হিন্দুরা মূর্তিকে বলে প্রতিমা। প্রতিমাকে তারা ঈশ্বরের প্রতিভূ হিসেবে বৈদিক মতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে পূজা করে। অসীম গুণসম্পন্নম্ন ঈশ্বরের গুণাবলিকে তারা বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমায় আরোপ করে। শিল্পীরা গুণের প্রতীকী রূপ দিয়ে দেবতার প্রতিমা নির্মাণ করেন। পূজারি প্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করায় মৃন্ময়ী দেবতা চেতনার জগতে চিন্ময়ী হয়ে ওঠেন। ভক্তরা প্রতিমা পূজার মাধ্যমে ঈশ্বরের সেই গুণেরই অনুধ্যান করে গুণান্বিত হতে ঈশ্বরের কৃপা লাভে উপাসনা করেন। মাটির প্রতিমায় দেব-দেবীর পূজা করায় একেশ্বরবাদীরা হিন্দুদের পৌত্তলিক হিসেবে প্রচার করেন। আসলে মৃন্ময়ী রূপী দেব-দেবী চিন্ময়ী হওয়ায় আরাধনার মাধ্যমে হিন্দুরা পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার একাত্ম হওয়ারই সাধনা করেন। অসংখ্য মুনি-ঋষি প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এ প্রকার সাধনার মাধ্যমে সিদ্ধিলাভ করে মুক্তিলাভ করেছেন।

ইদানীংকালে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর এক শ্রেণির ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আরাধ্য মূর্তির ওপর তীব্র ঘৃণা ও আক্রোশ প্রকাশ পাচ্ছে। যখনই ইসলাম ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়েছে, তখনই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, লুটপাট হয়েছে। সেই সঙ্গে আক্রমণের শিকার হয়েছে হিন্দুদের আরাধ্য দেবতা। মনের সব ক্ষোভ, হিংসা প্রশমিত হয়েছে মূর্তি ভাঙার উল্লাসে। হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের প্রতিটি পর্ব সম্পন্ন হয় বিনা বাধায়। প্রতিপক্ষ দুর্বল থাকায় এখানে কোনো দাঙ্গা হয় না। হয় দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার, নির্যাতন, একতরফা হামলা।

নিকট অতীতে রংপুর, গোবিন্দগঞ্জ, নাসিরনগর, শাল্লা, রূপসা ও কুমিল্লায় প্রতিটি হামলার প্রথম শিকার হয়েছে হিন্দুদের উপাস্য দেবতা প্রতিমা। প্রতিটি হামলার পেছনে প্রায় একই কাহিনির অবতারণা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় অবমাননার গুজব ছড়িয়ে সংখ্যালঘু এলাকায় সংঘবদ্ধভাবে আক্রমণ। শুধু এবারের কুমিল্লার মণ্ডপে হামলাতে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয়। মানুষকে উস্কে দেওয়ার জন্য দুর্গা প্রতিমার সামনে অন্য একটি মূর্তির কোলে কোরআন শরিফ রেখে দেওয়া হয়। সামাজিক মিডিয়ায় বাতাসের মতো খবরটি ছড়িয়ে পড়লে উন্মত্ত জনতা পবিত্র গ্রন্থের অবমাননার বদলা নিতে দুর্গা প্রতিমা ও মণ্ডপ ভাঙচুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। একই ঘটনার রেশে চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মণ্ডপ ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়।

দেশের সংবিধান অনুযায়ী ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকার বা নির্বাহী বিভাগের। নির্বাহী বিভাগের পক্ষে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনীতিবিদরা এ দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত। কিন্তু ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত লাগাতার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি হলেও কখনও ঘটনার সময় অকুস্থলে আক্রান্ত লোকদের নিরাপত্তা দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেখা যায়নি। প্রসঙ্গত নাসিরনগরে হামলায় চার্জশিটভুক্ত দুই আসামিকে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হলে সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ পায়। পরে তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করা হয়।

হাল আমলে দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়ে প্রকাশ্যে মাইকে ঘোষণা দিয়ে সংঘবদ্ধ হামলা হলেও নিরাপত্তা বাহিনীর অনুপস্থিতিতে তা নির্বিবাদে এবং বর্বরোচিত পন্থায় চালানোর পথ প্রশস্ত হয়। সবকিছু শেষ হওয়ার পর উপদ্রুত এলাকাবাসী আগুনে ভস্মীভূত বাড়ির পাশে মুক্ত আকাশের নিচে নিঃস্ব হয়ে যখন বসে থাকে, তখন নিরাপত্তা বাহিনী ও রাজনীতিবিদরা এলাকা পরিদর্শনে আসেন এবং সর্বস্ব হারা মানুষকে শান্তির বাণী শোনান।

এখনও সময় আছে। পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতিচর্চায় মশগুল থাকায় মূল বিষয়টি প্রায়ই আড়ালে চলে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল যদি ভাবে, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা মুক্তিযুদ্ধের সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশবিশেষ; সে ক্ষেত্রে সন্ত্রাস দমন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইত্যাদি ক্ষেত্রে যুগান্তকারী সাফল্যের মতো সংখ্যালঘুদের ওপর লাগাতার হামলা চিরতরে নির্মূল করে সরকার ষড়যন্ত্রের দাঁতভাঙা জবাব দিতে পারে। এতে সংখ্যালঘুদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ আসবে, অন্যদিকে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবে রূপ লাভ করবে।

সাবেক ডিরেক্টর, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়

মন্তব্য করুন