সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসেবে সর্বক্ষেত্রে ডিজিটাইজেশন দ্রুত এগিয়ে চলেছে। সেই সুযোগে দেশের সর্বত্র গড়ে উঠেছে প্রচুর ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। এ ব্যবসা শুরু করতে তেমন কিছুর প্রয়োজন নেই। একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বা পেজ অথবা একটি ওয়েবসাইট থাকলেই চলে। এর বাইরে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)-এর সদস্য হলে আর কোনো সমস্যাই থাকে না। সুষ্ঠু নজরদারি ও বিদ্যমান নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন না থাকায় অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ব্যবসার নামে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করছে। এতে বিপদে পড়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা শত শত উদ্যোক্তা ও গ্রাহক।

বিশ্বব্যাপী ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়লেও আমাদের দেশে এ খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডে গ্রাহকের হতাশা বাড়ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি অনলাইন ব্যবসার উন্নয়ন, আস্থা ধরে রাখাসহ ডিজিটাল ব্যবসা পরিচালনায় একটি নীতিমালা ঘোষণা করেছে। তবে নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে সরকার ও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অনীহা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ভোক্তাস্বার্থ দেখার বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। ক্রেতার আস্থা ব্যবসায় বড় পুঁজি হিসেবে বিবেচিত। ইভ্যালিসহ অন্যান্য ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান সেই আস্থা ও সুনাম ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এর আগেও এভাবে নানা লোভনীয় অফার দিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়েছিল। এমন দৃষ্টান্ত থাকা সত্ত্বেও সরকার ও গ্রাহকরা সতর্ক হয়নি- এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের বিরুদ্ধে তিনটি ধারায় অপরাধের কথা বলা হয়েছে। ফৌজদারি দণ্ডবিধির ধারাগুলো হচ্ছে ৪২০, ৫০৬ ও ৪০৬। দণ্ডবিধির ৪২০ নম্বর ধারায় প্রতারণা করে সম্পত্তি বা অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ অপরাধে একজন ব্যক্তির সাত বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড ও উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। ৪০৬ নম্বর ধারায় 'বিশ্বাসঘাতকতা'র অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছর জেল, অর্থ জরিমানা ও উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। ৫০৬ নম্বর ধারায় ভিকটিমকে 'হত্যা বা আঘাত করার ভয়ভীতি' দেখানোর অপরাধের কথা বলা হয়েছে। এ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছর নির্ধারিত। এসব মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের স্বার্থ কতটুকু রক্ষা হবে? তারা অর্থ ফেরত পাবেন কিনা, সে নিশ্চয়তা নেই।

অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ অনুযায়ী, ক্রেতা যেসব বিষয়ে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন, তা হলো বিক্রেতার পণ্যের মোড়ক ব্যবহার না করা, মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করা, সেবার তালিকা সংরক্ষণ ও প্রদর্শন না করা, অধিক মূল্যে পণ্য বিক্রয় করা, পণ্য মজুদ করা, ভেজাল পণ্য বিক্রয়, খাদ্যপণ্যে নিষিদ্ধ দ্রব্যের মিশ্রণ, অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন, মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা প্রতারণা, প্রতিশ্রুত পণ্য সরবরাহ না করা, ওজন ও পরিমাপে কারচুপি, দৈর্ঘ্য পরিমাপের ক্ষেত্রে গজফিতায় কারচুপি, নকল পণ্য প্রস্তুত, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রয় এবং অবহেলা। কিন্তু এ আইনে অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান থাকলেও গ্রাহকের আর্থিক ক্ষতিপূরণ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।

প্রচলিত পদ্ধতিতে পণ্য কেনার সঙ্গে সঙ্গে মূল্য পরিশোধ করতে হয়। দেশে কিস্তিতে ও বাকিতে পণ্য কেনার সুযোগও তৈরি হয়েছে এখন। 'ক্যাশ অন ডেলিভারি' পণ্য সরবরাহ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম পরিশোধ। কিন্তু ইভ্যালি এসব পথে হাঁটেনি। ইভ্যালি থেকে পণ্য কিনতে গেলে দাম পরিশোধ করতে হয় আগে। এভাবে লাখো গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নিয়েছে ইভ্যালি। পণ্য এবং অর্থ না পেয়ে এই বিপুলসংখ্যক গ্রাহক এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। এর দায়ভার সরকারের সংশ্নিষ্ট সংস্থাকেই নিতে হবে। ভুক্তভোগী গ্রাহকের আর্থিক ক্ষতি দ্রুত মিটিয়ে দিতে উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়াও ভোক্তাকে শিক্ষা ও সচেতনতায় জোর দিতে হবে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের চটকদার ও লোভনীয় বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে ক্রয়াদেশের পণ্য হাতে পাওয়ার আগেই অগ্রিম টাকা পাঠানোর বিষয়ে ক্রেতাকে যথেষ্ট সতর্ক হতে হবে। তারা যদি অতিলাভের প্রলোভনে বারবার পা দেন, তাহলে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে এ ধরনের প্রতারণা রোধ করা কঠিন।

ব্যবসার আড়ালে কোনো ব্যক্তি গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণার চেষ্টা করলে যাতে সফল হতে না পারে, তেমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইন ব্যবসায়ীদের যেসব প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, বিশেষ করে ই-ক্যাবসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও এমন প্রতারণামূলক ঘটনার দায় নিতে হবে। তবে এ খাতে সবাই প্রতারণায় জড়িত, এটা বলা সঠিক হবে না। গুটিকয়েক প্রতারকের কারণে কেন পুরো ই-কমার্স ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশে ই-কমার্সের বিকাশে সবাইকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।

ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
cabbd.nazer@gmail.com

মন্তব্য করুন