২০০২ সালের ২১ ডিসেম্বর দি ইকোনমিস্ট লিখেছে, 'ইনডিড ইট ইজ সাজেস্টেড, মার্কস ওয়াজ রাইট অ্যাবাউট এ গুড মেনি থিংস- অ্যাবাউট এ লট অব হোয়াট ইজ রং উইথ ক্যাপিটালিজম, ফর ইনস্ট্যান্স, অ্যাবাউট গ্লোবালাইজেশন অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটস, অ্যাবাউট দ্য বিজনেস সাইকেল, অ্যাবাউট দ্য ওয়ে ইকোনমিক্স শেপস আইডিয়াজ। মার্কস ওয়াজ প্রিসিয়েন্ট; দ্যাট ওয়ার্ড কিপস কামিং আপ। বাই অল মিনস ডিসকার্ড কমিউনিজম অ্যাজ প্র্যাকটিসড ইন দ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন অ্যান্ড ইস্টার্ন ইউরোপ (অ্যান্ড চায়না, নর্থ কোরিয়া, কিউবা অ্যান্ড ইনফ্যাক্ট হোয়্যারএভার ইট হ্যাজ বিন প্র্যাকটিসড)। বাট প্লিজ ডোন্ট ডিসকার্ড মার্কস।' যারা বিশ্বের সংবাদপত্র জগৎ সম্পর্কে জানেন, তাদের দৃষ্টিতে লন্ডন থেকে প্রকাশিত প্রভাবশালী ইংরেজি সাপ্তাহিক দি ইকোনমিস্ট দক্ষিণপন্থি উদারনীতিবাদী অর্থনৈতিক চিন্তাচেতনা ধারণ করে। স্বাভাবিকভাবেই সাপ্তাহিকটি কমিউনিজমকে কোনোক্রমেই সমর্থন করতে পারে না। এটা পত্রিকাটির আদর্শিক অবস্থান। এই অবস্থান সত্ত্বেও কমিউনিস্ট মতাদর্শের জনক কার্ল মার্কসকে পরিত্যাগ না করার জন্য দি ইকোনমিস্ট সনির্বন্ধ অনুরোধ করেছে। কার্ল মার্কস ছিলেন এবং এখনও আছেন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক ও চিন্তাবিদ হিসেবে। কার্ল মার্কস সমাজতন্ত্র নিয়ে উল্লেখযোগ্য কিছু লেখেননি। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি কেমন হবে, সে সম্পর্কেও তিনি কোনো রকম আলোকপাত করেননি। তার বিশাল লিখিত পাণ্ডুলিপিতে সমাজতান্ত্রিক সমাজ সম্পর্কে তিনি বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে কিছু মন্তব্য করেছেন। তার অবদান হলো পুঁজিবাদী সমাজের অভ্যুদয়। পুঁজিবাদের গতি-প্রকৃতি এবং এ সমাজের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিরোধ বিশ্নেষণ। পুঁজিবাদী সমাজ তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বের কারণেই ধ্বংস হয়ে যাবে বলে মার্কস ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। পুঁজিবাদের ক্ষেত্রে বাণিজ্যচক্রের স্ম্ফীতি ও মন্দা কীভাবে ঘটে এবং কেন ঘটে, তা বিস্তৃত পরিসরে তিনি তুলে ধরেছেন। ১৯৩০-এর দশকে পুঁজিবাদ মহামন্দার মধ্যে পড়েছিল। একের পর এক কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল এবং শ্রমিকরা হয়ে পড়েছিল বেকার। সাধারণ মানুষের হাতে বেকারত্বের ফলে কোনো আয় ছিল না। এর ফলে চাহিদা হ্রাস পায় এবং সংকট ঘনীভূত হতে শুরু করে। মনে হচ্ছিল, পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার মৃত্যুঘণ্টা বেজে উঠেছে। পুঁজিবাদকে রক্ষা করার জন্য কেইনসীয় অর্থনীতির তত্ত্ব খুব কাজে এলো। এই তত্ত্বানুযায়ী বলা হলো- সরকারকে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং এর মধ্য দিয়ে কর্মসংস্থান গতি পাবে। মানুষের হাতে ক্রয়ক্ষমতা এলে মন্দা বিদূরিত হবে। আমাদের জীবদ্দশায় নব্বইয়ের দশকে এশীয় সংকট দেখেছি এবং ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় একটি বড় ধরনের মন্দা পুঁজিবাদকে বড় রকমের ধাক্কা দিয়েছিল। এই ধাক্কাকে সরকারগুলোর তরফ থেকে মন্দা না বলে বলা হয়েছিল, এটি একটি 'রিসেশন'। যাই বলা হোক না কেন, পুঁজিবাদ সংকটের মধ্যে পড়ে হিমশিম খাচ্ছিল। এই রিসেশনের অবস্থা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শুরু হওয়ার পর দেখা গেল, সমান্তরালভাবে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এ অবস্থার নামকরণ করা হলো 'জবলেস গ্রোথ'। আশ্চর্যের বিষয়, গ্রোথ হচ্ছে কিন্তু কর্মসংস্থান হচ্ছে না। ফলে সংকট থেকে উত্তরণ একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং কার্যত অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে পড়ল।

