করোনাকালে ঘরে বসে বসে থিতিয়ে যাচ্ছিল মনটা। সপ্তাহে দু-একদিন অফিস আর না হয় বাসা, এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়েছে। আর কোনো কিছু করারও নেই। অনেক দিন কোথাও বেড়াতে যাওয়া হচ্ছে না। তাই চিন্তা করে আমার স্বামী বললেন চলো আমরা তিন-চার দিনের জন্য একটা শর্ট ট্রিপে কোথাও যাই। কোথায় যাব? ঠিক করলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাচারি বাড়ি পতিসর দেখা হয়নি, সেখানেই যাই। এর আগে শিলাইদহ ও শাহজাদপুর গিয়েছি কবিগুরুর কুঠিবাড়ি ও কাচারি বাড়ি দেখতে। রওনা হওয়ার আগে ঠিক করলাম আমরা রাজশাহী হয়ে নওগাঁয় পতিসর দেখে বগুড়া হয়ে ঢাকায় ফিরব। মে মাসের এক বিকেলে রওনা হলাম রাজশাহীর উদ্দেশে। সার্কিট হাউসে পৌঁছাই রাতে। জেলা জজ, জেলা প্রশাসক ও রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি আমার স্বামীর সঙ্গে রাতে সার্কিট হাউসে সাক্ষাৎ করতে আসেন। রাজশাহীতে তখন করোনার প্রকোপ ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। পরের দিন সকাল ১০টায় নওগাঁর উদ্দেশে আমরা রওনা হই। আমাদের সঙ্গে নওগাঁয় যুক্ত হওয়ার কথা ছিল আমার বড় ভাই অধ্যাপক ডা. আব্দুল মতিন এবং তার বন্ধু অধ্যাপক ডা. মাকসুদুল হকের। তারা এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন বিকেলে। রাজশাহী থেকে নওগাঁ ৭৮ কিলোমিটার। নওগাঁর জেলা প্রশাসক আমার স্বামীকে বলেছিলেন, রাজশাহী থেকে নওগাঁ আসার পথে আমরা যেন কুসুম্বা মসজিদটি দেখে আসি। কুসুম্বা মসজিদটি রাজশাহী ও নওগাঁর মাঝামাঝি অবস্থানে। রাজশাহী থেকে নওগাঁর দিকে ৪৬ কিলোমিটার এবং নওগাঁ থেকে রাজশাহীর দিকে ৩২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

যাত্রাপথে কুসুম্বা মসজিদটি দেখে যাব ঠিক করলাম। পিচঢালা পথ দিয়ে চলছে গাড়ি। আকাশে আলো-আঁধারির খেলা। এই বৃষ্টি এই রোদ। প্রধান সড়ক থেকে অল্প কিছু ভেতরে মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদটি কুসুম্বা নামক গ্রামে অবস্থিত বলেই এর নাম কুসুম্বা মসজিদ। গ্রামটি নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার কুসুম্বা ইউনিয়নের অন্তর্গত। গ্রামটির পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে আত্রাই নদী। কুসুম্বা গ্রামটি নিম্নাঞ্চল, আত্রাই নদীর অববাহিকা। শুধু নওগাঁ জেলাই নয়, বৃহত্তর রাজশাহী জেলার এক বিরল স্থাপত্য ও প্রত্ননিদর্শন এই কুসুম্বা শাহি মসজিদ। রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থিত কুসুম্বা গ্রামটির প্রাকৃতিক নয়নাভিরাম দৃশ্য নৈসর্গমণ্ডিত। গ্রামটির নামকরণ নিয়ে নানারকম জনশ্রুতি আছে। এর একটি গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হোসাইন শাহের বেগম কুসুম বিবি বিশেষ কারণে এ অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করেন। তার নামানুসারে গ্রামটির নামকরণ করা হয় কুসুম্বা। পরে কুসুম বিবির নাম অনুসারে মসজিদটি এবং পরে এলাকার নামও রাখা হয় কুসুম্বা। তবে এর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই বলে জানা যায়। কথিত আছে, বিগত ১৫০০ সালে এখানে মসজিদটি নির্মিত হয়। মসজিদটির ভেতরের কারুকার্য অপরূপ সুন্দর। মসজিদটির তিনটি প্রবেশদ্বার আছে। চোখে পড়ল এক অদ্ভুত জিনিস। তিনটি প্রবেশদ্বারেই রয়েছে মৌচাক। প্রতি বছরেই নাকি মৌমাছি এভাবে বাসা বাঁধে। প্রথম দুটি দ্বার দিয়ে পুরুষ মানুষ মসজিদে প্রবেশ করে এবং তৃতীয় দ্বারটি দিয়ে নারীরা মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য প্রবেশ করে থাকেন। তিনটি গম্বুজ আছে মসজিদটিতে। মসজিদের ভেতরে একটি সিঁড়ি দেখা গেল যা দ্বারা কিছুটা ওপরে ওঠা যায়। সেখানে একটা চৌকোনাকৃতি ছাদের মতো জায়গা আছে, সেখানেও নামাজ পড়া যায়। এর ভেতরের নকশাও খুব সুন্দর। এই কুসুম্বা মসজিদের ছবিই আমাদের ৫ টাকার নোটে ছাপা হয়েছে। মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা বেশ ভালো বলে মনে হলো। সেখানকার অর্থাৎ মান্দা উপজেলা প্রশাসন মসজিদটির দেখভাল করে। জানা যায়, এই মসজিদে দূরদূরান্ত থেকে বিভিন্ন এলাকার মানুষ মানত করতে আসেন। তারা কয়েক দিন মসজিদের আশপাশে অবস্থান করেন। যারা মানত করতে দূরদূরান্ত থেকে কুসুম্বা মসজিদে আসেন, তারা এখানে কয়েক দিন অবস্থান করেন বলে এখানে তাদের সুবিধার্থে কিছু দোকানপাট গড়ে উঠেছে। মসজিদটির পাশে কিছুটা দূরত্বে একটা তেঁতুল গাছ দেখতে পেলাম। স্থানীয়রা বললেন তেঁতুল গাছটি শতবর্ষী। তেঁতুল গাছটি নিয়েও অনেক কাহিনি প্রচলিত আছে স্থানীয়ভাবে। মসজিদের সামনে বেশ বড় একটা দিঘি আছে। সর্বোপরি মসজিদের পরিবেশ খুব সুন্দর। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মসজিদ এলাকায় একটি ডাকবাংলো নির্মাণ করা হয়েছে। আমরা কুসুম্বা মসজিদে পৌঁছালে সেখানে ইউএনও এবং সেই ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান আমাদের অভ্যর্থনা জানান এবং আমাদের মসজিদ এবং এর আশপাশ এলাকা ঘুরে দেখান। তাদের আন্তরিকতায় আমরা মুগ্ধ।

কুসুম্বা মসজিদটির প্রত্নতাত্ত্বিক নকশা দেখে আমরা সত্যিই খুব অভিভূত হয়েছি। ৬০০ বছর আগের একটি স্থাপত্য অত্যন্ত ভালোভাবে স্থাপন করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কৃতিত্ব। মসজিদটি যেন আরও যুগ যুগ ধরে এর প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এবং সৌন্দর্য ধরে রাখতে পারে, সেই রকম ব্যবস্থা নিশ্চিত থাকুক। মসজিদটির প্রত্নতাত্ত্বিক সৌন্দর্য ধরে রাখতে পারলে দেশ-বিদেশ থেকে এখানে আরও অনেক পর্যটক আসবেন ধারণা করা যায়।

সদস্য (অর্থ) নির্বাহী বোর্ড, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ

মন্তব্য করুন