'আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না' এক সময়ের বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমার শেষ দৃশ্যে শোনা যেত এই সংলাপ। সিনেমার শেষ দৃশ্যে নায়ক এবং তার লোকজন ভিলেইন এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গকে ইচ্ছামতো পিটিয়ে অর্ধমৃত বানিয়ে ফেলার পর পুলিশ এসে কথাটি বলত নায়ক এবং তার লোকজনদের। ভীষণ ক্লিশে হয়ে যাওয়া কথাটিই মনে পড়ল সাম্প্রতিক একটি ঘটনায়।

সাম্প্রতিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের একটা ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক মাধ্যমে। তারপর সেই ভিডিও থেকে রিপোর্ট করে দেশের শীর্ষস্থানীয় সব পত্রিকা। যৌক্তিক কারণেই ক্ষমতাসীন দল আর এর সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের প্রতি মানুষের ক্ষোভ আছে বলে ভিডিওটি নিয়ে অনেক মানুষ বেশ মজা করেছে। পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার এনায়েতনগর ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য প্রার্থীর পক্ষে কেন্দ্র দখল করে সিল মারতে গিয়েছিলেন ছাত্রলীগের নেতা ও তার সহযোগীরা। তারপর সেখানে র‌্যাব গিয়ে সেসব ছাত্রলীগ কর্মীকে লাঠিপেটা করে।

ঘটনার খবর পেয়ে সেই ভোটকেন্দ্রে যান আওয়ামী লীগ নেতা এবং সাংসদ শামীম ওসমান। সেখানে র‌্যাবের একজন অফিসারের সঙ্গে তিনি কথা বলেন এবং ছাত্রলীগ কর্মীদের মারধর করা বিষয়ে জানতে চান। র‌্যাব অফিসার অভিযোগ অস্বীকার করেন। ব্যাখ্যায় র‌্যাব কর্মকর্তা বলেছিলেন, তারা ছাত্রলীগ কর্মীকে পেটাননি, নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছেন। কথোপকথনের এক পর্যায়ে শামীম ওসমান র‌্যাব কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করেন, 'আপনি ছাত্রলীগের নেতাকে চোরের মতো পেটাবেন?'

জনাব ওসমানের উক্তিটি থেকে এটা স্পষ্ট, তিনি মনে করেন ছাত্রলীগের নেতাকে 'চোরের মতো' পিটিয়ে অপরাধ করেছেন ওই অফিসার। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে একচ্ছত্রভাবে ক্ষমতায় থাকা দলটির ছাত্র সংগঠনের নেতাকে চোরের মতো কেন, অতি সাধারণভাবেও পেটানো যাওয়ার কথাও না। এই দেশে বসবাস করে আমরা বুঝি সেটা। পাল্টা প্রশ্ন আসে, তাহলে এটা যদি হতো সাধারণ কোনো মানুষ কিংবা সরকারবিরোধী দলের কেউ, এমনকি একজন চোর, তাহলে তাকেও কি পেটানো যেত 'চোরের মতো?'

পুলিশকে বহু সময় রাস্তায় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সামলাতে হয়। অনেক সময় পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশকে বল প্রয়োগ করতে হয়। এমনকি কোন পরিস্থিতিতে গুলি চালাতেও হয় আইনিভাবেই পুলিশকে এই ক্ষমতা দেওয়া আছে। কিন্তু বাংলাদেশের পুলিশের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ সব সময় আছে, তারা প্রায় সব সময় অত্যন্ত অসহনশীলভাবে বল প্রয়োগ করে। এটা রাস্তার লাঠিপেটা থেকে শুরু করে গুলি করা পর্যন্ত।

রাস্তার বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি না হলেও পুলিশি হেফাজতে থাকা নাগরিককে জিজ্ঞাসাবাদের নামে অত্যাচার করা এই দেশে 'ওপেন সিক্রেট।' অত্যাচার বন্ধ করার জন্য মোটা টাকা ঘুষ পাওয়া থেকে শুরু করে স্বীকারোক্তি নিয়ে মামলার তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দেওয়া পর্যন্ত নানা উদ্দেশ্য থাকে পুলিশের।

নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক একটা কনভেনশনে (কনভেনশন অ্যাগেইনস্ট টর্চার, ক্যাট) স্বাক্ষর করার কারণে সরকারকে এ-সংক্রান্ত একটি আইন করতে হয়েছিল। আইনটি হলো, নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩। এই দেশে আইন হওয়া মানেই সেটা সঠিকভাবে কার্যকর হওয়া নয়, কিন্তু এই আইনটি প্রণয়নের পর থেকেই পুলিশ আইনটি বাতিলের দাবিতে বছরের পর বছর প্রচণ্ড শক্ত অবস্থান নিয়েছিল। সেটায় সফল না হয়ে আইনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো তাদের মতো করে সংশোধন করার দাবিতে এখনও তারা চাপ তৈরি করে যাচ্ছে। অর্থাৎ পুলিশ নির্যাতনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে প্রকাশ্যভাবে।

এই দেশের পুলিশ এবং একজন জনপ্রতিনিধির এটা জানা উচিত, রাষ্ট্রের কোনো নাগরিকের ওপরে নির্যাতন করতে পারে না রাষ্ট্রীয় কোনো বাহিনী। চোর-ডাকাত, মাদক ব্যবসায়ী, ধর্ষক এমনকি কোনো খুনিকেও পেটাতে পারে না কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, মানুষের ওপরে নির্যাতন করতে পারার যৌক্তিকতা কিন্তু আমরা সাধারণ নাগরিকরাই তৈরি করি। পকেটমার, ছিনতাইকারী, চোর, ডাকাতকে যদি আমরা ধরে ফেলতে পারি কখনও, তাহলে তাদের ইচ্ছামতো পেটানো এবং বহু ক্ষেত্রে পিটিয়ে মেরে ফেলার চর্চা আছে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে। অর্থাৎ আমরা এটা বিশ্বাস করি, এমন অপরাধীকে হাতেনাতে ধরতে পারলে পেটানো কিংবা মেরে ফেলা 'জায়েজ'।

অনেকে একটা কুযুক্তি দেন। যেহেতু এই দেশে বিচারব্যবস্থা অপরাধীকে অনেক সময়ই শাস্তি দিতে পারে না, তাই তাদের নিজ হাতে শাস্তি দিয়ে ফেলাই উত্তম। এই রাষ্ট্রে বসবাস করে রাষ্ট্রের প্রশাসন এবং বিচারব্যবস্থার নানা ত্রুটি সম্পর্কে নিশ্চয়ই আমরা জানি। কিন্তু সেটাকে দেখিয়ে এমন অপরাধ এর পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে আমরা প্রকারান্তরে ভয়ংকর অস্ত্র তুলে দিচ্ছি রাষ্ট্রের হাতে; বিপদাপন্ন করে তুলছি নিজেদের।

কলাম শুরু করেছিলাম আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া-সংক্রান্ত বাংলা সিনেমার সংলাপ দিয়ে। রাষ্ট্রের একজন নাগরিক কোনোভাবেই আইন তার নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। কিন্তু এই কথাটা আসলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য আরও বেশি প্রযোজ্য। যেহেতু তাদের হাতে বল প্রয়োগের ক্ষমতা আছে, তাই তাদের নিজ হাতে আইন তুলে নেওয়া আরও ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। জনগণ তো বটেই, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও শুধু ছাত্রলীগ কেন, চোরকেও পেটাতে পারে না 'চোরের মতো'।

শিক্ষক ও নাগরিক অধিকারকর্মী

মন্তব্য করুন