স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় মৌলিক পরির্বতন করা হচ্ছে। মেয়াদ শেষ হলে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের বদলে বসানো যাবে প্রশাসক। ২২ নভেম্বর এমন বিধান রেখে 'জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০২১'-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। একই সঙ্গে জেলা পরিষদ গঠন প্রক্রিয়া বদল করা হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, জেলার অধীন উপজেলা পরিষদগুলোর চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র এবং সিটি মেয়ররা জেলা পরিষদের সদস্য হবেন।

গত ৪ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠকে পৌরসভার মেয়াদ শেষে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রেখে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন ২০০৯-এর সংশোধনী অনুমোদিত হয়। ওই দিন সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, সিটি করপোরেশন পরিষদের মেয়াদ শেষে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রয়েছে। তেমনি পৌরসভায় মেয়াদ শেষে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রেখে আইনের সংশোধনী বিল মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদেও এ ধরনের বিধান যুক্ত করা হবে। দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় এই মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে ভাবনার অবকাশ রয়েছে। আগেও পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। প্রতিটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান একটি প্রশাসনিক ইউনিট, যাকে সংবিধানে বলা হয়েছে 'প্রশাসনিক একাংশ'। এগুলোর রয়েছে স্বতন্ত্র সত্তা ও ধারাবাহিকতা।

স্থানীয় সরকারের এসব পরিষদে প্রশাসক নিয়োগে গণতন্ত্র সংকুচিত হয়ে আমলাতন্ত্র শক্তিশালী হবে বলে আশঙ্কা স্থানীয় সরকার বিশ্নেষকদের। এর রয়েছে সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রভাব। স্থানীয় সরকারগুলোতে নির্বাচিত পরিষদের স্থলে অনির্বাচিত ব্যক্তি থাকলে জাতীয় নির্বাচনকালীন দেশ পরিচালনায় অনির্বাচিত সরকারের দাবির যুক্তিকে জোরালো করবে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ শেষে প্রশাসক নিয়োগের বিধানটি সংবিধান সমর্থন করে কিনা? জেলা হলো সরাসরি সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ স্বীকৃত প্রশাসনিক একাংশ। পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ স্বীকৃত আইনসৃষ্ট প্রশাসনিক একাংশ। সংবিধানের ১৫২ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- 'প্রশাসনিক একাংশ' অর্থ জেলা কিংবা এই সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে আইনের দ্বারা অভিহিত অন্য কোনো এলাকা। অর্থাৎ সংবিধানে জেলাকে সরাসরি প্রশাসনিক একাংশ ঘোষণা করা হয়েছে এবং ৫৯ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে অন্য স্থানীয় শাসনসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানকে আইনের দ্বারা প্রশাসনিক একাংশ ঘোষণার সুযোগ রাখা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন ২০০৯-এর ৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- 'গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি পৌরসভা একটি প্রশাসনিক একাংশ বা ইউনিট হিসাবে গণ্য হইবে।' স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ এর ৩(৭) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- 'গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন একটি প্রশাসনিক একাংশ বা ইউনিট হিসাবে গণ্য হইবে। অর্থাৎ জেলা সরাসরি সংবিধান স্বীকৃত এবং পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন আইনসৃষ্ট সংবিধান স্বীকৃত প্রশাসনিক ইউনিট।'

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগের বৈধতা দেয় না। স্থানীয় সরকারের কোনো পরিষদ মনোনীত প্রশাসক বা অনির্বাচিত কোনো ব্যক্তির দ্বারা শাসিত হলে তা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। কারণ সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- 'আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।' আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠান এবং মনোনীত ব্যক্তি কখনও এক নয়। তাই সংবিধান অনুযায়ী প্রশাসনিক একাংশ ঘোষিত কোনো ইউনিট অনির্বাচিত ব্যক্তি দ্বারা শাসিত হওয়ার সুযোগ নেই। যদি এ ধরনের বিধানসংবলিত আইন প্রণয়ন হয়েও যায়, তবে তা আদালতে চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে বাতিলযোগ্য। সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উলেল্গখ রয়েছে, 'জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।'

নির্বাহী পরিচালক, হাউস

মন্তব্য করুন