জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কথা লিখতে বসেছি। আমার বয়স এখন ৮৪ বছর। জন্ম ১৯৩৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর, কলকাতার ৮ নম্বর ওলিউল্লাহ লেনে। বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়েছি ঠিকই, মনোবল হারাইনি। জন্মের পর থেকেই শারীরিকভাবে দুর্বল ছিলাম বটে, মনোবল ইস্পাতকঠিন। ছোটকাল থেকে খেলাধুলার ফলে আজও সুস্থ আছি।

এই দীর্ঘ জীবনে তিনটি ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে আমি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলাম। সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটেছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়। ২৫ অক্টোবর ১৯৭১ ভোরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও পাঞ্জাব পুলিশের একটি দল আমাদের পুরানা পল্টন লাইনের দোতলা বাড়ি ঘেরাও করে নিচতলার দরজায় করাঘাত করে। আমার আব্বা আবুল ফয়েজ মোহাম্মদ ইউসুফ পূর্ব পাকিস্তান সরকারের ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি হিসেবে ১৯৬০ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি দরজা খুলে দিলে পাঞ্জাব পুলিশের একটি দল বাড়িতে প্রবেশ করে আব্বার হাত ধরে জিজ্ঞেস করল- আপনার ছেলেরা কোথায়? উত্তরে আব্বা বললেন, ঘরে আছে। পুনরায় জিজ্ঞেস করল- আপনার ছেলে কয়জন? আব্বা বললেন, ছয়জন। তারা কি সবাই বাড়িতে আছে? আব্বা বললেন, পাঁচজন আছে। জানতে চাইল- 'আপনার ছেলে কমান্ডার বাচ্চু কোথায়?' আমার ভাই নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু তথা কমান্ডার বাচ্চুর নাম জেনেই তারা এসেছিল। উত্তরে আব্বা বললেন, জানি না।

তারা প্রথমে নিচতলায় বাবা-মা, বড় ভাই-ভাবিকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করল- অন্য ভাইরা কোথায়? বড় ভাই শামস্‌ তাবরেজ রেজা ইউসুফ দোতলায় আমার রুমের দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল, পাকিস্তানি সেনারা এসেছে চেক করার জন্য। দরজা খুলে দিলাম। তারা ঘরে ঢুকে খাটের নিচে চেক করতে লাগল। খাটের নিচে আমার বিয়ের বাক্সভর্তি কিছু উপহার রাখা ছিল। একজন পুলিশ উর্দুতে জানতে চাইল, ইসমে কেয়া হ্যায়? বললাম, বিয়ের উপহার। উর্দুতে নির্দেশ দিল শার্ট পরার জন্য। এ সময় খেয়াল করি, পকেটে মুক্তিযোদ্ধা রাইসুল ইসলাম আসাদের ফটো। ফটোটা বাচ্চু আমাকে দিয়েছিল আসাদের জন্য আমাদের কোম্পানির সিলমোহরযুক্ত ও আমার সই করা একটি আইডি তৈরি করার জন্য। আমি পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ফটোটা খাটের নিচে ফেলে দিলাম।

এর পর পাকিস্তানি আর্মি আমি, বড় ভাইসহ বাকি তিন ভাইকে নিয়ে তাদের গাড়ির সামনে দাঁড় করাল। অন্য ভাইদের নাম যথাক্রমে গিয়াস উদ্দিন আজহার ইউসুফ, মহিউদ্দিন ফজলে ইউসুফ ও সাইফুদ্দিন ইউসুফ। আকাশ ফর্সা হয়ে আসছিল। দেখলাম, আব্বা বাড়ির সামনের দরজা ধরে বিমষর্ চিত্তে আমাদের দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন। আম্মা ও চার বোন, তিন ভাইয়ের স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়ছিল। কারফিউ থাকায় আশপাশের বাসা থেকে কেউ বের হতে পারছিল না। সেখানেই বাচ্চুর ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করে তেজগাঁও নাখালপাড়া এমপি হোস্টেলের পেছনে একটি বাড়িতে আমাদের নিয়ে গিয়ে রাখল। এলাকাটা ছিল পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্প।

