'প্রতীচ্য' এবং 'পাশ্চাত্য' শব্দ দ্বারা পশ্চিমের দেশগুলোকে বোঝানো হয়। তবে 'পাশ্চাত্য' শব্দটি এখন বেশি প্রচলিত। অন্যদিকে ইংরেজিতে 'ইস্টার্ন' অপেক্ষা 'ওরিয়েন্টাল' এবং 'অক্সিডেন্টাল' অপেক্ষা 'ওয়েস্টার্ন' শব্দ বেশি ব্যবহূত হয়। আমরা হরহামেশা পাশ্চাত্যের সভ্যতা, পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বিজ্ঞান ইত্যাদি নিয়ে উচ্চ ধারণা পোষণ করি। জীবিকার জন্য লেখাপড়া এবং কাজ করতে যাওয়ার স্বার্থে এশিয়া-আফ্রিকার দেশগুলোতে ইউরোপের ভাষা চর্চা এখনকার সময়ের অতি সাধারণ ঘটনা। আবার পাশ্চাত্যের লোকেরাও এশিয়া এলাকার মানুষের সংস্কৃতি নিয়ে বেশ উৎসাহী। উদাহরণ হিসেবে অক্সফোর্ড-কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ ফ্যাকাল্টি থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা যায়।

কালের পরিক্রমায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পাশাপাশি সংস্কৃতির আদান-প্রদান হয়েছে। মহাবীর আলেকজান্ডারের সময়ে এই মেলবন্ধন দৃঢ় হয়। তার পর এক সময় রোমান সাম্রাজ্যের অধীন পাশ্চাত্য শক্তি আরও সংহত হয়। অন্যদিকে ইসলামের অভ্যুদয়ের পর ইউরোপের ওপর প্রাচ্যের ছায়া পড়ে, যা অটোমান সাম্রাজ্যের প্রতাপ থাকা অবধি চলমান ছিল। এর পর শিল্পবিপ্লবের পর ইউরোপের দেশগুলো বিভিন্ন দেশে উপনিবেশ গড়ে তোলে। তারা যেমন সংস্কৃতি রপ্তানি করেছে, তেমনি নতুন সংস্কৃতি গ্রহণও করেছে। পাশ্চাত্যের দেশগুলো সুদূর অতীতে মিসরীয়দের কাছ থেকে নিয়েছে তাদের আবিস্কার কালি ও কাগজ। সিরিয়া ও ইসরায়েলের কাছ থেকে নিয়েছে ধর্ম-চেতনা ও প্রাচীন ভাষা। হিব্রু ও আরামাইক ভাষা যথাক্রমে ওল্ড টেস্টামেন্ট এবং নিউ টেস্টামেন্টের আদি ভাষা। রোমান সাম্রাজ্য যখন খ্রিষ্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম করে, তখন তারা মধ্যপ্রাচ্য এলাকার ধর্মীয় উত্তরসূরি হয়ে যায়। তারপর উপনিবেশ কায়েমের পর পাশ্চাত্যের কিছু জ্ঞানী-গুণী প্রাচ্যদেশের সংস্পর্শে এসে তাদের সম্পর্কে জানতে ওরিয়েন্টাল স্টাডিজে মনোনিবেশ করে। তারা প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় শাস্ত্র ও মহাকাব্যগুলো নিয়ে গবেষণা শুরু করে। ব্রিটিশ ভারতে মোগলদের সময়ের ফারসি ভাষা রাষ্ট্রভাষা থাকায় ইউরোপের কোম্পানিগুলো ফারসি সাহিত্য এবং ফারসির মাধ্যমে আরবি ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। অন্যদিকে এ অঞ্চলের মানুষ ইংরেজি শিখতে গিয়ে গ্রিস ও রোমের কাছে ইংরেজের দায়বদ্ধতা এবং ইউরোপের রেনেসাঁর অগ্রগতি সম্পর্কে জেনে নিজেরাও সমৃদ্ধ হয়। তবে প্রাচ্যের কিছু গবেষক-লেখক ওরিয়েন্টালিস্টদের মধ্যে আত্মগরিমার লক্ষণ দেখতে পান এবং মনে করেন, এটাও ইম্পেরিয়ালিজমের মতো একপেশে চিন্তা। অর্থাৎ শ্রেষ্ঠতর ওয়েস্টের কাঁধে ইস্টকে সভ্য করার দায়িত্ব পড়েছে- এমন ভাবনা।

বর্তমান সময়ে এসে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভেতরে আমরা বড় দাগে কিছু অমিল দেখতে পাই এবং উভয় সংস্কৃতিকে আলাদা করতে পারি। পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। সেখানে অভ্যুত্থান এবং মেকি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ কম। তারা প্রাচীন গ্রিক ও রোমের রেখে যাওয়া জ্ঞান চর্চা করে চিন্তার দিগন্তকে প্রসারিত করেছে। একইভাবে নানারূপ আবিস্কারের মাধ্যমে তারা প্রযুক্তিকে নিজেদের উন্নয়নের হাতিয়ার করেছে। ধর্মীয় নৈতিকতার চেয়ে ব্যক্তিক নৈতিকতার কারণে তারা নানা ধরনের সামাজিক অপরাধপ্রবণতা থেকে অনেকটা মুক্ত। তবে তাদের ঋণাত্মক দিকগুলো হচ্ছে, তারা বেশি বস্তুবাদী, বেশি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী এবং বেশি আত্মাভিমানী। অন্যদিকে প্রাচ্যের বেশিষ্ট্য হচ্ছে, সে বেশি ধর্মভীরু। কারণ বিশ্বের বেশিরভাগ বড় ধর্মের নবী-রাসুল বা ধর্মগুরুর জন্মস্থান প্রাচ্যদেশে। আর্থিক সংগতি এদের কম থাকলেও আধ্যাত্মিকভাবে এরা বেশি অগ্রসর।

'পশ্চিমে আজি খুলিয়াছে দ্বার, সেথা হতে সবে আনে উপহার/ দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে'- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই বিশ্বাসের সঙ্গে একাত্ম হয়ে বলতে হয়, বড়ত্ব এবং ছোটত্ব সময়ের বৃত্তে বন্দি সম্পদ। বড়ত্ব সময়ে সময়ে কেন্দ্র পরিবর্তন করে। এই পালাবদলে পরস্পর গড়ে ওঠে আদান-প্রদানের উপযুক্ত সহমর্মিতার পরিবেশ। এটাই বিশ্বকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। কিন্তু অন্ধ-অনুকরণপ্রীতি কোনো মঙ্গল বয়ে আনে না। নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কিছুর প্রতি আসক্তি ব্যক্তিত্বহীনভাবে নিজস্ব অস্তিত্ব বিসর্জনের শামিল। তাই কিছু ক্ষেত্রে পূর্ব-পশ্চিম দুই দিগন্তের মধ্যে একটা সীমারেখা তো থাকতেই হবে। এ ব্যাপারে রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের 'ইস্ট ইজ ইস্ট, অ্যান্ড ওয়েস্ট ইজ ওয়েস্ট, অ্যান্ড নেভার দ্য টোয়েন শ্যাল মিট'- এ কথাটা আমাদের মনে রাখতেই হবে।

সাবেক সরকারি কর্মকর্তা