এবার দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে বীভৎস সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস আমরা দেখেছি। এ ধারা চলতে পারে না। তাই আমাদের সমাজদেহের সর্বত্র ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িকতা দূরীকরণের লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদের মোট ১০টি প্রস্তাবনা পেশ করা হলো।

পরিবার: আমাদের মনে রাখতে হবে, সাম্প্রদায়িকতা এমন একটি অসুখ, যার চিকিৎসা শুধু বাহ্যিক লক্ষণের নিরাময় নয়, বরং তার গোড়াটি চিহ্নিত করে নির্মূল করার উদ্যোগ নেওয়ার মধ্যে নিহিত। সে কাজটি শুরু করতে হবে পরিবার থেকে। দেশের শিক্ষিত, সচেতন ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রত্যেক নাগরিককে তার নিজের এবং নিকটবর্তী বৃহত্তর পারিবারিক পরিমণ্ডলের শিশুদের শুরু থেকেই অসাম্প্রদায়িকতার দীক্ষা তথা ধর্মে ধর্মে বিভেদ না করা, নিজ ধর্মকে শ্রেষ্ঠ না ভাবা, অন্যের ধর্মকে হেয় না করা; সর্বোপরি ধর্ম-গোত্র নির্বিশেষে সব মানুষকে সমান ভাবা, তাদের সম্মান করা ও ভালোবাসার শিক্ষা দিতে হবে।

বিদ্যালয়: আমরা জানি, শিশুরা যখন পরিবারের বাইরে বেরিয়ে বিদ্যালয়ের আঙিনায় পা রাখে, তখন তার মনোজগতে পরিবারের পাশাপাশি বন্ধুবান্ধব; বিশেষ করে শিক্ষকদের প্রভাব বাড়তে থাকে। সে দ্রুত ভিন্ন পরিবার ও ভিন্ন পরিবেশ থেকে আসা বন্ধু, সহপাঠীদের ক্ষতিকারক চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়। তার নির্মল মানসজগৎটি তখন কলুষিত হতে শুরু করে। তার সঙ্গে যদি যুক্ত হয় খোদ শিক্ষকদের কাছ থেকে পাওয়া কুশিক্ষা ও কুসংস্কার, তাহলে তার মানসিক বিকাশ বিঘ্নিত ও বিকৃত হতে বাধ্য। সে কারণে, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যেন তারা যথাসম্ভব অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী হন এবং সেই চেতনা ও বোধটুকু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চারিত করতে সর্বদা তৎপর থাকেন। শিক্ষকদের এ বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও নিবিড় তত্ত্বাবধানের আওতায় রাখা খুব জরুরি।

পাঠ্যপুস্তক: এ প্রসঙ্গে বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকের কথাও গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করতে হয়। কেননা, শিশুমনে তার স্কুলের পাঠ্যপুস্তকের বিশাল ভূমিকার কথা সর্বজনস্বীকৃত। ফলত, সেখানে যদি অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর ভিত্তি করে রচিত গল্প, কবিতা, ছড়া সে নিয়মিত পাঠ করে এবং শিক্ষকরাও শ্রেণিকক্ষে সেগুলোর গুরুত্ব ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন তাহলে নিশ্চয়  তার সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে শিক্ষার্থীদের ওপর।

শিশু সংগঠন: আমাদের দেশে এক সময় 'খেলাঘর', 'কচি-কাঁচার আসর', 'চাঁদের হাট' ইত্যাদি শিশু সংগঠন রমরমা ছিল। শিশুদের সুস্থ, সুন্দর, সৃজনশীল মানসিকতার অধিকারী করে গড়ে তুলতে সেসবের ব্যাপক ভূমিকার কথা কারও অজানা নয়। অথচ কী এক অজানা কারণে এসব সংগঠনের তৎপরতা কমতে কমতে এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে। অশুভ, অপশক্তির কুপ্রভাব থেকে আমাদের শিশুদের রক্ষা করতে হলে উল্লিখিত শিশু সংগঠনগুলোকে পুনরুজ্জীবিত, সচল ও সক্রিয় করে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড: এসব শিশু সংগঠন ছাড়াও যেসব সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে দেশজোড়া, তাদেরকে আরও বেশি করে সক্রিয় ও সোচ্চার হতে হবে। নাটক, সংগীতানুষ্ঠান, চিত্রপ্রদর্শনী, বাচিক পরিবেশনা ইত্যাদির নিয়মিত অনুষ্ঠান এবং তার মাধ্যমে শিল্পের ভাষায় অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা ও বাণী প্রচারের পাশাপাশি শিশুনাট্য, শিশু চলচ্চিত্রোৎসব, শিশুমেলা ইত্যাদি আয়োজনেও উদ্যোগী হতে হবে। সরকার, বিশেষ করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের বরাদ্দ ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা প্রদানে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। তাদের এ কথা উপলব্ধিতে আনতে হবে- সাম্প্রদায়িকতা দূরীকরণে শিক্ষা ও সংস্কৃতি একে অপরের অপরিহার্য পরিপূরক।