আমাদের পাঁচ ভাইকে নিচতলার একটি ঘরে আটকে রেখে পাঞ্জাব সেনাদের দলটি ওপরতলায় চলে যায়। পাহারায় ছিলেন একজন বাঙালি পুলিশ। আমাদের দেখে বললেন, আপনাদেরও ধরে এনেছে! আমাকে চিনতে পারলেন না? আমরা অবাক হলে নিজেই পরিচয় দিলেন- পুলিশের চাকরি হওয়ার আগ পর্যন্ত আপনাদের খালু জাস্টিস সিদ্দিক আহমেদ চৌধুরীর বাড়িতে রান্নার কাজ করতাম। ভাইয়া, আপনারা ঘাবড়াবেন না; আমি আছি। সেই সময়ে তিনি বাস্তবিকই আমাদের অনেক সাহায্যে এসেছিলেন। যখন পাঞ্জাব পুলিশ বা ইস্ট পাকিস্তান সিভিলিয়ান আর্মড ফোর্সের সদস্যরা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আসত, তিনি বলতেন- এরা মুক্তিবাহিনী না। মেজর আসলাম সাহেবের হুকুম আছে মারধর না করার জন্য।

তারা পাল্টা প্রশ্ন করত- তবে এরা কারা? উত্তরে তিনি বলতেন, এরা মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর ভাই। তখন তারা 'বাচ্চু কাঁহা হ্যায়' বলে আমাদের গালিগালাজ করত। এক পর্যায়ে পাঞ্জাব পুলিশের একটি দল এলো। এক পাঞ্জাবি আমার বড় ভাই শামস্‌ তাবরেজ রেজা ইউসুফকে কলার ধরে এক টান মেরে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়ে গলা চেপে, হাঁটু দিয়ে পেটে চাপ দিতে থাকে এবং কানে দু'হাত দিয়ে ঘষে রক্ত বের করে দেয়। আরেক ভাই মহিউদ্দিন ইউসুফ মন্টুকে আরেকজন টান মেরে মাটিতে ফেলে বুট জুতা দিয়ে পেছনে প্রচণ্ডভাবে লাথি মারে এবং রাইফেলের বাঁট দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করে। এতে তার শিরদাঁড়া মারাত্মকভাবে জখম হয়। যার ফলে সে সোজা হয়ে হাঁটতে পারত না এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে জীবন কাটিয়েছে। বড় ভাইও সারাজীবন ঘাড় ও হাত-পায়ের ব্যথায় কষ্ট পেয়েছেন।

যাহোক, মারধোরের সময় পাহারারত বাঙালি পুলিশটি দৌড়ে ওপরে গিয়ে বলেন- তোমরা যাদের ধরে এনেছ, তাদের আরেক দল এসে মারছে। সঙ্গে সঙ্গে দোতলা থেকে তারা নেমে এসে বলল, তোমরা এদের মারতে পারবে না। কারণ মেজর সাহেবের হুকুম নেই। তখন দুই দল ঝগড়া করতে করতে ওপরে চলে গেল। সে যাত্রায় আল্লাহ্‌র রহমতে রক্ষা পেলাম।

রাতের বেলায় মেজর আসলাম এলো। আমরা ফ্লোরে বসা ছিলাম, উঠে দাঁড়ালাম। এরপর একই প্রশ্ন- বাচ্চু কোথায়। আমরা বলি, জানি না। এরপর একেকজনকে জিজ্ঞেস করতে থাকল- পেশা কী। সবই উর্দুতে। বড় ভাই বললেন, তিনি এজি অফিসে সুপারিনটেনডেন্ট পদে আসীন। তখন বড় ভাইকে ব্যঙ্গ করে বলল- আপ গভর্নমেন্ট কা তানখা খাতা হ্যায় আউর গভর্নমেন্ট কা অ্যাগেইনস্ট কাম কারতা হ্যায়? আমাকে জিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে আমি বললাম- হাম ব্রিজ আউর বিল্ডিং বানাতে হ্যায়। হামারা কোম্পানিকা নাম দি ইঞ্জিনিয়ারস লিমিটেড। একে একে আমার ছোট ভাই গিয়াসউদ্দিন ইউসুফ, মহিউদ্দিন ফজলে ইউসুফকে জিজ্ঞাসা করার পর সবার ছোট সাইফুদ্দিন ইউসুফকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, চিটাগাং মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। যাওয়ার সময় মেজর আসলাম বলল- 'আই হ্যাভ রিসিভড মোর দ্যান ওয়ান হান্ড্রেড টেলিফোন কল ফর ইউর রিলিজ। বাট আই শ্যাল নট রিলিজ ইউ। বাচ্চু সাব কো লে আইয়ে, আউর আপ পাঁচও চালা যাইয়ে। '

পরে শুনেছি, বাচ্চু গ্রুপের একজন মুক্তিযোদ্ধা সাভার থেকে ঢাকায় অস্ত্র আনার সময় রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে। তারা তার পা ভেঙে দিয়ে মেজর আসলামের হাতে তুলে দেয়। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সে আমাদের বাসা দেখিয়ে দেয়।

