উত্তরাধিকার শব্দটি যেমন গভীর তেমনি তাৎপর্যপূর্ণ। এ ভূখণ্ডের দীর্ঘ ইতিহাসে নানা পর্বে অসামান্য অবদান রাখা দেশবরেণ্যদের উত্তরাধিকার আমরা। তাদের দেশপ্রেম, ত্যাগ, নির্লোভ-নির্মোহ জীবনকে আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ ও অনুসরণ করে থাকি। মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠায় আজীবন অবিচল বরেণ্য ব্যক্তিদের পাশাপাশি আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, সৃজনশীলতায় অবদান রাখা খ্যাতিমানদেরও উত্তরাধিকার আমরা। আমাদের যাবতীয় কর্ম ও আচরণে সর্বদা তা প্রকাশও করে থাকি।

আমাদের ইতিহাসখ্যাত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকাও নগণ্য নয়। নানা ক্ষেত্রে অবদান রাখা বরেণ্য ব্যক্তিত্ব সংখ্যায়ও ব্যাপক। তারা যে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য লাভ করেননি, সেটা যেমন সত্য নয়। আবার সবাই যে পেয়েছেন, সেটাও সঠিক নয়। অনেকের ভাগ্যে জুটেছে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। জীবদ্দশায় তাদের অনেকেরই রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য জোটেনি; বিপরীতে প্রাপ্তিযোগ রাষ্ট্রীয় খÿ। এর পেছনের কারণও স্পষ্ট। যারা বিদ্যমান বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা ও আমলাতান্ত্রিক-গণবিরোধী রাষ্ট্রের পতনে নিজেদের যুক্ত করেছিলেন; সংগত কারণেই তাদের রাষ্ট্র ও শাসকদের রোষানলে পড়তে হয়েছে। তাদের প্রতি রাষ্ট্রের চরম বিরূপতার প্রকাশ ঘটাই স্বাভাবিক। আমাদের অনেক মনীষী শাসকদের কাছে আত্মসমর্পণ করে শাসকনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবী হয়েছেন। পেয়েছেন অনাবিল রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য। পার্থিব প্রাপ্তিও। যারা মেরুদণ্ড শক্ত রাখতে পেরেছেন তারা রাষ্ট্র ও শাসকদের শত্রুতে পরিণত হয়েছেন; তা অতীতে যেমন, আজও তেমনি।

উপমহাদেশের প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় এসেছিলেন। আজন্ম সংগ্রামী, নীতিনিষ্ঠ হেমাঙ্গ বিশ্বাস ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় নিজের সাফল্য নিয়ে অনেক কথা বলেছিলেন। পাশাপাশি ক্ষোভ ও হতাশায় বলেছিলেন, তার গান তার পরিবারের সদস্যরা শোনে না। তার সে আক্ষেপের কথাটির বাস্তবিক প্রমাণ পেয়েছিলাম হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্মশতবর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটির সংশ্নিষ্টতায়। ঢাকায় তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে এ বিপ্লবী শিল্পীর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপিত হয়েছিল। জাতীয় কমিটির উদ্যোগে তার মেয়ে রঙিলা বিশ্বাসকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। ধানমন্ডিস্থ রবীন্দ্র সরোবরের অনুষ্ঠানে বক্তৃতাও করেছিলেন। তার বাবার গান ঢাকায় গাওয়া হয়, জেনে আবেগে আপ্লুত হয়েছিলেন।

রঙিলা বিশ্বাসের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম তখন। ওই সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, 'আপনার বাবার রাজনৈতিক মতাদর্শিক চেতনাকে আপনি ধারণ করেন কি?' উত্তরে রঙিলা বিশ্বাস বলেছিলেন, 'দেখুন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সেই মতাদর্শেরও পতন ঘটেছে। সে মতাদর্শ তো এখন চুকেবুকে গেছে। সে মতাদর্শ এখন অচল। তাই সে প্রসঙ্গে ভাবার আর অবকাশ কোথায়?' এ কথা শুনে মস্তিস্কে বজ্রপাতের মতো ঝাঁকুনি অনুভব করি। রঙিলা বিশ্বাসকে কে চিনত? তার পিতৃপরিচয় ব্যতীত! হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মেয়ে বলেই তাকে আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। আমৃত্যু অবিচল মতাদর্শী, ত্যাগী বাবার উত্তরাধিকাররূপে সমাজে প্রচার-প্রতিষ্ঠা পেলেও বাবার মতাদর্শ ধারণ-পালনের বিপরীতে সুবিধাবাদিতার বৃত্তে নিজেকে সমর্পণ করেছেন। তার আত্মপরিচয় হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কন্যার দাবিটি তাই বাবার যোগ্য উত্তরাধিকাররূপে গণ্য হতে পারে না। রঙিলা বিশ্বাসদের তালিকা কিন্তু ক্ষুদ্র নয়, বিশাল; যারা বাবা-মায়ের খ্যাতিকে পুঁজি করে সমাজে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা অর্জনকে প্রধান করে তুলেছেন প্রকৃত 'উত্তরাধিকার' পরিত্যাগে।

