৩১ আগস্ট ২০১২। নারায়ণঞ্জে, শীতলক্ষ্যার ৫ নম্বর ঘাট। সন্ধ্যায় জলের প্রতিফলনে চাঁদের আলো কেমন যেন প্রাচীন আবেশ ছড়াচ্ছে! ভাবতে ইচ্ছা করে ইজিয়ান সাগরের উপকূল। হাজার হাজার মানুষের উৎসবমুখর আনাগোনা। সেদিন ছিল ব্লু-মুন :নীল জোছনায় অবগাহন, এক মহাজাগতিক উৎসব। ডিসকাশন প্রজেক্টের নদীর বাঁকে বাঁকে অনুষ্ঠানের একটি পর্ব। উৎসর্গ করা হয়েছিল চন্দ্রে পদার্পণকারী সদ্য প্রয়াত নিল আর্মস্ট্রংকে, যিনি চাঁদে পদার্পণের সময় বলেছিলেন, পদক্ষেপটা একজন মানুষের জন্য ছোট, কিন্তু মানব জাতির জন্য বিশাল।

শীতলক্ষ্যার ঘাটে একদিকে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরে চাঁদে পদার্পণের ডকুমেন্টারি দেখানো হচ্ছে; পাশেই কবিতা আবৃত্তি, আর একদিকে চলছে বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান। আয়োজকরা শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষকে চাঁদ দেখানোর কথা বললেও টেলিস্কোপে আকাশটাই দেখানোর চেষ্টা করছেন; আকাশের পর মহাকাশ, তার মহাজাগতিক ব্যাপ্তি। কখনও কখনও আগত দর্শক, বিশেষত কিছু শিশু এমন দৃষ্টি মেলে তাকাচ্ছে যেন নিজের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। জানতে ইচ্ছা করে, শিশুরা আসলে কী দেখছে? অথবা ওর শৈশবের মানসেই বা কীভাবে তা প্রতিভাত হচ্ছে? জানতে ইচ্ছা করে, শিশুটি আসলে কী বলতে চাচ্ছে? বর্তমানের শিশু তো ভবিষ্যতের মানুষ। সেখানে তার কর্মকাণ্ডে কী ভূমিকা রাখবে- এটা চিন্তা করছে? না, অনাবিল ভবিষ্যতের সন্ধান করছে?

শিশুটি কি জানত, ভয়াবহ মহামারির পথে পৃথিবী? শিশুটির চোখের দিকে তাকান, কী উৎকণ্ঠা! একটা প্রতিবেদন পড়েছিলাম, যার মূলকথা ছিল শিশুর কান্নায় বিপর্যয় বা যুদ্ধের আশঙ্কার আভাস। শতাব্দী আরম্ভ হওয়ার আগেই মার্টিন রিজ তার 'আওয়ার ফাইনাল সেঞ্চুরি' গ্রন্থে, ডেভিদ কোয়েম্যান তার স্পিলওভার (অ্যানিম্যাল ইনফেকশন অ্যান্ড নেক্সট প্যানডেমিক ২০১৫) গ্রন্থে আগত এই মহামারির আশঙ্কার কথা বলেছেন। হিসাব করেই বলেছেন; আরও নিশ্চয় অনেকে বলেছেন। তাতে মানব সভ্যতা কোনো প্রস্তুতিই নেয়নি; উন্নয়নের কোনো কাঠামোই তা বলে না :সে উন্নত বা অনুন্নত যে বিশ্বই হোক। হয়তো তারা ইকোলজিক্যাল ভারসাম্যের কথা বলেছিলেন। অবশ্য এখানে প্রাচীন একটি প্রশ্নের অবতারণা করা যেতে পারে :গ্রিক সফিস্ট প্রটোগোরাস বলেছিলেন, প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে বিপরীতধর্মী ভাব বিদ্যমান থাকে তাহলে বিশ্ব প্রকৃতিতে মানুষের অবস্থান কোথায়?

আইনস্টাইন বিশ্বমেলা-১৯৩৯ দেখে তার আইডিয়াস অ্যান্ড ওপিনিয়ন গ্রন্থের 'টাইম ক্যাপসুল'-এ 'বার্তা' প্রবন্ধে একটা সতর্কবার্তা যুক্ত করলেন প্রাযুক্তিক উন্নতির ব্যাপারে। ঔপন্যাসিক ও বিজ্ঞানী সিপি স্নোর 'দ্য টু কালচার' বক্তৃতায় (১৯৫৯) এ বিষয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, বিজ্ঞান এবং মানবতা মানুষের যে বৌদ্ধিক জীবন উপস্থাপন করে, তা দুটি সংস্কৃতিতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, যা সমাজের ইন্টিগ্রিটিকে নষ্ট করে চলেছে। এক ভারসাম্যহীন সভ্যতার সূচনা ঘটাচ্ছে। মনে হচ্ছে, শিকারি সময়ের যে একাকিত্ব মানুষকে তাড়িয়ে বেড়াত, তাকে আমরা আবার ডেকে আনছি। অথচ আমরা বলে বেড়াচ্ছি, এত আয়োজন, প্রাযুক্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা একাকিত্ব ঘোচানোর জন্য।

স্যামুইলোভিচ স্কলোভস্কি, নিকোলাই কার্দেশেভ হয়ে কার্ল সাগান সমস্যাটিকে সেল্‌ফ ডেস্ট্রাকটিভ কন্ডিশন বা আত্মধ্বংস হিসেবে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করলেন :আর তা হলো প্রাযুক্তিক বয়ঃসন্ধিকাল; ফ্রাঙ্ক ড্রেক থেকে ফ্রিম্যান ডাইসন; সবাই বললেন ওই একই কথা। শুধুই ব্যবসার জন্য, শুধুই কে-কার থেকে লাভে এগিয়ে থাকার জন্য এই ভারসাম্যহীন প্রাযুক্তিক সভ্যতার উদ্ভব ঘটেছে- প্রাযুক্তিক আত্মধ্বংস। আর যারা এর উদ্‌গাতা তারা নিজেদের সম্পদের পরিমাণ বাড়িয়ে তুলেছে, ভয়ানকভাবে পুঁজি কেন্দ্রীভূত করছে; আবার তারা জ্ঞানভিত্তিক সমাজের কথা বলে চলেছে। সেই সঙ্গে ডিজিটাল টেকনোলজি প্রকৃতিগতভাবে কালেক্টিভ পার্টিসিপেশন ও কালেক্টিভ নলেজের কথা বলছে। অথচ ঘটে চলেছে চরম কেন্দ্রীভবন। কী বৈপরীত্য! সহনশীলতা, নমনীয়তা উধাও হয়ে যাচ্ছে। এগুলো মারাত্মকভাবে সাংস্কৃতিক সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

একটা সভ্যতার সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় হচ্ছে এই প্রাযুক্তিক বয়ঃসন্ধিকাল। তাহলে সিলেবাস শেষ করানোর জন্য প্রাযুক্তিক বয়ঃসন্ধিকালের দিকে ঠেলে দিয়ে কী লাভ! শিক্ষার মূল কথা মানুষ, না ব্যবসার হাতিয়ার তৈরি? এই শিশুরাই কি হবে অসহনশীল লাভ-ক্ষতি হিসাবসর্বস্ব ভবিষ্যতের মানুষ, ব্যবসার ঘুঁটি? অবয়বগতভাবে মানুষ হলেও মানবিকতার কোনো চিহ্নই থাকবে না? গ্রাস করবে অসহনশীলতা, অনমনীয়তা!

বিজ্ঞান বক্তা

মন্তব্য করুন