বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাস চারেক পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে গিয়েছিলুম। এক দোকানের সামনে জনাদশেক, জটলা। উত্তেজনা। কাজিয়াটাজিয়া হবে। দু'জন বয়স্ক। চেহারাসুরতে, পোশাকে সল্ফ্ভ্রান্ত। বাকিরা কৃষক বা দিনমজুর। পরনে লুঙ্গি; ময়লা কাপড়। একজন, ছোটখাটো, গা-গতরে পাতলা, বয়স ত্রিশের অধিক নয়। সাহসী। এক মুরুব্বির সামনে হাত নাড়িয়ে, আঙুল তুলে বলছেন :'ব্যুইল্যে ব্যুইলবেন ব্যুলছে।'

স্থানীয় পরিচিতকে জিজ্ঞেস করি, অর্থ কী?

জানান, 'গরিব, অশিক্ষিত, ব্রাত্য, ময়মুরুব্বির সামনে বড়-বড় কথা বলছি। ধৃষ্টতা।' 'এই বয়ানে মার্জনাও আছে'; পরিচিত বলেন। অর্থাৎ, ঠোঁটকাটাও মার্জনাপ্রার্থী।

দুর্নাম আছে ঠোঁটকাটা, বেমক্কা কথা বলা এবং প্রশ্ন করার। গোসা করে বয়স্ক, সমাজের মাথা মোটা, অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছড়ার ভাষায় 'পাছার কাছা খোলারা।'

প্রশ্ন না করলে বিবেক দংশিত। দংশনে রক্তপাত। এবং এই রক্তধারা আরও বহুর মধ্যে মিশ্রিত। সংক্রমিত সমাজে, দেশব্যাপী। দংশিত বিবেকে প্রশ্ন করার ন্যায্যতাও হারিয়ে ফেলেছি। বিগত দশকগুলোয়। ঘাড়ে দুটি মাথা নেই। সর্বদা মাথা নিচু। এতটাই, নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার 'চির উন্নত মম শির' বলতেও ভয়। চারদিকে সিসি ক্যামেরা। পুলিশ। গোয়েন্দা। মোবাইলে ফটোধারক। পাছার কাছা খুলে যায়।

রবীন্দ্রনাথ গানে বলছেন, 'ভয় হতে তব অভয় মাঝে # নূতন জনম দাও হে/ দীনতা হতে অক্ষয় ধনে, # সংশয় হতে সত্যসদনে,/ জড়তা হতে নবীন জীবনে # নূতন জনম দাও হে'

অভয়? নতুন জনম? অক্ষয় ধনে? সত্যসদনে? নবীন জীবন? নতুন জনম?

সম্ভব কি আজকের ধনতান্ত্রিক, করপোরেট বিশ্বে? গণতন্ত্রের নামাবলি গায়ে? আমায় বাঁধিনু ঘর। কার্ল মার্কস মারা যাননি। আছেন। থাকবেন।

লেনিন বলছিলেন একবার স্ট্যালিনকে, 'কঠোর হবে কিন্তু সততায় ষোলআনা খাঁটি। বাকচাতুর্যে মিথ্যাই ধ্বংস।'

আমাদের নেতানেত্রী কি কার্ল মার্কস, লেনিন পড়েন, পড়েছেন? পড়লে জ্ঞানগম্যি কিছু হতো। 'কিছু' বলছি এই কারণেই 'অন্তত কিছু।'

বুইল্যে পরে ব্যুইলবেন ব্যুলছে। যেহেতু ঠোঁটকাটার দুর্নাম, চাঁছাছোলা বলাই ভালো। গোসা করবেন। করুন। জানুক মানুষ।

শুনেছি, মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ক্ষমতাবান হওয়ার আগে বেইলি রোডের 'সাগর পাবলিশার্স'-এর বইয়ের দোকানে প্রায়শ যেতেন। বই কিনতে। ক্রেতা যখন, পাঠক। তখন স্বল্পভাষী। স্বল্পকথক। এখন প্রগলভ। মন্ত্রী। ক্ষমতাধারী। বুদ্বুদ সারাক্ষণ। প্রয়োজনে। অপ্রয়োজনে।

সংবাদপত্রে প্রকাশ, ওবায়দুল এক সভায় সবক দিয়েছেন, 'রাজনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের সীমা মেনে কথা বলা উচিত।'

অন্নদাশঙ্কর রায়ের বিখ্যাত ছড়া 'খুকু ও খোকা'য় প্রশ্ন- 'তার বেলা?'