সামাজিকতা: সাম্প্রদায়িকতা প্রশমন ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রসারে সংস্কৃতির পাশাপাশি সুস্থ সামাজিকতার চর্চাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সে জন্য সব সম্প্রদায়ের মানুষের পাশাপাশি বসবাস, একত্রে ওঠাবসা, আদান-প্রদান, পরস্পরের অন্দরমহলে অবাধে আসা-যাওয়া, উৎসব-পার্বণ ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে সানন্দ অংশগ্রহণকে নানাভাবে উৎসাহিত ও কার্যকর করতে হবে। এভাবে পরস্পর জীবনাচরণের অংশ হয়ে উঠতে পারলে ভিন্ন সম্প্রদায় বিষয়ে বিবিধ বিভেদ, বিভ্রান্তি ও ভুল ধারণা তিরোহিত হয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিসরটুকু প্রশস্ততর হবে আপনাতেই।

প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি:  আমাদের দেশে এক সময় প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান কর্মসূচিই ছিল সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা ও অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা। ইদানীং অন্যবিধ অবক্ষয়ের পাশাপাশি তাদের এই অসাম্প্রদায়িকতা চর্চাতেও মনে হয় কিছুটা ঘাটতি পড়েছে। অবশ্য সামগ্রিকভাবেই বাংলাদেশে প্রগতিশীল রাজনীতির বড় দুঃসময় এখন। তবু জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এমনকি নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে হলেও বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের যাবতীয় আপসকামিতা, দুর্বলতা ও দোদুল্যমানতা পরিত্যাগ করে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে সাম্প্রদায়িকতার উৎসাদনে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে হবে।

ধর্মীয় নেতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা:  সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পেছনে মসজিদভিত্তিক প্রচারণা, ওয়াজ মাহফিল, ইউটিউবে ধর্মীয় বক্তাদের উস্কানির ব্যাপারে সরকার, প্রশাসন, গ্রাম ও পাড়া-মহল্লার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ প্রত্যেককে আরও সচেতন, সতর্ক ও কঠোর হতে হবে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাতে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে ধারাবাহিকভাবে প্রচারণা চালাতে হবে।

প্রচারমাধ্যমের ভূমিকা: এবারের দেশজোড়া সাম্প্রদায়িক তাণ্ডবের সময় আমরা জাতীয় গণমাধ্যমগুলোকে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে দেখিনি তেমন। আমরা আশা করব, এ ধরনের জাতীয় সংকটের মুহূর্তে তারা ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে এবং সর্বস্তরের মানুষকে হানাহানি পরিহার করে শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করবে। পাশাপাশি বছরজুড়ে তাদের নিয়মিত অনুষ্ঠানসূচির মধ্যেও এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করবে।

প্রতিনিধিত্ব: আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক জীবনের যাবতীয় কাজে দেশের প্রতিটি ধর্ম-গোত্র-বর্ণের মানুষের যেন লক্ষণীয় অংশগ্রহণ বা প্রতিনিধিত্ব থাকে, সে বিষয়ে সংশ্নিষ্ট নীতিনির্ধারক ও সিদ্ধান্তগ্রহীতাদের সচেতনতা প্রত্যাশা করি। কেননা, সমাজে অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের এই সংস্কৃতির চর্চা মূলত এক ধরনের সহাবস্থান ও সম্প্রীতির প্রতীকী বার্তাই বহন করে, যা সমাজস্বাস্থ্যের জন্য সবদিক থেকেই কল্যাণকর।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সমাজে সাম্প্রদায়িক শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষার্থে রাষ্ট্র, সরকার ও প্রশাসনকে তার যথাযথ দায়িত্ব পালনে বাধ্য করার পাশাপাশি নাগরিক সমাজের সদস্যরাও যদি উল্লিখিত কাজগুলো নিষ্ঠার সঙ্গে পালনে সচেতন ও সচেষ্ট হন, তাহলে অবশ্যই আমরা অদূর ভবিষ্যতে এর সম্যক সুফল পাব, যা আমাদের আরাধ্য অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার কাজকে ত্বরান্বিত করবে; সন্দেহ নেই।

লেখক ও শিল্প সংগঠক

মন্তব্য করুন