এভাবে ২৫, ২৬, ২৭ তারিখে আমাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চলতে থাকে। বাচ্চুকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। আমাদের ওই একই কথা- বাচ্চু কোথায় আছে, জানি না। ২৮ অক্টোবর সকালে আমার আব্বা, বড় মামা মাহফুজুল হক, যিনি ১৯৫৬ সালে যুক্তফ্রন্টের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন, ঊর্ধ্বতন পাকিস্তানি বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন। সেখান থেকে এসে মামা ও বাবা মেজর আসলামের সঙ্গে দেখা করে আমাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলেন। মেজর আব্বাকে বলল, আমি এক শর্তে আপনার ছেলেদের মধ্যে তিনজনকে ছাড়ব এবং দুইজনকে বন্দি হিসেবে রাখব। বাচ্চুকে আপনারা আমাদের হাতে তুলে দেবেন, তারপর আপনার দুই ছেলেকেও ছেড়ে দেব। আমার আব্বা ও বড় মামা মেজরকে বললেন, আমরা জানি না সে কোথায়। আমরা কী করে তাকে নিয়ে আসব? আপনি দয়া করে আমাদের ছেলেদের ছেড়ে দিন।

মেজর আসলাম বলল, হ্যাঁ, আপনার ৫ ছেলেকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ ওপর থেকে এসেছে। কিন্তু বাচ্চুকে ধরে দেওয়ার জন্য কী ব্যবস্থা নিয়েছেন? আব্বা উত্তরে বললেন, ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা দ্য পাকিস্তান অবজারভারে একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছি। আসলে এটা ছিল আমাদের পরিবারের একটি কৌশল। তাদের বোঝানোর জন্য- বাচ্চুকে আমরা খুঁজছি। এদিকে বাচ্চুকেও গোপনে জানিয়ে দেওয়া হয়- এই বিজ্ঞাপন দেখে সে যেন কোনো অবস্থাতেই ধরা না দেয়। বাচ্চু তখন ঢাকার নয়াপল্টনে একটি চায়ের দোকানের লেবারদের হাইড আউটে থাকত। মেজর আসলাম ওই পেপারের কপি দেখতে চাইলে আব্বা সেটা দেখালেন।

তখন মেজর আসলাম একজন সিপাহিকে ডেকে বলল আমাদের মধ্য থেকে তিনজনকে রুম থেকে বের করে অফিসে আনার জন্য। সে পাঁচজনকেই নিয়ে গেল। মেজর এর কারণ জানতে চাইলে সিপাহি বলল, কোন তিনজনকে আনব বুঝতে না পেরে সবাইকে নিয়ে এসেছে। এর পর আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো গোয়েন্দা মেজর মুস্তাকের কাছে। মেজর মুস্তাক বলল, বাচ্চুকে নিয়ে আসুন, ভারতীয় তৎপরতা সম্পর্কে দুই-তিনটি প্রশ্ন করে ছেড়ে দেব। আমাদের একই উত্তর। সেখান থেকে মেজর আসলাম আমাদের সবাইকে ও পেপার কাটিং নিয়ে ব্রিগেডিয়ারের কাছে গেলে তিনি আমাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য বললেন।

আমরা আমার কোম্পানির গাড়িতে করে বাসার দিকে রওনা দিলাম ২৮ অক্টোবর দুপুর ১টার দিকে। আমাদের যেখানে আটক রাখা হয়েছিল, সেটা ছিল একটি নির্যাতন কেন্দ্র। চার দিনে সেখানে কত মানুষকে যে নির্যাতনের শিকার হতে দেখেছি, মনে পড়লে এখনও গায়ের লোম শিউরে ওঠে।

ছাড়া পাওয়ার পরও পাঞ্জাব পুলিশের লোক আমাদের বাসায় এসে প্রতিদিন জিজ্ঞেস করত- বাচ্চুর কোনো খবর আমরা জানতে পেরেছি কিনা। আমরা এ অমানুষিক নির্যাতন ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সহ্য করেছি। ৩ ডিসেম্বর যখন ভারতীয় বিমানবাহিনী ঢাকা এয়ারপোর্টে ক্রমাগত বোম্বিং করতে থাকে, তখন থেকে বিজয়ের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী ও পাঞ্জাবি পুলিশ নিজেদের জান বাঁচানোর জন্যই তৎপর ছিল। আমাদের কোনো প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়নি।

আমরা ৩০ লাখ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন দেশ পেয়েছি। সেই দেশের নতুন প্রজন্মের কাছে একটি অনুরোধ- আমরা যারা যুদ্ধের সময় নানান রকম অত্যাচার সহ্য করেছি, যে মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাতে আমরা যেন কার্পণ্য না করি।

অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি ক্রয় কর্মকর্তা

মন্তব্য করুন