। নতুন বাজেট ঘোষণার পরও দেখেছি অনেক এসি রেস্টুরেন্টে ১০ শতাংশের স্থলে ১৫ শতাংশ ভ্যাট নেওয়া হচ্ছে। সমান পরিমাণ অর্থ যে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাবে না, তা প্রায় নিশ্চিত। তদুপরি নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক দ্রব্যের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলেও কিছু কিছু বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান বা সুপারস্টোর এখনও ওইসব পণ্যের ওপর ভ্যাট আদায় করছে। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ থেকে ভোক্তা তথা সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে হলে নজরদারি বাড়াতে হবে। সহায়তা নিতে হবে প্রযুক্তির। ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পটির চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবায়নের পথে বাধাগুলোর পুনর্মূল্যায়ন করে প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়নও জরুরি।

আমাদের যে হারে বেসরকারি শিক্ষা, চিকিৎসা, ভ্রমণ এবং ভোগ ব্যয় বাড়ছে, তাতে করে সঠিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার যে অনায়াসে চলতি অর্থবছরে ১ লাখ ২৭ হাজার ৭০০ কোটি টাকার অনেক বেশি ভ্যাট আদায় করতে পারবে, তাতে সন্দেহ নেই। যারা উন্নতমানের পণ্য কিনবেন, এসি রেস্টুরেন্টে খাবেন বা উন্নতমানের সেবা গ্রহণ করবেন তথা বেশি দামের পণ্য কিনবেন, তারাই বেশি ভ্যাট দেবেন। একটি বৈষম্যমূলক সমাজে দ্রুত ব্যক্তি-পুঁজির সংবর্ধনকালে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকেও তা একদিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

অর্থনীতি বিশ্নেষক

মন্তব্য করুন