গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের পক্ষে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পাহাড়ের জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বাংলাদেশ যে বহু জাতি ও সংস্কৃতির দেশ তার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের এই চুক্তি স্বাক্ষর। বাংলাদেশের যে নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বহুত্ব তা উপলব্ধি করে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পার্বত্য চট্টগ্রাম আন্দোলনের মূল সংগঠন 'পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি'র সঙ্গে এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। এর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ববর্তী প্রায় ৩০ বছর ধরে যে সহিংসতা ও যুদ্ধাবস্থা চলছিল, তার অবসান ঘটে। এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখা 'শান্তি বাহিনী'র সদস্যদের জন্য অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পথ সৃষ্টি হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ১১টি জাতিসত্তার মানুষের আত্মপরিচয়, জাতিগত পরিচয় এবং সম্মিলিত পরিচয় লিপিবদ্ধ হয়েছিল 'উপজাতি' হিসেবে। সেই পরিচয় সংরক্ষণের ব্যাপারে রাষ্ট্র দায়িত্ব পালন করবে এবং সব নাগরিকের সমমর্যাদা নিশ্চিত করার কাজে রাষ্ট্র যথাযথ ব্যবস্থা নেবে সেটাই ছিল প্রত্যাশা।

বাংলাদেশের এক-দশমাংশজুড়ে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম। সেখানে বাঙালি জনগোষ্ঠীও বসবাস করেন। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই পৃথক তিন পার্বত্য জেলাকে একত্র করে পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন করা হয় সমতলের অন্যান্য জেলা পরিষদের তুলনায় অনেক বেশি অধিকার ও ক্ষমতা দিয়ে; এবং এই তিন জেলার মধ্যে সমন্বয় ও দিকনির্দেশনা প্রদানের লক্ষ্যে গঠন করা হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের একককেন্দ্রী রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে দ্বিকেন্দ্রীকরণের কার্যকর একটি রূপরেখা তৈরি হয়; যা বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ে স্বশাসনের ভিত্তি ভূমিকা তৈরি করবে বলে প্রত্যাশা করছি। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি পার্বত্য জনগণের ক্ষমতায়নের একটি চমৎকার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠন হয় এই শান্তিচুক্তির মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কার্যকরী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে ওঠার পথ প্রশস্ত হয়।

এই চুক্তির ফলে আদিবাসীদের স্বশাসনের অধিকার, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন এবং সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি সমাধানের প্রাতিষ্ঠানিক অন্য কাঠামোগুলোও সংরক্ষিত থাকে, যা পাহাড়ের মানুষকে আনন্দিত করে, উদ্বেলিত করে এবং তারা তাদের নিজ পরিচয় ও ভাষা-সংস্কৃতি নিয়ে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সমমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে উন্নয়নের ধারাকে আরও শক্তিশালী করে তোলার প্রত্যয় তৈরি হয়। কেননা পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রাতৃঘাতী সহিংসতার মধ্য দিয়ে আমাদের দরিদ্র এই দেশের অনেক সম্পদ সেখানে বিনষ্ট হতো। কাজেই যুদ্ধাবস্থা অবসানের মধ্য দিয়ে একদিকে আমাদের নিজস্ব সম্পদ অকারণে ব্যয় না করে গঠনমূলক বিনিয়োগের পথ তৈরি হয়, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য ব্যাপক পরিমাণে সহযোগিতার পথ প্রশস্ত হয়।


