খালেদা জিয়ার বক্তব্য দায়িত্বজ্ঞানহীন

বিশিষ্টজনের প্রতিক্রিয়া

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০১৪      

বিশেষ প্রতিনিধি

সোমবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সাতক্ষীরায় যৌথ বাহিনীর অভিযান নিয়ে যে বক্তব্য রেখেছেন, তাতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলেছেন, খালেদা জিয়ার বক্তব্য দায়িত্বজ্ঞানহীন। যিনি একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন, তার মুখে দেশের স্বার্থবিরোধী বক্তব্য বিস্ময়ের উদ্রেক করেছে। তাদের মতে, খালেদা জিয়ার বক্তব্যে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি ও প্রতিবেশী দেশের প্রতি বৈরিতা-উস্কানিই স্পষ্ট হয়েছে। বক্তব্যের সপক্ষে কোনো প্রমাণই তিনি দিতে পারেননি। তিনি প্রকারান্তরে
ভারতীয় সেনাবাহিনীর কথা বলেছেন। তাদের প্রশ্ন, লোকচক্ষুর অন্তরালে কীভাবে ভারতীয় সৈন্য সাতক্ষীরায় এলো। খালেদা জিয়া জঙ্গিবাদের উত্থান ও আশ্রয়-প্রশ্রয় সম্পর্কেও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকেই একাধিক অনলাইন পোর্টাল খুলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত-শিবির এবং তাদের মিত্ররা। এ ধরনের একটি অপপ্রচারকেই প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরে ইনকিলাব। সংবাদটি তথ্য-প্রমাণভিত্তিক ছিল না। অসত্য সংবাদ প্রকাশের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে ইনকিলাব কর্তৃপক্ষ। তথ্যটির বিশ্বাসযোগ্য কোনো উৎসের কথাও বলতে পারেননি খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে তিনি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের জন্য সরকারকে দায়ী করেছেন। অথচ দেশের প্রথম সারির সব সংবাদমাধ্যমেই হামলাকারীদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় তুলে ধরে একাধিক প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। ১৮ দলীয় জোটভুক্ত জামায়াত-শিবিরই এসব হামলার জন্য মূলত দায়ী হিসেবে ওই সব প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণও দেওয়া হয়েছে। অথচ বিএনপি চেয়ারপারসন নির্যাতনের জন্য সরকারকে দায়ী করে আবারও জামায়াত-শিবিরকে রক্ষা করার দায়িত্বই যেন পালন করলেন!
ভুল তথ্যের অতীত :এবারই প্রথম নয়, এর আগেও প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতা থাকার সময়ে খালেদা জিয়ার বক্তব্যে এ ধরনের ভুল তথ্য এসেছে। যার মধ্য দিয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধের অপরাধীকেই পরোক্ষভাবে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর সম্মেলনে বোমা হামলার পর খালেদা জিয়া স্বাক্ষরিত বিএনপির বিবৃতিতে এ ঘটনার জন্য সরকারি দলকে দায়ী করা হয় এবং ২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশস্থল থেকে বিশাল আকারের বোমা উদ্ধারের পরও ২৩ জুলাই তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া এ ঘটনাকে সরকারের সাজানো নাটক আখ্যায়িত করে বিবৃতি দেন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে এ বোমা উদ্ধারের ঘটনার কথা উল্লেখ করে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনী জনসভায় খালেদা জিয়া অনেকটা হাস্যরসও করেছেন। কিন্তু পরে প্রমাণ হয়, এসব ঘটনার নেপথ্যে ছিল জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ। সংগঠনটির প্রধান মুফতি হান্নান নিজেই স্বীকারোক্তি দিয়ে ঘটনাগুলোর দায় স্বীকার করে নেন।
২০০১ সালের নির্বাচনের পর প্রথম সপ্তাহেই বরিশাল ও ফরিদপুর অঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহ নির্যাতন হয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর। সে সময়ে দেশের প্রথম শ্রেণীর সব সংবাদপত্রে এসব নির্যাতনের ওপর সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হয় এবং বিএনপি-জামায়াতের কোন কোন নেতা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা-ও উল্লেখ করা হয়। ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর সংসদের অধিবেশন বসার প্রথম দিনেই তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা সরাসরি আওয়ামী লীগের অপপ্রচার উল্লেখ করে বলেন, বিএনপি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না, বিএনপির কেউ কোথাও নির্যাতন চালায়নি।