মৌনব্রত কখন প্রয়োজন, কেন প্রয়োজন গান্ধীজি বলেন জওহরলাল নেহরুকে। সাক্ষী মওলানা আবুল কালাম আজাদ। বোধ করি সেই কারণেই আজাদের নির্দেশ ছিল- তার একটি গ্রন্থের প্রকাশ মৃত্যুর তিরিশ বছর পরে। ভারতের স্বাধীনতার তিরিশ বছর পরে প্রকাশিত।

ওবায়দুল কাদের পছন্দসই। বলি, কথকতার আতশবাজি মুহূর্তে মিলিয়ে যায়। না-ফোটা আতশ আরও বেশি প্রণোদক।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান (কামাল) মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধে অকুতোভয়, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে মহীয়ান। সত্যবাদী। সংবাদপত্রে প্রকাশ, বলছেন :'বাংলাদেশ বিশ্বে জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদ দমনে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। এর মূল কারণ রাষ্ট্রের মূলনীতি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিচালনায় বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদের শতভাগ মূলোৎপাটন করতে না পারলেও নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে।' (১২/১১/২০২১, উপসম্পাদকীয়, সমকাল)। বিশ্বের জঙ্গিবাদ, চরিত্র কী কতটা জানেন?

মন্ত্রী বলছেন, 'শতভাগ মূলোৎপাটন করতে না পারলেও নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি।' শতভাগের কতটা? হিসেবে কয় অংশ? ইসলামিক স্টেটের (আইএসএ) নিধনে তিনি গর্বিত। তলিয়ে দেখেছেন, ইসলামিক স্টেটের অনুসারীরা কতটা উদ্দীপ্ত? জার্মানির প্রভাবশালী সাপ্তাহিক 'ডিৎসাইট'-এর এক প্রতিবেদনে, নানা দেশে, বাংলাদেশেও ইসলামিক স্টেটের গভীরতা।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ধরি মাছ না ছুঁই পানির। 'ঘৃণ্য আইন ইনডেমনিটি' আলোচনা সভায় জাতীয় প্রেস ক্লাব। (শুক্রবার ১২/১১/২০২১। প্রথম আলো।) বলেছেন ''সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রাষ্ট্রধর্ম করার পদক্ষেপকে বাঙালি জাতির মূল উদ্দেশ্যের পথের 'কাঁটা'। ... বঙ্গবন্ধু আমাদের অস্তিত্বে ... প্রগতিশীলতার পক্ষে আর সকল সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে আমাদের অবস্থান।'' তাই কি?

মন্ত্রী আরও বলেন : 'দায়মুক্তির পরম্পরা হিসেবে পরবর্তী পর্যায়ে দ্বিতীয় সামরিক শাসক (হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ) আরেকটি পেরেক মেরে রেখেছে। কীসের ওপরে? আমাদের জাতিসত্তার ওপরে। আমাদের রাষ্ট্রধর্মকে, ইসলামকে পুনরায় প্রবর্তন করে। সংবিধানের মূলবাণী অসাম্প্রদায়িকতা সেটাকে ঘা দিয়ে চলে গেল এবং সেটা আমাদের পদে পদে বিভ্রান্ত করছে। জাতির মূল উদ্দেশ্যের পথে কাঁটা গেড়ে রেখে গেছে।' (১২/১১/২০২১, প্রথম আলো)।

তিন দফায় ক্ষমতায় থেকে কী করেছেন? ব্যুইল্যে পরে ব্যুইলবেন ব্যুলছে।

দাউদ হায়দার :কবি

মন্তব্য করুন