এই শান্তিচুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামসহ গোটা বাংলাদেশের জন্য একটি শান্তি ও সমৃদ্ধির বার্তাবহ হয়েছিল। কিন্তু এই চুক্তি বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের তরফ থেকে যে গড়িমসি ও দীর্ঘসূত্রতা তা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগণকে হতাশাগ্রস্ত করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বহিরাগত প্রবেশ এবং আদিবাসী এলাকায় আদিবাসীদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করার যে পথ বাংলাদেশ রাষ্ট্র সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে গ্রহণ করেছিল, সেই পথটি বন্ধ হবে সেটি প্রত্যাশিত ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির প্রারম্ভিকায় বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে যে বিশেষত্ব রয়েছে, রাষ্ট্র সে বিশেষত্বকে সংরক্ষণ করবে। কিন্তু আমরা দেখছি, সেখানে বহিরাগত প্রবেশের পেছনে আগে যে রাষ্ট্রীয় প্রত্যক্ষ আনুকূল্য ছিল সেটা বন্ধ হলেও চুক্তিউত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে বহিরাগত প্রবেশ বন্ধ হয়নি, বরং রোহিঙ্গাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ এবং বিভিন্ন স্থানে জমি দখলসহ বসতি স্থাপনের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনমিতির যে অবস্থান শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের সময়ে ছিল তাকেও ক্রমাগতভাবে জটিল করে তুলছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসাবে যে প্রতিষ্ঠানগুলো ভূমিকা পালন করার কথা (তিন পার্বত্য জেলার তিন জেলা পরিষদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ) তাদের গত ২৪ বছরেও কার্যকর করা হয়নি। তিন পার্বত্য জেলার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনায় সেখানে আদিবাসীদের নেতৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়নি। সেখানে আদিবাসীদের ক্রমাগতভাবে ভূমি হারানোর যে প্রক্রিয়া, সেটা এখনও অব্যাহত আছে। শান্তিচুক্তি অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে ছয়টি সেনানিবাস অব্যাহতভাবে থাকবে। কিন্তু শতাধিক যেসব সেনা ক্যাম্প পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, তা পর্যায়ক্রমে তুলে নিয়ে সেনানিবাসের ভেতরে তাদের নিয়ে আসার যে সিদ্ধান্ত ছিল, তা আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী নির্যাতনের ঘটনা এখনও ঘটছে। সেখানে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই বিষয়গুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষকে হতাশাগ্রস্ত করছে। সেখানকার আদিবাসীরা ভালো নেই, বাঙালিরাও ভালো নেই।

আদিবাসীরা ভালো নেই; কারণ শান্তিচুক্তি সম্পাদনের মধ্য দিয়ে তারা সমানাধিকারের যে স্বপ্ন দেখেছিল তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ায় ২৪ বছর পরে তাদের অনেকেই প্রতারিত বোধ করছে। অন্যদিকে বাঙালিরা ভালো নেই, কেননা সেখানকার পরিস্থিতি পুরো স্বাভাবিক হয়নি। সহিংসতার অবসান ঘটলেও যে সমঝোতার মধ্য দিয়ে সব ধর্ম, বর্ণের মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারে সেই পারস্পরিক আস্থার জায়গা এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি নিয়ে গোটা বিশ্বের যে প্রত্যাশা ছিল তা হোঁচট খাচ্ছে বারবার।

এমতাবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ২৪তম বর্ষপূর্তি আজ। এই দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশের তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সন্তু লারমা যে বিচক্ষণতা দিয়ে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন তা রাষ্ট্রীয় নীতিতে এতদিনেও প্রতিফলিত হলো না। এর কারণে নতুন করে যেসব সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং তা সংঘাতে রূপান্তরিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে। এই দিকটা বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। শান্তিচুক্তি সম্পাদনার মধ্য দিয়ে যে শুভযাত্রা আমরা শুরু করেছিলাম, সেটিকে তার যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া দরকার। তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চিরস্থায়ী হবে এবং পাহাড়ের মানুষ স্বস্তিতে, শান্তিতে জীবন-যাপন করতে পারবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সেখানকার মানুষের সম্মতি গ্রহণ জরুরি। পরিকল্পনা গ্রহণে এবং বাস্তবায়নে তাদের নেতৃত্বকারী ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। যার প্রয়োজন তাকে বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়ন কখনও টেকসই হতে পারে না। শুধু উপরি কাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্ব দিলে চলবে না, বরং তার সঙ্গে সেখানকার মানুষের মতামত প্রদান ও অংশগ্রহণের সুযোগ কতটা বিস্তৃত হলো, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের জনগণের একাংশকে বঞ্চিত রেখে আমরা কখনও এগিয়ে যেতে পারব না। এগিয়ে যেতে হলে সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।

অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন