পঞ্চাশ বছর আগে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন আত্মসমর্পণ করে, তখন সারা বাংলাদেশ ছিল ধ্বংসস্তূপ। মুক্তিযুদ্ধকালীন ৯ মাসে পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতায় এ দেশের ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়। এক কোটি মানুষ শরণার্থী হিসেবে ভারতে চলে যায়। আরও এক কোটি মানুষ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঘরছাড়া হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছিল। তখনকার বাংলাদেশ নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষক, বিশ্নেষক, অর্থনীতিবিদ ও সাংবাদিক যারা লেখালেখি করেছিলেন, তাদের মধ্যে মতভেদ ছিল যদিও, তথাপি তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দেখতে পাননি। দু'জন বিদেশি অর্থনীতিবিদ তথা নরওয়ের জাস্ট ফাল্যান্ড এবং ব্রিটেনের জে আর পার্কিনসন একই সঙ্গে পাকিস্তানের প্ল্যানিং কমিশনে কাজ করেছেন এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে আমাদের প্ল্যানিং কমিশনেও কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করতে এসেছিলেন। ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে তারা নিজ দেশে ফিরে যান। ১৯৭৬ সালে এ দুই অর্থনীতিবিদ 'বাংলাদেশ দ্য টেস্ট কেস ফর ডেভেলপমেন্ট' নামে একটি বই বের করেছিলেন লন্ডন থেকে। তারা সেখানে বলেছিলেন, 'বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের যে সম্ভাবনা ছিল, তার মৃত্যুর পরে সেই সম্ভাবনা সম্ভবত অনেক দূরীভূত হয়ে গেল। তাদের ভাষায়, 'বাংলাদেশ হচ্ছে উন্নয়নের একটি পরীক্ষাক্ষেত্র। বাংলাদেশ যদি তার উন্নয়ন সমস্যার সমাধান করতে পারে, তাহলে বুঝতে হবে, যে কোনো দেশই উন্নতি করতে পারবে।'

৫০ বছর আগের বাংলাদেশ ছিল বিদেশি সাহায্য এবং রিলিফনির্ভর একটি দেশ। বিদেশি সাহায্য না এলে বাংলাদেশে কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ লেনদেন কিংবা বাজেট হতো না। বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। তাজউদ্দীন আহমদ বেতারে সেই বাজেট ঘোষণা করেছিলেন। ওই ছোট্ট বাজেট ছিল বিদেশি সাহায্যনির্ভর। বঙ্গবন্ধু যখন দেশে ফিরে আসেন, তখন বিদেশি সাংবাদিকরা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনার দেশ তো একটা ধ্বংসস্তূপ। এ দেশকে আপনি কীভাবে গড়ে তুলবেন? তখন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমার দেশের মাটি আছে, আমার দেশের মানুষ আছে। এ দুটো দিয়েই আমি বাংলাদেশকে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড় করাব। তখন অর্থনৈতিক দিক থেকে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশকে 'আন্ডার ডেভেলপ কান্ট্রি' হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো। বঙ্গবন্ধু চেষ্টা করেছেন এই আন্ডার ডেভেলপ কান্ট্রিকে কীভাবে উন্নয়নের কাতারে নিয়ে যাওয়া যায়।

সেই সময় রিলিফের চাল না এলে আমাদের খাদ্য জুটত না। কাপড় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুই ছিল সাহায্যনির্ভর। অন্যদিকে সাহায্যকারী দেশের সংখ্যাও ছিল কম। ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও পূর্ব ইউরোপের কিছু দেশ সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছিল। তখন আমাদের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। এই বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ আমরা উৎপাদন করতে পারতাম। মাইন পোঁতার কারণে আমাদের দুটি সমুদ্রবন্দর বন্ধ ছিল। পরে সোভিয়েত নৌবাহিনী সেসব মাইন অপসারণে সহায়তা করে। আমাদের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তথা তেজগাঁও বিমানবন্দর একেবারেই ধ্বংসপ্রাপ্ত।

এমন বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধু দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে বঙ্গবন্ধু এসব সংকটের সঙ্গে সবচেয়ে বড় যে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিলেন, তা হলো দুর্নীতি। তিনি দুর্নীতি, কালোবাজারি, টেন্ডারবাজি নিয়ে সব সময় কথা বলেছেন। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন দেশে এবং দেশের বাইরে সব ধরনের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে দেশকে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে। সে কাজটি তিনি যখন করে উঠেছেন, ঠিক তখনি তাকে হত্যা করা হয়। এর পর প্রায় তিন দশক বাংলাদেশ সামরিক শাসন ও বেসামরিক শাসনের মোড়কে সামরিক শাসনের অধীনে।

বঙ্গবন্ধু দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৯ মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি আধুনিক সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র ছিল সেই সংবিধানের চার মূলনীতি। কিন্তু তৎকালীন শাসকরা সে সংবিধানকে কাটছাঁট করে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করেন। তারা সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে দেন; রাষ্ট্রধর্মও প্রবর্তন করেন। সামরিক শাসকরা দেশের উন্নয়নে যতটুকু না গুরুত্ব দিয়েছেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন দেশকে কীভাবে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়া যায়, সেদিকে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক যে উন্নয়ন-অগ্রগতি ঘটেছে, তার সিংহভাগ কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার। তিনি প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন ১৯৯৬ সালে। সেই মেয়াদে খুব বেশি উন্নয়ন তিনি করতে পারেননি। কারণ তখনও প্রশাসন ছিল সামরিক শাসনামলের। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসেন এবং গত ১২ বছর ধরে একটানা তিন মেয়াদে সরকারপ্রধান হিসেবে দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন।

বঙ্গবন্ধু তার সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে বাংলাদেশকে অনুন্নত দেশ থেকে নিম্ন আয়ের দেশে উত্তীর্ণ করেছিলেন। আর বঙ্গবন্ধুকন্যা গত ১২ বছরে বাংলাদেশকে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ করেছেন। শুরুতে আমাদের বৈদেশিক কোনো মুদ্রা ছিল না। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ প্রায় ৪৯ বিলিয়ন ডলার। শুরুতে আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল ১০০ ডলারের কাছাকাছি। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে এখন আমাদের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৫৫৪ ডলার। শুরুতে কাঁচা পাট ও চা ছাড়া আমাদের রপ্তানিযোগ্য তেমন কোনো পণ্য ছিল না। আমরা যারা সেই সময়ের প্রজন্ম তারা দেখেছি, রিলিফের কাপড় ছাড়া এদেশের মানুষের কাপড় জুটত না। সেই দেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে আমরা ৩০ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছি।

বাংলাদেশে যে খাতগুলোতে সবচেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছে, তার অন্যতম নারীর ক্ষমতায়ন। বাংলাদেশের এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে নারীর উপস্থিতি নেই। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে তো বটেই, পুরো এশিয়ার মধ্যে মডেল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। আমাদের জনসংখ্যা সাড়ে সাত কোটি থেকে এখন ১৭ কোটি। এ সময়ে নগরায়ণের কারণে আমাদের চাষাবাদযোগ্য জমি কমেছে ১৪/১৫ শতাংশ। এর পরও আমরা খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। যে দেশের মানুষ রিলিফ ছাড়া খাদ্য জোটাতে পারত না, সেই দেশ সম্প্রতি কয়েকটি দেশকে রিলিফ দিয়েছে দুর্যোগের সময়। বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ স্থান দখল করেছে। যে বাংলাদেশের কোনো রিজার্ভ ছিল না, সেই বাংলাদেশ সম্প্রতি শ্রীলঙ্কাকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা দিয়েছে। আমাদের জনসংখ্যা যখন সাড়ে সাত কোটি ছিল, তখন ৪০ শতাংশের বেশি মানুষের অক্ষরজ্ঞান ছিল না। এখন আমাদের ৭৬ শতাংশ মানুষ শিক্ষিত। বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় মিলে সাড়ে ছয় কোটি থেকে সাত কোটি ছেলেমেয়ে পড়ালেখা করছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বেশি। আমাদের বাজেট ৭৮৬ কোটি টাকা থেকে ছয় লাখ কোটি টাকায় উত্তীর্ণ হয়েছে। এক সময় আমাদের ৮০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। সেই দারিদ্র্যের হার কভিড-১৯ মহামারির আগে আমরা ২০ শতাংশে নামিয়ে এনেছিলাম। যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেউ দেখতে পায়নি, সেই বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৭তম অর্থনীতির দেশ। আমরা প্রত্যাশা করছি, ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ বিশ্বে ২৪তম অর্থনীতির দেশ হবে।

বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। এটি জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক কর্তৃক স্বীকৃত। যে পাকিস্তান থেকে আমরা স্বাধীন হয়েছি, সেই পাকিস্তানের অর্থনীতি বিশ্নেষকরা এখন বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেল অনুসরণ করতে চান। বিগত ৫০ বছরে সবদিকে আমাদের উন্নয়ন হয়েছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। ১৯৭৬ সালে যখন প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম তখন আমেরিকানরা বাংলাদেশ চিনত না। তারা বলত 'মুজিব কান্ট্রি'। এখন তারা বাংলাদেশকে বাংলাদেশ হিসেবেই চেনে। আর এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গত ৫০ বছরে আমাদের সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো, আমরা দুর্নীতি রোধ করতে পারিনি। দুর্নীতির পরিসর বেড়েছে। আগামীতে সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধু যোগ্য লোককে যোগ্য স্থানে পদায়ন করেছিলেন। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যরা মূল্যায়িত না হওয়ায় নানাবিধ সংকট সৃষ্টি হতে দেখা যায়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করে তুলতে যোগ্যদের যথাস্থানে পদায়নের বিকল্প নেই। আমাদের দেশে এখনও সুষ্ঠু রাজনৈতিক ধারা গড়ে ওঠেনি। এই অসুস্থ রাজনীতি আমরা চলতে দিতে পারি না। যে কোনো মূল্যে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন প্রতিহত করতে হবে। এর সঙ্গে সমাজের সর্বস্তরে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। বিজয়ের মাসে সেই প্রত্যাশাই রাখছি।

সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন