বাংলাদেশের রাজনৈতিক অনিয়মের এক চূড়ান্ত আর বেহিসেবি ঘটনা ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনকে জাতীয়ভাবে পার্টি পলিটিক্সের অংশ করা। এর মাধ্যমে দেশের বা জাতির কতটা উপকার হচ্ছে, তা বোঝা না গেলেও সমাজের, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের সামাজিক সমতা যে প্রায় পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে, তা বুঝতে কারোরই অসুবিধা হওয়ার কথা না। এ দেশের স্থানীয় সরকারের ইতিহাস দেখলে স্পষ্ট হয়, অতীতে সেই ব্রিটিশ আমল থেকে ২০১৬-এর আগ পর্যন্ত যখন ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা নির্বাচনে পার্টির মার্কার প্রচলন হয়নি। তখন যারা নির্বাচনে অংশ নিতেন, তাদের মধ্যে নির্বাচনে জিতে আসার এক ধরনের মানসিক জোর, দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি বা সাহস কাজ করত। তখনকার নির্বাচনের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীরা নিজেদের শিক্ষা, সামাজিক মর্যাদা, ব্যক্তিত্ব ও জনকল্যাণমূলক কাজের ভিত্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন। এমন সব প্রার্থীর মধ্যে রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সব শ্রেণির প্রতিনিধিই থাকতেন; আর তাই প্রতিযোগিতা হতো সুষম ও বহুমুখী। যদিও বলা যাবে না যে সব প্রার্থীই ছিলেন আদর্শবান, তবুও একটা নূ্যনতম যোগ্যতা নিয়ে প্রার্থী হয়ে জনগণের ভোটপ্রার্থনা করতে হতো। এমন চর্চায় তুলনামূলক ভালো প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল ঢের বেশি। টাকা বা পেশিশক্তির ব্যবহার তখন যে একেবারেই ছিল না তা নয়, তবে এখনকার চেয়ে অনেক কম ছিল।

কিন্তু ২০১৫ সালে স্থানীয় সরকার আইন সংস্কারের মাধ্যমে ২০১৬ সাল থেকে যখন ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনে পার্টির মনোনয়ন আর মার্কার প্রচলন শুরু হলো, তখন থেকে বহুমাত্রিক অসংগতি আর অনিয়ম দেখা দিতে লাগল। প্রথমত. এই নির্বাচনে দু-একটি বড় দল, যারা সরকারে বা সরকারের শরিক হিসেবে আছে, তারা ছাড়া প্রার্থিতা দিতে অন্যরা উৎসাহী না বা সাহস করছে না। যদিও বা বিরোধী কোনো দল থেকে কেউ প্রার্থী হন, তিনি কোনোভাবেই তার দলীয় পরিচয় বা মার্কা ব্যবহার করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে তারা দুর্নীতির আশঙ্কায় ভোগেন খানিকটা। দ্বিতীয়ত. যেখানে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা নির্বাচনে অংশ নিতে অনীহা প্রকাশ করেন, সেখানে স্থানীয় পর্যায়ের ভদ্রলোক শ্রেণির সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা স্বতন্ত্র হিসেবেও লড়তে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন। এভাবেই ইউনিয়নগুলো তুলনামূলক ভালো প্রার্থীর সংকটে ভোগে। তৃতীয়ত. রাজনৈতিক দু-একটি দল, যারা সরকারে আছে বা সরকারি সমর্থন পায় প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্যভাবে, তাদের মধ্যে অতিমাত্রায় প্রার্থিতার প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। তারা মনে করতে শুরু করেছে, যে একবার যদি দলীয় মনোনয়ন জোটানো যায়, অর্থাৎ মার্কা আনা সম্ভব হয়, তাহলে নির্বাচনের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কাজ শেষ। এ কারণেই কিছু কিছু প্রার্থীর দলীয় মনোনয়নের উদযাপন কোনো অংশেই নির্বাচনে জয়লাভের উদযাপনের চেয়ে কম হয় না। রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের দৌড়ঝাঁপ দেখলে মনে হয়, ওইখান থেকেই বোধ হয় নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হবে! 'মনোনয়ন' যেন 'নির্বাচনে'র সমার্থক হয়ে যাচ্ছে! এমনটা ২০১৬-এর আগে দেখা যায়নি অর্থাৎ যত দিন পর্যন্ত দলীয় মার্কার প্রচলন শুরু হয়নি। চতুর্থত. ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে প্রার্থী হওয়ার প্রতিযোগিতা দলের মধ্যে বিভাজন বা গ্রুপ পলিটিক্সকে বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণে। বর্ষীয়ান রাজনীতিকরা অর্থ আর লবিংয়ের রাজনীতির কাছে ধরাশায়ী হচ্ছেন প্রায়ই। তাই তো নির্বাচনে বাড়ছে দলীয় বিদ্রোহীর সংখ্যা। অভিজ্ঞ আর পোড়খাওয়া রাজনীতিকদের অবমূল্যায়ন কোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই শুভ নয়।

পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান বেসিক ডেমোক্রেসি চালু করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করবেন। তাই সে আমলে পরোক্ষ গণতন্ত্রের চর্চার জন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে যাবতীয়ভাবে প্রভাবিত করা হতো। যদিও আইয়ুব খানের এমন চিন্তা প্রত্যক্ষ ভোটের গণতন্ত্রের জন্য এক প্রচ্ছন্ন হুমকি ছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর স্বাধীন বাংলাদেশে কী এমন হলো, স্থানীয় নির্বাচনকে পার্টি পলিটিক্সে রূপদান করতে হলো সরাসরি? এর ফলে নির্বাচনের ফলে জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে সামাজিক নির্দলীয় রাজনীতির যে চমৎকার সহাবস্থান ছিল, যা সমাজকে সমতার মধ্যে রাখত, তা আজ নির্বাসিত। সব ক্ষেত্রেই জাতীয় রাজনীতি যদি প্রভাব বিস্তার করে, স্থানীয় সব অবস্থানকে দখল করে ফেলে, তাহলে তা শুধু দেশের জন্য নয়, বরং পার্টির নিজের অস্তিত্বের জন্যও ক্ষতিকারক। রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত সমাজ দেখবে বিভাজিত নেতৃত্ব। প্রার্থীরা তাদের আর আদর্শ ও ব্যক্তিত্ববান রাজনীতিক হিসেবে গড়ে তোলার বদলে শুধু পার্টির প্রার্থী হওয়ার জন্য যাবতীয় চেষ্টা চালাবেন। এভাবে স্থানীয় সরকারের জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। জবাবদিহিহীনতার চর্চা তৈরি হয়ে, প্রকৃত আর মানবিক উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হবে গ্রাম-মফস্বলের সাধারণ মানুষ।

স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া বন্ধ হলে প্রার্থীরা নিজেরাই নিজেদের ভোটের উপযুক্ত করার চেষ্টা করবেন। ক্ষমতাসীন দলগুলোর মধ্যে অনেক বেশি তৈরি হবে তখন দক্ষ ও জনবান্ধব নেতৃত্ব। একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হবে সবার জন্য। বাংলাদেশ পাবে জনগণমুখী জনপ্রতিনিধিও। নির্বাচনে দলীয় রাজনীতির প্রভাব হ্রাস পাবে। গণতন্ত্র আর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে স্থানীয় পর্যায়ে।

মো. রবিউল ইসলাম :সহযোগী অধ্যাপক, আইন ও বিচার বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন