আইসিটি দ্য গ্রেট ইকোয়ালাইজার। অর্থাৎ তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) হচ্ছে বিস্ময়কর সমতাকারী। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এই সমতা তৈরি করে ধনী ও গরিব, নারী ও পুরুষ, অগ্রসর ও অনগ্রসর মানুষ ও অঞ্চলের মধ্যে। মানুষের জীবনমান নাটকীয়ভাবে উন্নত করে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর করে সমতা তৈরির অনুঘটক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি। তবে আইসিটিকে সমতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ করানোর জন্য তিনটি পূর্বশর্ত পূরণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রথমত, প্রযুক্তি বোঝার মতো নেতৃত্ব; দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল বৈষম্য দূর করার জন্য সুপরিকল্পিত কার্যক্রম; তৃতীয়ত, প্রযুক্তি ব্যবহারে মানুষকে সক্ষম করে তোলা। বাংলাদেশে এ তিনটি শর্ত পূরণে কোনো ঘাটতি আছে বলে মনে হয় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির বিস্ময়কর আবির্ভাব ও অগ্রগতি সম্পর্কে জ্ঞাত বলেই রূপকল্প ২০২১-এর মূল উপজীব্য হিসেবে ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে তৃণমূল থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুপরিকল্পিত কার্যক্রমসহ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে তাকে সহযোগিতা করছেন খ্যাতিমান তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সজীব ওয়াজেদ জয়। তৃতীয়ত, দেশের শতভাগ এলাকা মোবাইল ফোন কভারেজ এবং অধিকাংশ ইউনিয়ন উচ্চগতির (ব্রডব্যান্ড) ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের আওতায় চলে আসায় গ্রাম এলাকায়ও মানুষের প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষমতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

১১ থেকে ১৪ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির সর্ববৃহৎ বিশ্ব সম্মেলন ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অন ইনফরমেশন টেকনোলজি (ডব্লিউআইসিটি) ২০২১-এর মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে 'আইসিটি দ্য গ্রেট ইকোয়ালাইজার' নির্ধারণে বঙ্গবন্ধুর সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে প্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচনা করা। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পূর্ণতা যখন এক মোহনায় এসে উপনীত তখন ডব্লিউআইসিটি ২০২১ সম্মেলনে এমন একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে ওয়ার্ল্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সার্ভিসেস অ্যালায়েন্স (ডব্লিউআইটিএসএ) এবং আইসিটি বিভাগ। বঙ্গবন্ধু প্রযুক্তি ও সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে কতটা নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন, তার প্রকাশ আমরা দেখতে পাই বিশ্বমঞ্চে প্রদত্ত তার ভাষণেও। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম অধিবেশনে তিনি বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য স্বনির্ভরতা। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সম্পদ ও প্রযুক্তিবিদ্যার শরিকানা মানুষের দুঃখ-দুর্দশা হ্রাস করিবে এবং আমাদের কর্মকাণ্ডকেও সহজতর করিবে, ইহাতে কোনো সন্দেহ নাই। নতুন বিশ্বের অভ্যুদয় ঘটিতেছে। আমাদের নিজেদের শক্তির উপর আমাদের বিশ্বাস রাখিতে হইবে।' ভাষণে তিনি অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক অবিচার, আগ্রাসন এবং পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকিমুক্ত বিশ্ব গড়ার আহ্বান জানান। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিস্ময়কর অগ্রগতির সুফল যাতে সবাই পায় সে জন্য তার 'ন্যায্য বণ্টন' আশা করেছিলেন, যাতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্য অর্জিত হয়।

বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে ডিজিটাল বিপ্লবে শামিল হওয়ার ভিত্তি তৈরি করেন। সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্য বাস্তবায়নকে দ্রুততর করার জন্যই তিনি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির সম্প্রসারণে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু বৈষম্যহীন সুখী-সমৃদ্ধিশালী সোনার বাংলা বিনির্মাণে দূরদর্শী চিন্তা থেকে অন্যান্য খাতের মতো তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতেও নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেন। স্যাটেলাইট কানেক্টিভিটি প্রতিষ্ঠা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার, প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্তকরণ এবং রেডিও-টেলিভিশনের মতো প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনে নানা উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেন। স্বাধীনতার ৫০ বছরের ২৭ বছরই তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির সম্প্রসারণে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিএনপি সরকার তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সম্প্রসারণে কোনো উদ্যোগ তো নয়ই, বরং কতিপয়ের স্বার্থে এমন সব পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের পথ রুদ্ধ করে। ১৯৯২ সালে খালেদা জিয়ার সরকার বিনা অর্থে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সাবমেরিন কেবল লাইন 'সাউথ ইস্ট-মিডল ইস্ট-ওয়েস্ট ইউরোপ (সি-মি-উই)'-এ সংযুক্ত হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। যুক্তি দেখানো হয় রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার। মোবাইল ফোনের একটি মাত্র লাইসেন্স দেওয়া হয় বিএনপির এক প্রভাবশালী মন্ত্রীকে। তার কোম্পানির একটি মোবাইলের দাম পড়ে লাখ টাকা। দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সম্প্রসারণে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার সরকার মোবাইল ফোনের মনোপলি ভেঙে দিয়ে তা মানুষের কাছে সহজলভ্য করে। কম্পিউটার আমদানির ওপর শুল্ক্কহার কমিয়ে তা মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনে। ১৯৯৯ সালে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে হাইটেক পার্ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু ২০০১ সালে ক্ষমতার পালাবদলে বিএনপি সরকার হাইটেক পার্ক নির্মাণের সিদ্ধান্তকে শীতনিদ্রায় পাঠায়।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করলে ২০০৯ সাল থেকে শুরু হয় ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অভিযাত্রা। ১৩ বছরে তথ্যপ্রযুক্তি, বিশেষ করে ইন্টারনেট প্রকৃত অর্থেই বিস্ময়কর সমতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পথ সুগম করেছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুযোগগুলোর জন্য প্রতিযোগিতায় সমাজের সব মানুষের জন্য সমান খেলার ক্ষেত্র (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) তৈরি করছে তথ্যপ্রযুক্তি। বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় এসে সমৃদ্ধ আনন্দময় জীবন সৃষ্টি, সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠাসহ তার স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের লক্ষ্যে নানা উদ্যোগের সঙ্গে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির বিকাশে পথনকশা প্রণয়ন করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে পথ ধরেই ডিজিটাল বাংলাদেশকে দৃশ্যমান বাস্তবতায় পরিণত করেছেন। ডিজিটাল বাংলাদেশের এই সাফল্যের পথ ধরেই ভবিষ্যতে বঙ্গবন্ধুর সাম্য সমাজ তৈরিতে আইসিটি হোক গ্রেট ইকোয়ালাইজার।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

মন্তব্য করুন