নানামাত্রিক নারী নির্যাতনের চিত্র সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই উঠে আসছে। ধর্ষণ, যৌন নিপীড়নের ভয়াবহতা সংগত এ প্রশ্ন দাঁড় করায়- কোন সামাজিক অবক্ষয়ের গাঢ় ছায়া ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। উত্তর মেলে না। শিশুরা পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছে না। ধর্ষকরা হামলে পড়ছে তাদের ওপরেও। আমাদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল ধর্ষকের কঠোর দণ্ডের বিধান রেখে আইন প্রণয়নের পর। আমরা আশা করেছিলাম, ধর্ষণ তো বটেই, নারীর মুক্তি মিলবে যৌন হয়রানি থেকেও। কিন্তু তা হয়নি। এই আইন পাসের পরও অনেক ঘটনা ঘটেছে।

সম্প্রতি রাজধানীর 'ঠিকানা' নামে একটি গণপরিবহনে এক কলেজছাত্রী অর্ধেক ভাড়া দিতে চাইলে ওই পরিবহনের সহকারী তাকে ধর্ষণের হুমকি দেয়। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে ঢাকার পথে নামেন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী। রাস্তা অবরোধ করেন পুরান ঢাকার চানখাঁরপুলে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রতিশ্রুতিতে তারা শেষ পর্যন্ত অবরোধ প্রত্যাহার করেন। খুব দ্রুততম সময়ে র‌্যাব সদস্যরা ওই পরিবহনের চালক ও তার সহযোগীকে নারায়ণগঞ্জের একটি এলাকা থেকে আটক করতে সক্ষম হন। তাদের এ তৎপরতা অভিনন্দন পাওয়ার দাবিদার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ওই পরিবহনে ছাত্রীটি যখন এমন জঘন্য ঘটনার শিকার হন, তখন অন্য যাত্রীরা কী করলেন? তারা কেন তাদের জায়গা থেকে নাগরিক দায়িত্ববোধ কিংবা নৈতিকতার তাগিদে তখনই চালক ও তার সহকর্মীকে পুলিশের হাতে তুলে দেননি? যে ছাত্রী পুরান ঢাকার বকশীবাজার থেকে 'ঠিকানা' পরিবহনে উঠে নারায়ণগঞ্জের দিকে যাচ্ছিলেন, তিনি কেন এত যাত্রীর মধ্যেও একা হয়ে পড়লেন?

গণপরিবহনে ইতোমধ্যে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার অনেক ঘটনা ঘটেছে। আমরা দেখেছি, এসব বর্বরোচিত ঘটনার অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার গতি মন্থর। দায়িত্বশীলদের যথাযথভাবে কর্তব্য পালনে অদক্ষতা কিংবা নিষ্ঠার অভাব; কোনো কোনো ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের সময়মতো প্রতিবাদ-প্রতিরোধ না করায় এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখোমুখি অনেককেই হতে হচ্ছে। দুস্কর্মকারীরা সংখ্যায় নগণ্য। তারপরও তাদের দাপটে সমাজ যেন থরথর কম্পমান। ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে নানা ক্ষেত্রে। পরিবার, কর্মস্থল, পথেঘাটে প্রায় সর্বত্রই যেন নারীর নিরাপত্তার পথ কণ্টকাকীর্ণ। অথচ বিগত কয়েক দশকে বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের ধারাবাহিক তিন মেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনায় নারী-শিশুকল্যাণে অনেক কিছু করা হয়েছে। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে নানা ক্ষেত্রে আমাদের দেশের নারীদের অগ্রযাত্রা লক্ষণীয়। কিন্তু নারীর নিরাপত্তাহীনতা আজও দূর হয়নি, উপরন্তু বাড়ছে। এ যেন প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো। এই অন্ধকার সব উন্নয়ন-অগ্রগতি ম্লান করছে। এ চিত্র সভ্যতা-মানবতার কলঙ্ক। কোনো সভ্য সমাজে এমনটি চলতে পারে না। এ ক্ষেত্রে দায় আছে সবার। তবে নারীর নিরাপত্তা তথা জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় সর্বাগ্রে সরকারেরই। নাগরিক সমাজের দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে আমাদেরও সামাজিক দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে নিষ্ঠ হতে হবে।

গণপরিবহন যেন নারীর বিপদসংকুলতার অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। দেশের গণপরিবহন খাতে বিরাজ করছে নৈরাজ্য। আরে বলি হচ্ছে মানুষ। তারা মানুষকে জিম্মি করে ফায়দাও লুটছে। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের শক্তি এত বেশি; তাতে সংগতই প্রশ্ন জাগে- এ শক্তির উৎস কী? গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া শুধু তাদের যৌক্তিক দাবিই নয়, অধিকারও বটে। আমাদের দেশের এর আইনি বিধান এত আন্দোলন-দাবির পরও নিশ্চিত করা হয়নি। কিন্তু আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ এ অঞ্চলের আরও কয়েকটি দেশে এর আইনি ভিত্তি রয়েছে। 'ঠিকানা' পরিবহনে যে ঘটনা ঘটল তা গাঢ় অন্ধকারের একটি দিক মাত্র। সভ্যতা-মানবতার শত্রু মানুষরূপী এই কীটদের দৃষ্টান্তযোগ্য বিচার নিশ্চিত হোক দ্রুত। দৃষ্টান্তযোগ্য শাস্তিতর লম্বা তালিকা যদি সামনে থাকে, তাহলে সমাজবিরোধীরা দুস্কর্ম থেকে নিবৃত্ত হবে। একই সঙ্গে সামাজিক জাগরণের লক্ষ্যে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদেরও কাজ করতে হবে। রাজনীতিকদের এসব ব্যাপারে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে।

প্রদীপের নিচের অন্ধকার দূর করতে রাজনৈতিক অঙ্গীকারও জরুরি।

সমাজকর্মী

মন্তব্য করুন