দেশের মানুষের যে কোনো বিষয়ের প্রতি আস্থাহীনতা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু কেন এই আস্থাহীনতা? আস্থাহীনতা বাড়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। আমরা কেউ কি একবারও ভেবে দেখেছি আস্থাহীনতার কারণ? অনেক মানুষের কাছে যেন কোনো রকমে দিন গেলেই হলো! মানুষের ভাবনা বা চিন্তার জগৎকে মাথা থেকে তাড়াতে পারলে রাষ্ট্রের অনেকেরই অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে শোষণ ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করে নিজেদের স্বর্গবাসে রূপান্তর করে রাখা সহজ হয়। এ জন্য গুটিকয়েক সুবিধাভোগী পদলেহনকারী মানুষকে সুবিধা দিলেই তা সম্ভব। বাকি বেশিরভাগ মানুষ শোষণযন্ত্রণা ভোগ করবে। মূল হচ্ছে চিন্তাশক্তি ধ্বংস। এ জন্য শিক্ষাব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণ ও ধর্মীয়করণ চলে নগ্নভাবে। কেউ কেউ লুণ্ঠন ব্যবস্থা ত্বরান্ব্বিত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখায় ব্যস্ত। দায়িত্বশীল কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় শিল্পকারখানা নিয়ে নিজেদের লাভালাভের ছক কষতে ব্যস্ত! তাদের অনেকেরই লক্ষ্য, শোষণব্যবস্থা অব্যাহত রেখে টাকা বিদেশে পাঠানো; বড় বড় নেতার কিছু ছাপোষা তাঁবেদার তৈরি করা ইত্যাদি। 

মানুষের যদি চিন্তাশক্তি ধ্বংস হয়, তখন সে আর মানুষ থাকে না। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য হলো- মানুষ চিন্তা করে সমাজকে পাল্টাতে পারে, আর অন্যান্য প্রাণী চিন্তা করতে পারে না। ফলে অন্য প্রাণী পশু, আর আমরা মানুষ। মানুষের চিন্তাশক্তি আরও দৃঢ় করে শক্তিশালী যুক্তিবাদী, সৃজনশীল করতে চাই সর্বাগ্রে উপযুক্ত নেতৃত্ব ও চর্চা। যুক্তিবাদী মনন বিজ্ঞানের উৎকর্ষ অর্জন ছাড়া সম্ভব নয়। তেমনি ক্ষুরধার যুক্তির বিকাশ লাভও কঠিন। তা সম্ভব করতে না পারলে এক দল দলদাস হয়ে অন্যান্য প্রাণীর মতো পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হবে। মানুষের মতো হয়তো দুই হাত, দুই পা, দুই চোখ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থাকবে কিন্তু মনুষ্যত্ব থাকবে না। আর এমনটি থাকবে না বলেই সমাজে দেখা দিতে পারে অন্ধকার। পৃথিবী, রাষ্ট্র নিয়ে যারা চিন্তা করেন, তাদের এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে কর্তৃত্ববাদী শাসন, দাসত্ববাদী শাসন, স্বৈরাচারী শাসন দ্বারা মানুষ নামক প্রাণীকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখবে কর্তৃত্ববাদীরা। তাই সামনে এগিয়ে যেতে হবে; পেছনে ফেরার কোনো পথ নেই। মূল্যবোধ ও নৈতিকতার শক্তিবলে এগিয়ে যেতে হবে।

সমাজ কী? সভ্যতা কী? বিজ্ঞান কী? মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের ইতিহাস শিশুমনে দাগ কাটাতে হবে। শিশুর মনে ধর্মীয় গোঁড়ামি বা শিক্ষার নামে শিশুদের এমন শিক্ষা দেওয়া উচিত হবে না, যাতে তাদের বিকশিত মানুষ হওয়ার পথে অন্তরায় সৃষ্টি হয়। মূল্যবোধের অবক্ষয় কিংবা নৈতিক শিক্ষার অভাবের কারণেই মানুষ লোভ, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, হত্যা, যৌনতাসহ অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হয়। আমরা সব অশুভ শক্তির মূলোৎপাটন করে রাষ্ট্রকে সেভাবে সাজাতে চাই। অবৈধ ক্ষমতার দাপট মানুষকে পশুতে পরিণত করে। এক টাকার জন্য একজন মানুষকে হত্যা করতে দ্বিধা করে না- এমন নজির আমাদের সামনে আছে। পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা মানুষকে পশুতে পরিণত করতে বাধ্য করে। তবে এই কাজটা ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রে ভিন্ন ভিন্নভাবে হয়। বাংলাদেশে এর মাত্রা যেন ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে। এখানে ক্ষমতার মোহে অন্ধের সংখ্যা বাড়ছে। এর নিরসন ঘটাতে হবে শুভবোধসম্পন্নদের যূথবন্ধ প্রয়াসে। মূল্যবোধ ও নৈতিকতার ভিত শক্ত করা খুব জরুরি।

মতিয়ার রহমান: উন্নয়নকর্মী

মন্তব্য করুন