দেশের ক্রিকেট এখন অস্থিরতার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। মাঠের পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। সত্যি বলতে কি, নতুন খেলোয়াড় অন্তর্ভুক্ত করে (এ কাজটি অনেক আগে থেকেই শুরু করা উচিত ছিল) দল পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে। আর তাই এখনএর চেয়ে বেশি কিছু আশা করা সম্ভব নয়। খেলোয়াড়দের স্কিল, সামর্থ্য, আত্মবিশ্বাস, মনোসংযোগ, মানসিক শক্তি, মাঠে সামর্থ্যের প্রয়োগের ক্ষেত্রে ঘাটতি আছে। এ জন্য সময় লাগবে। পরিকল্পনামাফিক এদের নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে। ফল পেতে সময় লাগবে। ক্রিকেট কাঠামো ও উইকেটের উন্নয়ন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। সচেতন মহল এখন তাকিয়ে আছে ক্রিকেট বোর্ড, ক্রিকেট পরিচালনা ও টিম ম্যানেজমেন্টের দিকে। তাকিয়ে আছে নির্বাচকদের দিকে- তারা নিরপেক্ষভাবে যেখানে যে খেলোয়াড় প্রয়োজন, সেই খেলোয়াড় চিহ্নিত করতে পারেন কিনা! তবে এটাও ঠিক, দেশে কিন্তু জাতীয় দলে এসে দায়িত্ব নেওয়ার মতো সামর্থ্য এবং যোগ্য খেলোয়াড়ের প্রকট অভাব।

যারা ক্রিকেট পছন্দ করেন, ভালোবাসেন, তাদের বক্তব্য- দেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এখন সবচেয়ে বাজে সময় পার করছে। এই সময়ে দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে শেষদিকে এসে দেশের ক্রিকেট চত্বরে আনন্দ ও উৎসাহের খবর হলো বাংলাদেশ জাতীয় নারী ক্রিকেট দল এবারই প্রথম (এর আগে দু'বার ২০১৩ ও ১৭ সালে বাছাই পর্বে খেলে সফল হতে পারেনি) নারী ওয়ানডে বিশ্বকাপে চূড়ান্ত রাউন্ডে খেলার সুযোগ নিশ্চিত করেছে। দিয়েছে দেশবাসীকে স্বস্তি উপহার। এই সাফল্য দেশের জন্য বিশাল অর্জন। বাংলাদেশ আগামী বছর নিউজিল্যান্ডে (৩ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল ২০২২) অনুষ্ঠিতব্য নারী ওয়ানডে বিশ্বকাপে আট দলের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। এটি দেশের জন্য অনেক বড় গৌরব এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে দেশকে তুলে ধরার অনেক বড় সুযোগ। আগামী বছর ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলবে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

দেশের ক্রিকেট চত্বরে নারী-পুরুষে বৈষম্য প্রথম থেকেই ন্যায়বিচার, সমতা ও মানসিকতা মর্যাদার প্রশ্নে নারী খেলোয়াড়রা ভীষণভাবে পিছিয়ে। তারা অবহেলিত এবং পদে পদে উপেক্ষিত। এর পরও কিন্তু নারী ক্রিকেটাররা ভীষণ সীমাবদ্ধতার মধ্যে ক্রিকেট চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছেন। সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, সচেতনতার অভাব, পুরুষ শাসিত ক্রিকেট বোর্ডে নারীদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন এবং গুরুত্ব না দেওয়ায় নারী খেলোয়াড়দের সামর্থ্য ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। অথচ ব্যক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ এখন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বহু গুণ। ক্রীড়াঙ্গন এবং ক্রিকেটে গত ৫০ বছর ধরে জেন্ডার বৈষম্যের ক্ষেত্রে সমতার ছবির কোনো পরিবর্তন হয়নি। ক্রিকেট নারী-পুরুষ সমতার জন্য প্রয়োজন পুরুষ পরিচালকদের সহায়তা ও সমর্থন, যেটি নারী ক্রিকেটাররা পাচ্ছেন না। নারীদের যোগ্যতা এবং সম্ভাবনারও স্বীকৃতি নেই।

স্বাধীনতার পর ক্রিকেট শুরু করে অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও এ খেলার চর্চায় নারী খেলোয়াড়দের অগ্রগতি, সাফল্য অসাধারণ। রীতিমতো গর্ব করার মতো। পুরুষ ক্রিকেটাররা বোর্ড থেকে ট্রেনিং ফ্যাসিলিটি থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত এবং খেলার ক্ষেত্রে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন, তার ১৫ শতাংশও পান না নারী ক্রিকেটাররা। বিভিন্ন ধরনের আচরণবিধিতেও আছে বৈষম্য। নারী ক্রিকেটাররা ভালো খেললেও স্বীকৃতির বিষয়ে তাদের ক্ষেত্রে কার্পণ্য। ক্রিকেটে নারী খেলোয়াড়দের মর্যাদা পুরুষ খেলোয়াড়দের চেয়ে কম- এটাই বাস্তবতা। এশিয়া কাপ ক্রিকেটে নারী ক্রিকেট দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ভারত ও পাকিস্তানকে পরাজিত করে। পুরুষ দল এখন পর্যন্ত এশিয়া কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়নি। নারী ক্রিকেট দল এশিয়ান গেমস ক্রিকেটে দেশের হয়ে পদক জিতেছে। স্বর্ণপদক জিতেছে সাউথ এশিয়ান গেমসে। নারী দল ওয়ানডে স্ট্যাটাস পেয়েছে ২০১১ সালে। ২০১৪ সাল থেকে খেলছে নিয়মিতভাবে নারী টি২০ বিশ্বকাপে।

এবার (২০২২ সালে) নিউজিল্যান্ডে সরাসরি খেলার সুযোগ। এটি দেশের নারী ক্রিকেট ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই সুযোগ পাওয়াটা দেশের নারী ক্রিকেটকে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করবে। নারী দলের খেলোয়াড়দের জন্য এটি অনেক বড় সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ। ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাছাই পর্বে নারী দল পুরুষদের তুলনায় আগেই বিশ্বকাপ মঞ্চে স্থান করে নিয়েছে।

এখন দরকার যথাযথ প্রস্তুতি। বিশ্বের সেরা নারী দলগুলোর বিপক্ষে লড়বে বাংলাদেশ জাতীয় নারী দল- এটা মনে রেখেই প্রস্তুতি নিতে হবে সময় নষ্ট না করে। স্থানীয় কোচ এবং অন্যান্য লোকাল কোচিং স্টাফ কাজ করেছেন আস্থার সঙ্গে। এরাই কাজ করবেন নারী দলের সঙ্গে। স্থানীয় কোচ এবং লোকাল কোচিং স্টাফদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রথমবারের অংশগ্রহণে ভালো কিছু করা। সবকিছুই নির্ভর করে মাঠে খেলোয়াড়দের সাহস, মানসিক শক্তি এবং যথাসময়ে সামর্থ্যের প্রয়োগ ও পরিকল্পনা অনুযায়ী।

ইকরামউজ্জমান: কলামিস্ট ও বিশ্নেষক

মন্তব্য করুন