অভিজ্ঞতার বৈপরীত্যও কম নয়। আমাদের অনেক ত্যাগী-দেশবরেণ্যর পরিবার নির্মম অর্থনৈতিক চাপেও নতি স্বীকার না করে বাবা-মায়ের সুযোগ্য উত্তরাধিকাররূপে নিজেদের প্রমাণ দিয়ে এসেছে। বাবার ত্যাগের পাশাপাশি সন্তান ও পরিবারের আর্থিক অনটনে মানবেতর জীবন কাটাতে হয়েছে। বাবার পথ অনুসরণ করে পার্থিব লোভ-মোহ ত্যাগ করে প্রকৃত উত্তরাধিকাররূপে অবিচল থেকেছেন। যাদের খোঁজ-খবর রাষ্ট্র, সমাজ, শাসক সরকার নেয়নি। আর না নেওয়াটাই শাসক-সংস্কৃতি। খড়-কুটোর মতো ভাসতে ভাসতে কেউ তীরে পৌঁছেছে, অনেকে পারেনি; কালের স্রোতে হারিয়ে গেছে। তারাও যেচে নিজেদের উত্তরাধিকার পরিচয় প্রকাশে মানুষের সহানুভূতি, রাষ্ট্রের আনুকূল্য লাভের চেষ্টা করেনি। অথচ সমাজের অগ্রসর মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে উত্তরাধিকার পরিচয়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্বীকৃতি-মুনাফাপ্রত্যাশীদের আমাদের চারপাশে অহরহ দেখে থাকি। তাই মতাদর্শিক চেতনার উত্তরাধিকারীর সংখ্যা অনায়াসে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর।

একবার কলকাতায় এক বিজ্ঞজন আমাকে হতাশার সুরে বলেছিলেন, 'তোমাদের পূর্ববঙ্গে বাঙালি মনীষীদের বড়ই অভাব। তোমাদের আবেগ-উচ্ছ্বাসের ঘাটতি নেই। কিন্তু জ্ঞানের পরিসর খুবই সংকীর্ণ। সে ক্ষেত্রে পশ্চিমবাংলা সর্বক্ষেত্রে অগ্রসর।' তার প্রশ্নে আমি কিছুটা বিব্রত হলেও তাৎক্ষণিক তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'বলুন তো, পশ্চিমবঙ্গে সর্বক্ষেত্রে অবদান রাখা বাঙালি মনীষীদের কত শতাংশ পূর্ববঙ্গীয় এবং কত শতাংশ পশ্চিমবঙ্গীয়?' আমার এ কথায় ভদ্রলোকের মুখ কালো হয়ে গিয়েছিল। সুযোগটি হাতছাড়া না করে তাকে জোরের সঙ্গে বলেছিলাম, 'শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র- সর্বক্ষেত্রে যাদের নিয়ে গর্ব করেন, তাদের সিংহভাগ কিন্তু পূর্ববঙ্গীয়। ক্ষমতার রাজনীতির পাশা খেলায় ক্ষমতার ভাগাভাগিতে ঘটেছিল মর্মান্তিক দেশভাগ। তাতে ঘটেছিল উচ্ছেদ, বিচ্ছেদ ও উৎপাটনের মহা ট্র্যাজেডি। দেশভাগের কারণে আমাদের মনীষীরা আপনাদের দেশে এসে শরণার্থী হয়েছিলেন। আশ্রয়হীন নানা ঘাত-প্রতিঘাতের পরও তারা নিজেদের অধ্যবসায়ে আপনাদের ও আপনাদের দেশকে ঋদ্ধ করেছেন। তাদের নিয়েই আপনারা আজ গর্ব করেন। তাদের প্রকৃত উত্তরাধিকারী কিন্তু আপনারা নন; আমরাই।'

আমাদের দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের তালিকার বিবরণ তাকে বলার প্রয়োজন মনে করিনি এ জন্য যে, তাদের অনেকের নাম ও অবদানের কথা বোধ করি ভদ্রলোক জানেনই না। এক সময়কার অভিন্ন ভূখণ্ড এখন তো দুই পৃথক রাষ্ট্রের অধীনে পরিণত। আমরা পশ্চিমবঙ্গের জ্ঞানী-গুণীদের বিষয়ে যতটা জ্ঞাত; তারা তো আমাদের ক্ষেত্রে ততটাই অজ্ঞাত। আমার জবাবে বেচারা চুপসে গিয়েছিলেন।

একটি ভূখণ্ডের মানুষের মেধা-মনন, সৃজনশীলতার বিকাশে যারা অবদান রেখে এসেছেন, তাদেরই প্রকৃত উত্তরাধিকারী সেই ভূখণ্ডের মানুষ। তাদের উত্তরাধিকারীরূপে গণ্য-মান্য করা শুধু আবশ্যিক নয়, অপরিহার্যও বটে। এ ক্ষেত্রে আমরা বড়ই অকৃতজ্ঞ জাতি বললে ভুল হবে না। অর্থ-সম্পদের উত্তরাধিকারী হিসেবেই উত্তরাধিকারকে সর্বাধিক বিবেচনা করে থাকি। উত্তরাধিকারী বৈষয়িক-অর্থনৈতিক প্রাপ্তিকেই পাথেয় বলে গণ্য করি। রাষ্ট্র-সমাজ এমনকি আইনগত স্বীকৃতিও পারিবারিক উত্তরাধিকার নির্ধারণ করেছে। সেটা শুধুই সম্পত্তির মালিকানার উত্তরাধিকার। চিন্তা-চেতনা, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, মানবমুক্তির দিশা, মতাদর্শিক অনুপ্রেরণা, মেধা-মনন বিকাশের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারী বলে প্রকাশ্যে বলে বেড়ালেও, সেটা প্রকৃতই ক'জন ধারণ ও পালন করে থাকি?

নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

মন্তব্য করুন