দেশের নদ-নদীর বর্তমান সংকট ও তার সম্ভাব্য সমাধানপথ সম্পর্কে আমরা মোটামুটি ওয়াকিবহাল; কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে যখন আন্তঃসীমান্ত বা অভিন্ন নদীর সংকটের সমাধান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন থমকে যেতে হয়। দেশভাগের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জটিল আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থার সহজ সমাধান কি আসলেই আছে?

বস্তুত সমাধানসূত্র বের করার বিকল্পও নেই। যে কোনো দেশ বা অঞ্চলের নদ-নদীই সেখানকার প্রতিবেশ, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেই নদী যদি একাধিক দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, তাহলে এর সঙ্গে যুক্ত হয় কূটনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব। বাংলাদেশের জন্য এমন আন্তঃসীমান্ত বা অভিন্ন নদী আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের সবগুলো নদীই চূড়ান্তভাবে আন্তঃসীমান্ত নদ-নদীর ওপর নির্ভরশীল। দাপ্তরিকভাবে স্বীকৃত ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদীসহ সীমান্ত অতিক্রমকারী শতাধিক ছোট-বড় প্রবাহে যদি বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে দেশের সব নদী অন্তত পানিস্বল্পতায় ভুগবে না। প্রশ্নটা হচ্ছে, এই অধিকার প্রতিষ্ঠার উপায় কী?

স্বীকার করতে হবে, দেশের অভ্যন্তরে প্রবাহিত নদ-নদী 'অভ্যন্তরীণ' নানা সংকটে ভুগছে। যেমন দখল, দূষণ, ভাঙন, নির্বিচার বালু উত্তোলন, মৎস্যসম্পদ বিনাশ, অপরিকল্পিত স্থাপনা প্রভৃতি। কিন্তু তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, এসব সংকটের সূচনা হয় প্রবাহস্বল্পতা থেকে। নদী যখন মরতে বসে, তখনই দখল শুরু হয়। প্রবল প্রবহমান নদী কখনোই দখলের শিকার হয় না। আর দখলের হাত ধরে আসে আবাসিক ও বাণিজ্যিক তৎপরতা। আবাসন ও বাণিজ্যের প্রয়োজনে শুরু হয় দূষণ, বালু উত্তোলন, অপরিকল্পিত স্থাপনা। প্রবাহ হারানো কিংবা বালু উত্তোলনে ক্ষত-বিক্ষত নদীতে বর্ষাকালের আগে-পরে দেখা দেয় ভাঙন। বাংলাদেশের নদ-নদীর এই হলো 'দুষ্ট চক্র'।

দুষ্ট চক্রের গোড়া প্রবাহস্বল্পতার নেপথ্যে থাকে সব নদীর চূড়ান্ত উৎস আন্তঃসীমান্ত নদীর উজানে ড্যাম, ব্যারাজ, প্রবাহ ঘুরিয়ে দেওয়া, সেচ প্রকল্প, খনি, বিসবুজীকরণ প্রভৃতি তৎপরতা। আর উজানের দেশের এসব কর্মকাণ্ডে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ নেই।

স্বীকার করতে হবে, আন্তঃসীমান্ত নদ-নদী বিষয়াবলি দেখভালের জন্য রয়েছে 'ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন'। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতার কথা এক্ষেত্রে স্মরণ করতেই হবে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা করেই বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, সবকিছুর আগে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর বিধিব্যবস্থা করতে হবে। যে কারণে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আড়াই মাসেরও কম সময়ে যৌথ নদী কমিশন গঠন নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, পঁচাত্তরের মর্মান্তিক পট পরিবর্তনের পর তৎকালীন সরকারের অপরিণামদর্শিতায় খোদ যৌথ নদী কমিশন ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়।

গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রবাহিত আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে একমাত্র আইনি রক্ষাকবচ ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি। ৩০ বছর মেয়াদি সেই চুক্তির মেয়াদও ২০২৬ সালে ফুরিয়ে যাবে। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি চূড়ান্ত হয়েও ২০১১ সাল থেকে ঝুলে আছে। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন এবং তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি বাংলাদেশ গত কয়েক বছর ধরে প্রতিটি শীর্ষ বৈঠকে আলোচনার টেবিলে তুলছে। কিন্তু ভারত নানা অজুহাতে এড়িয়ে যাচ্ছে। সংগত কারণে ভারত যে বিষয়ে আগ্রহী, সেই ফেনী নদীর পানি বণ্টনের চুক্তির বাস্তবায়নও ঝুলিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ।

প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবেই চলতে থাকবে? আন্তঃসীমান্ত নদী বিষয়ে অচলাবস্থায় ভাটির দেশেরই ক্ষতি হয় সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ-ভারতের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। গঙ্গার উজানের বিভিন্ন স্থানে ক্রমবর্ধমান হারে পানি প্রত্যাহার, তিস্তার পানি মহানন্দা হয়ে আরও পশ্চিমে সরিয়ে নেওয়া ছাড়াও তলে তলে চলছে সর্বনাশা আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের খণ্ড খণ্ড বাস্তবায়ন। ওদিকে সবচেয়ে বড় আন্তঃসীমান্ত নদী ব্রহ্মপুত্রে চীন যেমন একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তেমনই ভারত শুরু করেছে একাধিক জলাধার ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের তোড়জোড়। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে গঙ্গা ও তিস্তার পর ব্রহ্মপুত্রেও অনিবার্যভাবে দেখা দেবে প্রবাহস্বল্পতা। যত দিন যাবে, পরিস্থিতির অবনতিই হতে থাকবে।

নদ-নদীর ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা যখন পথ হারায়, তখন ভাটির দেশের জন্য রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ায় আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো। এমনই একটি সনদ 'কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য নন-নেভিগেশনাল ইউজেস অব ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার কোর্সেস'। বাংলায় সংক্ষেপে 'জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ সনদ, ১৯৯৭' নামে পরিচিত। এই সনদ বা কনভেনশন বিশেষভাবে আন্তঃসীমান্ত বা অভিন্ন নদীর বিশ্বস্বীকৃত সুরক্ষা কবচ। যে কোনো ভাটির দেশের জন্য প্রায় অব্যর্থ আইনি কাঠামো। এতে স্পষ্টভাবে মানুষের অধিকার রক্ষায় নদীর অধিকারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

১৯৯৭ সালে জাতিসংঘে পাস হওয়া এই সনদ অনেক দিন পর্যন্ত 'অকার্যকর' ছিল। কারণ কনভেনশনের নিয়ম অনুযায়ী অন্তত ৩৫টি দেশ অনুসমর্থন বা সংসদে 'রেটিফাই' করলে তার ৯০ দিন পর সনদটি কার্যকর হওয়ার কথা। ২০১৪ সালের ১৯ মে ভিয়েতনাম ৩৫তম দেশ হিসেবে এ সনদ অনুসমর্থন করে। ফলে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব সনদটি পরবর্তী ৯০ দিবসের অব্যবহিত পরে কার্যকর হওয়ার ঘোষণা দেন। সেই হিসাবে ২০১৪ সালের ১৭ আগস্ট থেকে সনদটি কার্যকর হয়েছে।

এমন একটি কনভেনশন নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি উৎসাহী হওয়ার কথা ছিল। দুর্ভাগ্যবশত সনদটি পাসের সময় বাংলাদেশ এর পক্ষে ভোট দিলেও জাতীয় সংসদে এর অনুসমর্থন দশকের পর দশক ঝুলে রয়েছে। কারণ অজ্ঞাত। যদিও রিভারাইন পিপলসহ বাংলাদেশের নদী ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো প্রথম থেকেই এই দলিল অনুসমর্থনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে।

