বসত ভিটা আগুনে জ্বলছে; প্রাণের ভয়ে ধানক্ষেতেই লুকিয়ে ছিলেন তারা। শিশুদের কান্না চেপে রাখতে বাবা-মায়েরা তাদের মুখ চেপে রেখেছিলেন। সংবাদমাধ্যমে রংপুরের মাঝিপাড়ার এই খবর পড়ার পর ছোটবেলায় নানির কাছে শোনা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের হামলার ভয়ে ধানক্ষেত, পাটক্ষেত কিংবা জলাশয়ে ডুবে প্রাণ বাঁচানোর লড়াইয়ের গল্পগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠেছে।

রংপুরের পীরগঞ্জের মাঝিপাড়ার বড় করিমপুরের এ ঘটনা আমাদের বলে দেয়, যে চেতনায় বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে, সেই চেতনা অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়েছে; আর সেটা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকারের সময়ে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্রের কার্পণ্য বারবার এক দল দুর্বৃত্তকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে তাদের ওপর হামলা-নির্যাতন চালানোর।

এককালে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন নিত্যদিনের ঘটনা হলেও সেটি এখন সমতলে ছড়িয়ে পড়েছে। কক্সবাজারের রামুর সেই বৌদ্ধ মন্দিরের হামলা থেকে শুরু করে নাসিরনগর, গঙ্গাচড়া, কুমিল্লা কিংবা মাঝিপাড়ায় হামলার ধরনে কোনো পার্থক্য আছে বলে মনে করি না। বরং একই স্টাইলে, একই মতার্দশের মানুষ হামলা-অগ্নিসংযোগ চালিয়ে বিকৃত চিন্তা-চেতনাকে বারবার লালন করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে- এমন কিছু আমাদের চোখে পড়েনি। উপরন্তু হামলাকারীদের নেতৃত্ব দেওয়া লোকজনকে স্থানীয় নির্বাচনের টিকিট ধরিয়ে দিয়ে পুরস্কৃত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

দিন দিন আমাদের সহিষুষ্ণতা এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে, সেখানে ধর্মকে প্যারামিটার বানিয়ে মানুষে-মানুষে বিভেদের রাস্তা পরিস্কার করা হচ্ছে। এককালে যারা হিন্দু-বৌদ্ধদের বাঙালি ভাই বলে সম্বোধন করত; তারা এখন তাদের সেই ভাইকে বিধর্মী বলে জানছে; অন্তরে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ঢালছে। আর এই সাম্প্রদায়িক দানবকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। হিতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এসব প্রযুক্তিকে টুলস বানিয়ে গত এক যুগ ধরে একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলার প্লট বানানো হয়েছে।

সাম্প্রদায়িক হামলায় রাজনৈতিক ফায়দার চেয়ে ধর্মীয় গোষ্ঠীর ফায়দাই মুখ্য মনে হচ্ছে। এ গোষ্ঠীতে রয়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় নেতা আর আন্তর্জাতিক সমন্বয়কারী বা অর্থদাতা। এরা চতুরতার সঙ্গে সমাজে মিশে থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আদৌও তাদের বিচারের সামনে আনতে পারেনি। 'ধর্মীয় উগ্রবাদ'-এর ভাবধারায় এক দল কৈশোর পার করা সদ্য যুবক সাম্প্রতিক হামলার মাধ্যমে প্রমাণ করতে চাচ্ছে- এই দেশ তাদের জন্য নয়। যাদের মস্তিস্ক মুক্তচিন্তার ক্ষেত্র হওয়ার কথা, তাদের সেই খুলিতে শুধু হামলার 'খুন' চেপেছে। ধর্মীয় অন্ধকারে নিমজ্জিত এই গোষ্ঠীর শিকড় উপড়ানো না হলে ভবিষ্যতে আরও বেশি উস্কে দেবে। তাহলে কী সেই শিকড়? কোথা থেকে লকলকিয়ে বেড়ে উঠছে সাম্প্রদায়িক শক্তি? মন্দিরে আগুন জ্বালাচ্ছে যারা, তাদের রুখবে কে? কীভাবে আমরা সাম্প্রদায়িকতার বলয় থেকে বের হবো?

বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সাম্প্রদায়িক চেতনার উপাদান 'উগ্রবাদ' চর্চিত হয়ে আসছে বছরের পর বছর ধরে। বাংলাদেশের সাত স্তরের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মূল স্তম্ভ ধরা হয়। এই শিক্ষায় আলোকিত একটি শিশু পরবর্তী সময়ে নাগরিকতার শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। তাই এই পর্যায়কে অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা নেওয়ার সিঁড়ি বলে মনে করি। কিন্তু আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় তা নেওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। শিক্ষা যেমন কোনো জাতিকে উচ্চাসনে নিয়ে যায়, ঠিক তেমনি ভুল শিক্ষায় তা অধঃক্রম অনুসরণ করে। আমাদের দেশের একটি শিশু শিক্ষার গোড়াতে সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদ শব্দে ভোগে। একজন সদ্য অক্ষর শিখতে যাওয়া শিশুকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় স্বীকৃতি দিতে প্রয়োজন পড়ে সংশ্নিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফরম পূরণ। আর এই কাগুজে ফরমে সেই অক্ষরজ্ঞানহীন শিশুর তথ্যকণিকায় চাওয়া হয় বর্ণ কিংবা ধর্ম কী? আর সে তথ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার পথ উন্মুক্ত করে দেন সেই শিশুর অভিভাবকরা। এই নার্সারি শিক্ষা থেকে শুরু হওয়া বর্ণবাদী শব্দগুলো চলে কর্মজীবনের প্রারম্ভে চাকরির আবেদন পর্যন্ত। যে শিশুর মানসিক বিচার হওয়ার কথা 'উদারতা'য়; কোনো সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে নয়। কিন্তু তারা গোড়াতেই হয়ে উঠছে ধর্মবিদ্বেষী। এক ধর্মের শিশু অন্য ধর্মের শিশুকে 'বিধর্মী' নামে চিনছে, যা বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিকও বটে। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা শাসকগোষ্ঠী বিষয়টিকে 'অস্পর্শ্য' এবং সংবেদনশীল বলেই চালিয়ে দিচ্ছে। যার ফল ভোগ করছি এখন।

একটি শিশুরে অঙ্কুরোদ্‌গম ঘটে প্রাথমিক শিক্ষায়। আর এই শিক্ষা যদি হয় 'উদার মানবতার', তাহলে পরবর্তী সময়ে তার পথভ্রম হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। সামাজিক ও পারিবারিকভাবে উদারতার চর্চা করতে হবে। রাষ্ট্রকেও হতে হবে উদার। আমরাও স্বপ্টম্ন দেখি অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক মুক্তবুদ্ধির চর্চার; মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নেওয়ার। আমরা পারব ধর্মীয় নৈতিকতার শিক্ষা নিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে। তাহলেই বাংলাদেশ একদিন বিশ্ব-ভুবনে হয়ে উঠবে উদারতা ও মুক্তচেতনাধারী নাগরিকদের প্রতীক।

গবেষক, ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

মন্তব্য করুন