১১ এপ্রিল রোববার প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মিতা হক চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তার গাওয়া গান কয়েক প্রজন্মের বেড়ে ওঠার সঙ্গী। আপন সৃষ্টিকর্ম তাকে স্মরণীয় করে রাখবে। 'মিতা হক' নামটি সংগীতভুবনে সোনার অক্ষরে চিরদিনের জন্য লেখা থাকবে। বরেণ্য এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রতি তারকাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি ...

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা

সকালে যখন খবরটা শুনলাম, মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমার আর মিতার যোগসূত্রটা একই স্থানে। আমরা হেঁটেছিও একই পথে। মিতা আর আমার পড়াশোনা শান্তিনিকেতনে। আমরা পড়েছি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পড়ালেখার পাট শেষে দেশে ফিরে এলাম। মিতা আর আমি ব্যস্ত হয়ে গেলাম রবীন্দ্রসংগীতে। মিতা ছায়ানট ও রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ নিয়ে কাজ করছিলেন। আর আমি গান ও পরবর্তী সময়ে সংগঠন সুরের ধারা নিয়ে ব্যস্ত হওয়ায় আমাদের মধ্যে যোগাযোগ কম হতো। বহু অনুষ্ঠানে আমরা এক মঞ্চে দাঁড়িয়েছি শিল্পী হিসেবে। মনে আছে, ২০১৭ সালে চ্যানেল আই রবীন্দ্র উৎসবে তাকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়। সেখানে আমিও ছিলাম। আজীবন সম্মান জানানোর মতোই ছিলেন তিনি। তার এই অসময়ে চলে যাওয়াটা সত্যিই কষ্টের। তার আত্মার শান্তি কামনা করি।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

আহা! অমন পরিশীলিত সুরেলা কণ্ঠের দেখা মেলা ভার। আর মিলবে কিনা জানি না। জীবন ও শিল্পের এমন শুদ্ধতম মিলন কালেভদ্রে ঘটে। আনন্দের মাঝেই জীবন উথলিয়া ওঠে- এ কথা মিতাকে দেখলেই মনে হতো। দুঃখকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে জীবনের আনন্দে শিশুর মতো করতালি দিত। এই তো মাত্র সাত দিন আগে হাসপাতাল থেকে ফোনে চিৎকার করে বলে- বাচ্চু ভাই, আমার তো এইখানে ভালল্গাগে না, ভালল্গাগে না, ভালল্গাগে না। আমারে বাসায় নিয়ে যায় না কেন!। তার দু-তিনদিন পর কন্যা জয়িতা ও সন্তানসম শাহীন ওদের করোনামুক্ত মাকে কেরানীগঞ্জের বাসায় নিয়ে যায়। কিন্তু পরশু হঠৎই শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আবারও হাসপাতালে। আর আজ [রোববার] প্রত্যুষে আমার কন্যা এশা ও পুত্রবৎ সাকি হাসপাতাল থেকে ফিরে জানাল, 'মিতা মা' মারা গেছেন। আমি নির্বাক। নিস্তব্ধতায় নিমজ্জিত হই। ভাবি, মিতার মতো জীবনকে ভালেবাসতে আমি কাউকে দেখিনি। এমনভাবে কাউকে জীবন উদযাপন করতে দেখিনি। শত কষ্ট ও দুঃখের মাঝে কলকলিয়ে এভাবে হাসতেও দেখিনি কাউকে... চোখের জলে চৈত্রের ভোরের আকাশটাকে ধূসর দেখতে থাকি। ভাবি, ওই ধূসরে মিলিয়ে গেলে মানুষ আর কখনও ফিরে আসে না...বিদায় প্রিয় মিতা হক।

তপন মাহমুদ

তার মৃত্যুতে আমি গভীর বেদনায় হতবিহ্বল, স্তম্ভিত। রবীন্দ্রসংগীতের পরিশীলিত ধারার এই শিল্পীর হঠাৎ চলে যাওয়ায় যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা সহসা পূরণ হওয়ার নয়। তার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি রয়েছে, যা আজ খুব মনে পড়ছে। তিনি যেখানেই থাকবেন ভালো থাকবেন। আমি তার বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।

অদিতি মহসিন

মিতা আপার মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ। আমাদের সংগীতের অনেক বড় ক্ষতি হলো। তিনি সারাজীবন শুদ্ধ সংগীতের চর্চা করেছেন। শুধু শুদ্ধ সংগীত চর্চা নয়, সংস্কৃতিরও চর্চা করেছেন তিনি। আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, বাঙালি জাতীয়তাবোধের চেতনার জায়গায় মিতা হক কাজ করেছেন। সেই ধারার মানুষ ছিলেন তিনি। আমি শুধু তাকে একজন শিল্পী আখ্যায়িত করতে রাজি নই। তার কাজের পরিসর বড় ছিল। তিনি একজন গুণী শিল্পীর পাশাপাশি ছিলেন হৃদয়ের মানুষ। একসঙ্গে এই দুটো গুণ খুব কম মানুষের মধ্যে থাকে। স্বভাবসুলভ মানুষকে কাছে টানার খুব প্রবণতা ছিল তার মধ্যে। ভালোকে ভালো, অসুন্দরকে অসুন্দর বলা মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

অণিমা রায়

১৯৯৬ সালে আমার সংগীত জীবনের শুরু মিতা হকের হাত ধরে। রবীন্দ্রসংগীত যেদিন থেকে শিখতে শুরু করেছিলাম, তারপর থেকে তার সঙ্গে দীর্ঘদিনের পথচলা। তিনি যে একজন শুধু শিক্ষক ও শিল্পী ছিলেন, তা নয়। ভালোবেসে সবাইকে আপন করে নিয়েছেন তিনি। যে মানুষই তার সান্নিধ্য একবার পেয়েছে, আপাকে কখনও সে ভুলতে পারবে না। একজন মমতাময়ী মা যেমন, তিনি তেমনই। সংগীত শিক্ষক হিসেবে ছিলেন অতুলনীয়। তার মতো করে শুদ্ধ ধারায় যথার্থভাবে গান শোখানোর মানুষ খুব কমই পেয়েছি আমরা। সামগ্রিক রবীন্দ্রনাথকে বোঝাতে শতভাগ সফল ছিলেন মিতা হক। শ্রদ্ধেয় ওয়াহিদুল হক, সন্‌জীদা খাতুনের শিষ্য ছিলেন তিনি। এমন একজন গুণীকে আমরা শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন পেয়েছি- এটা পরম সৌভাগ্য। তার মৃত্যুতে বাঙালি জাতির জন্য অনেক ক্ষতি হলো। সবশেষে আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।

মন্তব্য করুন