এখানেই শেষ নয়। ভাটির দেশ হিসেবে আন্তঃসীমান্ত নদ-নদীর ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ সৃষ্টি করেছে আরেকটি কনভেনশন। এর পোশাকি নাম 'কনভেনশন অন দ্য প্রোটেকশন অ্যান্ড ইউজ অব ট্রান্সবাউন্ডারি ওয়াটারকোর্সেস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল লেইকস'। সংক্ষেপে বলা হয় 'ওয়াটার কনভেনশন'। বাংলায় বললে 'পানি সনদ'। আগেরটার নাম যেমন সংক্ষেপে 'পানিপ্রবাহ সনদ'। এই সনদ আরও পুরোনো- ১৯৯২ সালে জাতিসংঘে পাস হয় এবং ১৯৯৬ সাল থেকে কার্যকর হয়।

'ওয়াটার কনভেনশন' আরও নানা দিক থেকে পানিপ্রবাহ সনদের চেয়ে সহজ, কার্যকর ও সুবিধাজনক। যেমন ১৯৯৭ সালের সনদে 'আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ' বলা হলেও ১৯৯২ সালের সনদে সরাসরি 'আন্তঃসীমান্ত পানিপ্রবাহ' বলা হয়েছে। যেমন দ্বিতীয়টিতে আন্তঃসীমান্ত নদীতে সব দেশের অধিকার এবং তা আদায়ের উপায় ও উপকরণ সম্পর্কে বেশি বিস্তারিত বলা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, ১৯৯৭ সালের সনদ বাস্তবায়নকারী কোনো নির্ধারিত সংস্থা নেই; কিন্তু ১৯৯২ সালের সনদ বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত সংস্থা রয়েছে- ইউএনইসিই। প্রথমটির জন্য 'কনফারেন্স অব পার্টিজ' আয়োজনের ব্যবস্থা না থাকলেও দ্বিতীয়টিতে প্রতি তিন বছর অন্তর এই আয়োজন করা হয়।

একটিই শুধু অসুবিধা ছিল। ১৯৯২ সালের কনভেনশন গোড়াতে কেবল ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ২০০৩ সালে এটা বৈশ্বিক সনদ করার প্রস্তাব করা হয়। ২০১৫ সালে তা জাতিসংঘে পাসও হয়। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে এই সনদ এখন ইউরোপের বাইরের দেশও স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করতে পারে। যেমন ২০১৮ সালে চাদ ও সেনেগাল, ২০২০ সালে ঘানা এই সনদ স্বাক্ষর করে। ২০২১ সালে যে 'কপ' আয়োজিত হয়, সেখানে আমারও সুযোগ হয়েছিল অনলাইনে যুক্ত থাকার। দেখলাম এ বছর নতুন স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে যোগ দিল গিনি-বিসাউ ও টোগো।

বলা বাহুল্য, সহজ ও সুবিধাজনক হওয়ার কারণে ওয়াটার কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশের সংখ্যা দ্রুতই বাড়ছে। ১৯৯৭ সালের সনদ যেখানে ৩৬ দেশে আটকে আছে, সেখানে ১৯৯২ সালের সনদে ইতোমধ্যেই ৪৭টি দেশ স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করেছে।

এ নিয়ে পরে বিস্তারিত লিখব। এখনকার কথা হচ্ছে- বাংলাদেশ ১৯৯৭ সালের সনদে অনুসমর্থনের বেলায় সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ১৯৯২ সালের সনদ যখন সুযোগ তৈরি করেছে, তখনও বসে থাকবে? আন্তঃসীমান্ত নদীর এমন রক্ষাকবচ হেলায় ফেলে রাখব আমরা? কথায় আছে, সময় ও নদীর স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না। আন্তঃসীমান্ত নদীর স্রোত আরও বেশি দ্রুতগামী। বাংলাদেশের মতো নদীনির্ভর দেশের ক্ষেত্রে তা আত্মঘাতেরই নামান্তর।

লেখক ও গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল
skrokon@gmail.com

মন্তব্য করুন