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকার সময়ে দেশে একের পর এক বোমা ও গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় সবচেয়ে আলোচিত জঙ্গি সংগঠন ছিল জেএমবি এবং এর নেতা বাংলাভাই ও শায়খ আবদুর রহমান। ২০০৫ সালের ১৩ মার্চ চারদলীয় জোটের শরিক জামায়াতের আমির ও তৎকালীন মন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী সংসদে বলেছিলেন, চারদলীয় ঐক্য জোটে ফাটল ধরানোর জন্য আওয়ামী লীগ কল্পিত জঙ্গিবাদের অপপ্রচার চালাচ্ছে। কারণ তারা জানে, চারদলীয় জোট না ভাঙতে পারলে আগামীতেও তারা ক্ষমতায় যেতে পারবে না। এর দু'দিন পর ১৫ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া একই সুরে বলেন, জেএমবি জঙ্গি বলে কিছু নেই, চারদলীয় জোটের ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য এসব আওয়ামী লীগের অপপ্রচার। ২০০৫ সালের ২২ জুন নিজামী এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, পুলিশ কাকে গ্রেফতার করবে, বাংলাভাই নামে কারও অস্তিত্ব থাকলে তো তাকে গ্রেফতার করা হবে? অস্তিত্বহীন কাউকে গ্রেফতার করবে কীভাবে? এর এক বছর আগে ২০০৪ সালের ২২ জুলাই তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী নিজামী সংসদে বলেছিলেন, বাংলাভাই নামে কিছু নেই, সবই মিডিয়ার সৃষ্টি। অথচ পরে বাংলাভাই ও শায়খ আবদুর রহমান আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে সশরীরে ধরা পড়ে এবং বিচার শেষে তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায়ও কার্যকর হয়। চারদলীয় জোট সরকারের আমলেই ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছিল জেএমবি।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পর (এ ঘটনায় মহিলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আইভি রহমান নিহত হন) এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না করে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার জজ মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে ঘটনার জন্য দায়ী করে আওয়ামী লীগই এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে প্রচার করে। অথচ পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ তদন্তে এ ঘটনার সঙ্গেও হরকাতুল জিহাদ এবং তৎকালীন কিছু প্রভাবশালী কর্তাব্যক্তির যোগসাজশের ঘটনা প্রকাশ পায়।
দেখা যায়, কমিউনিস্ট পার্টির জনসভা, রমনার বটমূলে, গাজীপুরের আদালতে, ময়মনসিংহের সিনেমা হলে, বানিয়ারচরে গির্জায়, সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর বোমা হামলা, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ওপর গ্রেনেড হামলা ও হত্যা, দিরাইতে আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জনসভায় বোমা হামলা_ প্রতিটি ঘটনায় পরবর্তী সময়ে জঙ্গি সংগঠনগুলো জড়িত থাকার প্রমাণ এলেও প্রতিটি ঘটনার পর বিএনপির পক্ষ থেকে তা আড়ালের চেষ্টা হয়েছে।
বিশিষ্টজনরা যা বলেন : টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতারা এভাবে তথ্য-প্রমাণহীন বক্তব্য দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ালে একসময় দেশের মানুষের আস্থা হারাবেন তারা। মানুষ তাদের কোনো বক্তব্যই আর গ্রহণ করবে না। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ব্যাপারে খালেদা জিয়া সব সময় সোচ্চার বক্তব্য দেন, অথচ সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে তার এমন দায়িত্বহীন বক্তব্য তাকেই স্ববিরোধী অবস্থানে নিয়ে যায়। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও খালেদা জিয়াকে ক্ষমা চাওয়ার জন্য আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য একদিকে দায়িত্বহীন বক্তব্য, আবার আলটিমেটাম দেওয়া হচ্ছে। প্রতিপক্ষ ঘায়েল করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি বন্ধ না হলে এ ধরনের দায়িত্বহীন বক্তব্যও বন্ধ হবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন সমকালকে বলেন, খালেদা জিয়া দেশের দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতা হয়েও চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। তার এ বক্তব্য দেশের সার্বভৌমত্ববিরোধী। অসত্য প্রতিবেদনের জন্য ইনকিলাবের বিরুদ্ধে যেমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তেমনি অসত্য বক্তব্য দেওয়ার জন্য খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তিনি বলেন, ভুল তথ্য দিয়ে জামায়াত-শিবির জঙ্গিদের রক্ষার চেষ্টা খালেদা জিয়া বারবার করেছেন এবং করছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দায়িত্বশীল কোনো রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে এ ধরনের বক্তব্য কাম্য নয়। রাজনৈতিক নেতাদের যে কোনো বক্তব্য তথ্যনির্ভর হওয়া জরুরি। তা না হলে তারা জাতির আস্থা হারাবেন।