২০০৭ সালে লন্ডনে একটি ইহুদিবাদী গ্রন্থসপ্তাহ পালিত হয়। কার্ল মার্কসের মৃত্যু দিবস হলো ১৪ মার্চ। এর দুই সপ্তাহ আগে গ্রন্থসপ্তাহটি পালিত হয়েছিল। গ্রন্থসপ্তাহের স্থান থেকে হাঁটাপথের দূরত্ব ছিল ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গোলাকার পাঠকক্ষ। এখানে বসেই কার্ল মার্কস তার কালজয়ী গবেষণাগুলো করেছেন। প্রখ্যাত ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এরিক হবস্‌বম এবং জ্যাকস আটালি দু'জনে সেখানে গিয়েছিলেন মার্কসের প্রতি মরণোত্তর শ্রদ্ধা জানাতে। তারা দু'জন সমাজতন্ত্রবাদী হলেও তাদের চিন্তার মধ্যে পার্থক্য ছিল। ১৮৮৩ সালে মার্কস যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন তার মৃত্যু হয়েছিল একজন ব্যর্থ মানুষ হিসেবে- এমন কথা বলা যায় না। কারণ জার্মানি এবং রুশ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে তার লেখার প্রভাব অনুভূত হচ্ছিল। তার অনুসারীরা জার্মান শ্রমিক আন্দোলনের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছিল। শুধু ১৮৮৩ সাল দিয়ে বোঝা যায় না, তিনি কী পরিমাণ লেখালেখি করেছেন। তখন কার্ল মার্কসের দুনিয়া কাঁপানো গ্রন্থ 'ডাস ক্যাপিটাল'-এর কিছুটা অসমাপ্ত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার রাজনৈতিক প্রয়াসের মধ্যে ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের ব্যর্থতার ঘটনা রয়েছে। তথাকথিত প্রথম আন্তর্জাতিক ১৮৬৪ থেকে ১৮৭৩ পর্যন্ত নড়বড়ে অবস্থায় টিকে ছিল। আশ্চর্য হতে হয়, এমন একজন মনীষী যিনি তার জীবনের সফল সৃষ্টি ব্রিটেনে করেছেন, তার ছাপ ব্রিটেনের রাজনীতি কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে পড়েনি। অথচ ব্রিটেনে আশ্রয় গ্রহণ করে তিনি তার জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় কাটিয়েছেন।

আমরা দেখি, কার্ল মার্কসের মৃত্যু-পরবর্তীকালে তারই কর্মপ্রয়াসের সাফল্য এসেছিল। তার মৃত্যুর ২৫ বছরের মধ্যে ইউরোপে শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক দল তার নামেই গঠিত হয়েছিল। এসব দল তার প্রেরণাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ইউরোপের অনেক দেশে শ্রমিক শ্রেণির এসব রাজনৈতিক দল ১৫ থেকে ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পেয়েছিল। ব্রিটেন ছিল তার ব্যতিক্রম। ১৯১৮ সালের পর এসব পার্টির বেশিরভাগ অংশ সরকারি দল হয়ে উঠেছিল। ফ্যাসিজমের পরাজয়ের পরও এ রকম অবস্থা অব্যাহত ছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষে এসব দলের বেশিরভাগই মার্কসের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করার চেষ্টা করেছে। এসব দল এখনও আছে। ইতোমধ্যে মার্কসের শিষ্যরা অগণতান্ত্রিক এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশে বিপ্লবী গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেছে। মার্কসের মৃত্যুর ৭০ বছর পর বিশ্বের জনগোষ্ঠেীর এক-তৃতীয়াংশ কমিউনিস্ট পার্টির শাসন ব্যবস্থার আওতাভুক্ত ছিল। এসব পার্টি দাবি করেছে, তারা মার্কসের কাছ থেকেই প্রেরণা পেয়েছে। এখনও বিশ্বের ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠী কমিউনিস্ট পার্টি শাসিত রাষ্ট্রে বাস করে। অবশ্য সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদে এসব কমিউনিস্ট রাষ্ট্র তাদের পলিসিতে নাটকীয় পরিবর্তন এনেছে। সংক্ষিপ্তভাবে বলা যায়, যদি কোনো একক চিন্তাবিদ বিংশ শতাব্দীর ওপর অমোচনীয় ছাপ ফেলে থাকেন, তিনি কার্ল মার্কস। লন্ডনের হাইগেটে কার্ল মার্কসের সমাধি রয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে যে দু'জন চিন্তাবিদ মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন কার্ল মার্কস এবং হার্ভার্ড স্পেনসার। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এ দু'জনের সমাধি দৃষ্টিসীমার মধ্যে পড়ে। জীবদ্দশায় হার্ভার্ড পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন তার যুগের অ্যারিস্টটল হিসেবে। কার্ল মার্কস থাকতেন হ্যাম্পস্টিডের ঢালের মধ্যে। তার সাংসারিক খরচ চলত বন্ধু ফেডারিক অ্যাঙ্গেলসের অর্থে।

