দেশের বিভিন্ন এলাকায় যখন সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটেছে, ঠিক তখন ১৫ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (ডব্লিউজেপি) তাদের বৈশ্বিক 'আইনের শাসন সূচক' প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী আইনের শাসনের সূচকে ১৩৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৪তম। এর আগের বছরের সূচকে ১২৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২২তম। স্পষ্টতই আইনের শাসনের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা ক্রমাবনতিশীল। হতে পারে বাংলাদেশের ক্রমহ্রাসমান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর দেশের ক্রমবিকাশমান মৌলবাদী শক্তির আক্রমণের সঙ্গে এই প্রতিবেদন প্রকাশের প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক নেই। নিতান্ত কাকতালীয়ভাবেই দুটি বিষয় মিলে গেছে। কিন্তু এ দুয়ের মাঝে একটা অন্তর্নিহিত এবং গূঢ় সম্পর্ক অস্বীকার করার উপায় নেই। আর সে কারণেই কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর যে হামলা হয়েছে বা হচ্ছে, তাতে ব্যথিত এবং ক্ষুব্ধ হলেও বিস্মিত নই। কারণ, এ ঘটনা দেশের সার্বিক রাজনৈতিক অবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক রূপান্তরের এক স্বাভাবিক ও অনিবার্য পরিণতি।

আমরা যদি নির্মোহ দৃষ্টি নিয়ে পেছনের দিকে তাকাই তাহলে দেখব স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই এ দেশে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ঘিরে গণবিরোধী 'অনুভূতি'র আগাছা জন্মাতে শুরু করেছে। আর আমরা সবাই কখনও বুঝে, কখনও না বুঝে, কখনও প্রকাশ্যে কখনও গোপনে, কখনও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে, কখনওবা ভেতরের বা বাইরের অদৃশ্য বাজিকর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সেই আগাছা ক্ষেতে পানি আর সার দিয়ে চলেছি। এর পেছনে অনিবার্যভাবেই কাজ করেছে রাজনৈতিক লাভালাভের হিসাব। বিশেষ করে বড় দলগুলোর 'ভোটতান্ত্রিক' মানসিকতা। এ অবস্থায় এক সময়ে আগাছাই মূল বৃক্ষটি ঢেকে দিয়ে নিজের অস্তিত্বকে সগৌরবে জানান দিতে শুরু করেছে। আর আমরা আমজনতা 'চোখ গেল, চোখ গেল' বলে নিজের কপাল চাপড়াচ্ছি।

মনে পড়ে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যখন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্তম্ভ ধর্মনিরপেক্ষতার মূলে কুঠারাঘাত করে সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা দেন, তখন বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করেছিল। সেদিন বিএনপিপ্রধান খালেদা জিয়া বলেছিলেন, 'ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম করার প্রয়োজন পড়ে না।' জামায়াতে ইসলামী বলেছিল, 'ইসলামী আন্দোলনকে প্রতিহত করাই রাষ্ট্রধর্মের উদ্দেশ্য'; আর আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনা বলেছিলেন, 'সংবিধানের সংশোধনী জনগণ মানবে না।' কিন্তু সময়ের বিবর্তনে ভোটতান্ত্রিক হিসাবের কারণে আজ সবাই মুখে কুলুপ এঁটে বসেছেন। কুমিল্লা-নোয়াখালীর ঘটনার পর সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী যখন ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলিষ্ঠ বক্তব্য দিলেন, তখন তার নিজ দলেরই কিছু নেতা যেভাবে তাকে আক্রমণ করলেন, তাতে দলটির আদর্শিক স্খলনের চিত্র ভালোভাবে ফুটে উঠেছে।

গত দেড় বছর করোনা পরিস্থিতির কারণে সব ধরনের রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ রয়েছে। এর মাঝেও একটি গোষ্ঠী তাদের সভা-সমাবেশ ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছে। যেখানে ফেসবুকের মতো একটা সাধারণ সামাজিক মাধ্যমে ব্যক্তিগত টাইমলাইনে কিছু একটা লিখলেই অনুভূতির জুজু দেখিয়ে মামলা করে মাসের পর মাস জেলে পুরে রাখা হচ্ছে, সেখানে প্রকাশ্য দিবালোকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূল স্তম্ভ ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে যখন গলা ফাটানো বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, তখন কেউ কিছু বলছে না। অনেক সময় এসব সভায় সরকারি দলের লোকজনও উপস্থিত থাকছেন। শুধু স্থানীয় প্রভাব বজায় রাখার জন্য তারা কিছু বলছেন না। তারা যে বিভিন্ন জায়গায় আক্রমণ করছে, তা অনিবার্য বাস্তবতা।

এবার আসা যাক আইনের শাসনের কথায়। বিজ্ঞজনমাত্রই বলে থাকেন, গণতন্ত্র আর আইনের শাসন- এ দুটি একে অন্যের পরিপূরক। একটি ছাড়া অন্যটির বিকাশ সম্ভব নয়; আবার একটি নষ্ট হলে অন্যটিতেও পচন ধরে। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক আগে থেকেই গণতন্ত্র পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীর মতো শয্যাশায়ী। খোদ রাজনীতিই চলে গেছে রাজনীতিবিদদের হাতের বাইরে। বস্তুত যেদিন থেকে গণতন্ত্র দলতন্ত্রের খোলসে ঢুকে গেছে, সেদিন থেকে আইনের শাসনও দুর্বল হতে শুরু করেছে। এই বাস্তবতায় গত এক দশকে বাংলাদেশে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের দিকে তাকালে আমরা দেখব, হামলার ঘটনার কোনোটিরই বিচার হয়নি। রামু, নাসিরনগর, গঙ্গাচড়া- ক'টি ঘটনার কথা বলব! এসবের ক'টির বিচার হয়েছে?

তবে সুষ্ঠু বিচার না হলেও এসব ঘটনায় প্রহসনের অনেক নজির আমরা দেখতে পাই। রামুর ঘটনায় উত্তম বড়ুয়া, নাসিরনগরের ঘটনায় রসরাজ, গঙ্গাচড়ার ঘটনায় টিটো রায়, সর্বশেষ ২০২১ সালে সুনামগঞ্জের শাল্লায় ঝুমন দাস- এদের প্রত্যেককে সংবেদনশীল কিছু ধারায় অভিযোগ এনে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বিনা বিচারে তাদের রাখা হয়েছে দিনের পর দিন জেলে। এ সবই করা হয়েছে 'অনুভূতি গোষ্ঠীকে' খুশি করার জন্য। এসবের ফলে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি বুঝে নিয়েছে- কোনোভাবে ঘটনা ঘটাতে পারলেই হলো। তারপর জেল তো খাটবে রসরাজ, না হয় ঝুমন দাস। এই যখন অবস্থা; আইনের শাসনের সূচকে সে দেশ পিছিয়ে থাকবে, বলাই বাহুল্য।

সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা

মন্তব্য করুন