অদ্ভুত ব্যাপার, স্পেনসার যে সেখানে সমাহিত হয়েছেন- বিষয়টি অনেকেই জানেন না। তবে জাপান ও ভারত থেকে যাওয়া বয়োবৃদ্ধ মানুষেরা এখনও মার্কসকে শ্রদ্ধা জানাতে হাইগেটে তার সমাধিস্থলে আসেন। ইরান ও ইরাকের দেশত্যাগী কমিউনিস্টরা মার্কসের সমাধির কাছে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন।

কমিউনিস্ট সরকার এবং ব্যাপক গণভিত্তিসম্পন্ন কমিউনিস্ট পার্টিগুলো নিঃশেষ হয়ে গেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর। চীন ও ভারতে এই দল টিকে আছে, তবে তারা লেনিনবাদী কমিউনিস্ট প্রকল্প ত্যাগ করেছে। বিষয়টি কতটুকু সঠিক, না বেঠিক- তা নিয়ে কমিউনিস্ট মহলে ব্যাপক বির্তক আছে। চীন এখন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। আদর্শগতভাবে তারা এখনও মার্কস-লেনিন ও মাওকে অনুসরণ করে বলে দাবি করে। মার্কসের মৃত্যুবার্ষিকীতে চীন মার্কসের জন্মশহর ট্রায়ারে মার্কসের একটি বিশাল ভাস্কর্য স্থাপন করেছে। চীন দাবি করে, দেশটি এখন চীনা বৈশিষ্ট্যের সমাজতন্ত্র গড়ে তুলেছে। চীনে দারিদ্র্যের অবসান ঘটানো হয়েছে। তবে সেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য আছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি এখন পর্যন্ত মূল আদর্শের সঙ্গে রয়েছে। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক বেশ খানিকটা বৈরী হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন এশিয়া প্যাসিফিক অক্ষ তৈরি করে চীনকে মোকাবিলা করতে চাচ্ছে। এই অক্ষ 'কোয়াড' নামে পরিচিত। এর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও জাপান। একবিংশ শতাব্দীতে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা নাকচ করা যায় না। কার্ল মার্কসের সত্যিকারের উত্তরসূরি হলো কমিউনিজম। কমিউনিস্ট আদর্শে মার্কসের অবস্থান বিশাল ও ব্যাপক। ভিন্নমত পোষণকারী মার্কসবাদী অথবা মার্কসবাদী-লেনিনবাদী প্রবণতাধারীরা এখানে-সেখানে তাদের পদচিহ্ন স্থাপন করেছে। ১৯৫৬ সালে ক্রুশ্চেভ স্তালিনের নিন্দাভাষণ করলে এই ছোটখাটো গ্রুপগুলো বৃন্তচ্যুত সাবেক কমিউনিস্টে পরিণত হয়েছে।

মার্কসের মৃত্যুর ১২৫ বছর পর তিনি অতীতের মানুষে পরিণত হয়েছেন। তাকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার প্রয়োজন নেই। কিছু সাংবাদিক মনে করেন, মার্কস নিয়ে আলোচনা করার অর্থ হলো, তাকে ইতিহাসের ডাস্টবিন থেকে উদ্ধার করার চেষ্টা করা। এ রকম নেতিবাচক ধ্যান-ধারণাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে বলা যায়, মার্কস একবিংশ শতাব্দীর জন্য মহান চিন্তাবিদ হিসেবে আদৃত হবেন। এই শতাব্দীতে এসে আমরা মানুষের জীবনযাত্রায় যেসব সমস্যা দেখছি, তার ওপর গভীর আলোকপাত করেই মার্কস মার্কস হয়ে উঠেছিলেন। মার্কসের প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লেখাগুলো বিশ্নেষণ করলে আমরা রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, বিশ্বায়ন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে মহামূল্যবান উপলব্ধির সামগ্রী খুঁজে পাব। বিবিসির জরিপে কার্ল মার্কস বড় দার্শনিকদের বড় দার্শনিক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। গুগলে তার নাম টাইপ করলে বড় বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে। গুগলে অবশ্য তার অবস্থান ডারউইন ও আইনস্টাইনের পরেই। অ্যাডাম স্মিথ ও ফ্রয়েডের অনেক ওপরে মার্কসের স্থান। মার্কস নিয়ে এ লেখাটির উদ্দেশ্য হলো- মানব জাতির বড় বড় সমস্যা সম্পর্কে মার্কসের শিক্ষা কত যে প্রাসঙ্গিক, তা তুলে ধরা এবং বর্তমান প্রজন্মকে এমন একজন দার্শনিকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক

মন্তব্য করুন