১০ম সংসদ হলফনামা পর্যালোচনা

২১৩ এমপি কোটিপতি

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০১৪      

মসিউর রহমান খান/ জয়দেব দাশ

দশম জাতীয় সংসদে এবার কোটিপতির সংখ্যা ২১৩ জন। ৯০ জন এমপির পাঁচ কোটি টাকার ওপরে সম্পদ আছে। ৫৪ জনের বার্ষিক আয় এক কোটির ওপরে। ১৬৩ জনই পেশায় ব্যবসায়ী। উচ্চশিক্ষিত ২৪১ জন। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা পর্যালোচনা করে বেসরকারি একটি সংস্থার প্রস্তুত করা খসড়া প্রতিবেদন থেকে এ পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সংসদে কোটিপতি ব্যবসায়ীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। একই সঙ্গে রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। নবম সংসদের চেয়ে এবার কোটিপতির সংখ্যা বেশি। তবে উচ্চশিক্ষিতদের সংখ্যাও বাড়ছে বলে জানিয়েছে ওই সূত্র।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট দশম জাতীয় সংসদ বর্জন করে। নির্বাচনে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ ১২টি দল। প্রার্থীরা নিজেদের হলফনামায় এসব তথ্য দিয়েছেন। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং তাদের ওপর নির্ভরশীলদের আয়-ব্যয়সহ আট দফা তথ্য মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল করা বাধ্যতামূলক। উচ্চ আদালতের
নির্দেশনা অনুযায়ী ভোটারদের ভোটদানের সুবিধার্থে এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ ও প্রচার করে থাকে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এবার হলফনামার তথ্য প্রকাশ নিয়ে ইসির বিরুদ্ধে গড়িমসির অভিযোগ উঠেছিল।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী দশম সংসদের এমপিরা ইতিমধ্যে শপথ নিয়েছেন। আগামী ২৯ জানুয়ারি এই সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে যাচ্ছে। নতুন সংসদে উচ্চশিক্ষিতদের সংখ্যার আধিক্য থাকলেও নয়জন এমপি স্কুলের গণ্ডি টপকাতে পারেননি। তেমনি অধিকসংখ্যক কোটিপতি থাকলেও ১০ লাখ টাকার ওপরে করদাতার সংখ্যা মাত্র ৩১ জন। এ ছাড়া হত্যাসহ ফৌজদারি মামলার আসামি রয়েছেন ৩১ জন।
২০০৮ সাল থেকে আদালতের নির্দেশে এ তথ্য প্রকাশিত হয়ে এলেও তাতে বিব্রত বোধ করছেন রাজনীতিবিদরা। প্রার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য, বিশেষ করে সম্পদের বিবরণী জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ এবার প্রকাশ্যেই আপত্তি জানিয়েছে। তবে তাদের এ আপত্তি আমলে নেয়নি ইসি। কারণ কমিশনের সদস্যরা বলছেন, হলফনামা আকারে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ব্যাপারে সর্বোচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। আগে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়েও এ চেষ্টা করা হয়েছিল। 'ভুয়া ব্যক্তির' মাধ্যমে আবেদন করে আদালতেই তা আটকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। সে চেষ্টা অবশ্য ব্যর্থ হয়। হলফনামার তথ্য গোপন রাখার জন্য তখনকার নির্বাচন কমিশনও সরকারি দলের পক্ষে নানা চেষ্টা করেছিল। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামায় আওয়ামী লীগের সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রী-সাংসদরা স্বেচ্ছায় তাদের সম্পদের তথ্য দিয়েছেন।
কোটিপতি ক্লাবের সদস্য ২১৩ জন :নতুন এমপিদের মধ্যে পাঁচ কোটি টাকার ওপরে সম্পদ আছে ৯০ জনের। এক কোটির ওপরে সম্পদের মালিক ১২৩ জন। ৫০ লাখ টাকার ওপরে সম্পদ রয়েছে ৩১ জনের। ২৫ লাখ টাকার ওপরে সম্পদ রয়েছে ২০ জনের। পাঁচ লাখ টাকার ওপরে সম্পদ রয়েছে ২৪ জনের। পাঁচ লাখ টাকার কম সম্পদের মালিক মাত্র আটজন। তাদের তিনজন আওয়ামী লীগের, চারজন জাপার এবং একজন স্বতন্ত্র। অন্যদিকে কোটিপতি এমপিদের মধ্যে আওয়ামী লীগেই রয়েছেন ১৮৩ জন। জাপার ১৭ জন, ওয়ার্কার্স পার্টির একজন, জাসদের একজন, তরীকত ফেডারেশনের দু'জন, জাতীয় পার্টির (জেপি) একজন এবং স্বতন্ত্র আটজন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ১৫৩ জনের মধ্যে কোটিপতির সংখ্যা ১১৫ জন। বাকি ১৪৭ আসনে ৩৯০ প্রার্থীর মধ্যে কোটিপতি নির্বাচিত হয়েছেন ৯৮ জন।
৫৪ জনের বার্ষিক আয় কোটি টাকার ওপরে :নতুন এমপিদের মধ্যে বছরে কোটি টাকার ওপরে আয় করেন ৫৪ জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগেই রয়েছেন ৪৩ জন। জাপার চারজন, তরীকত ফেডারেশনের একজন এবং স্বতন্ত্র এমপি রয়েছেন ছয়জন। পাঁচ লাখ টাকার কম আয় করেন মাত্র ৪৯ জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৫ জন, জাপার ১২ জন। ৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা আয়সীমার মধ্যে রয়েছেন ১১১ এমপি।
কর দেওয়ায় পিছিয়ে এমপিরা :২১৩ জন কোটিপতি ও ৫৪ এমপির বার্ষিক আয় কোটির ওপরে হলেও ১০ লাখ টাকার ওপরে করদাতার সংখ্যা মাত্র ৩১ জন। তাদের ২৬ জন আওয়ামী লীগের, জাপার তিনজন এবং স্বতন্ত্র দু'জন। কোনো কোনো এমপি আয়করের আওতাভুক্ত হলেও আয়কর-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হলফনামার সঙ্গে পাওয়া যায়নি। যদিও নতুন সংসদের ২৫২ জন এমপি কর দিয়ে থাকেন। তাদের মধ্যে পাঁচ হাজারের নিচের করদাতা ১০৮ জন। এক থেকে ৫ লাখ টাকা কর দেন ৪১ জন।
৪৩ এমপি ঋণগ্রস্ত :দশম সংসদের ২৫৫ জনের এক টাকাও ঋণ নেই। ঋণগ্রস্ত এমপি মাত্র ৪৩ জন। তাদের ১৮ জনের ঋণের পরিমাণ ৫ কোটির ওপরে। তাদের মধ্যে ১৩ জন আওয়ামী লীগের, ২ জন জাপার এবং ৩ জন স্বতন্ত্র এমপি।
সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা :২৯৯ জন এমপির মধ্যে ১৬৩ জনেরই পেশা ব্যবসা। ৪০ জন আইনজীবী, ১৭ জনের পেশা কৃষি, চাকরিজীবী আছেন ১২ জন, গৃহিণী আছেন ৩ জন। পেশা উল্লেখ করেননি ৫ জন। এ ছাড়াও অন্যান্য পেশায় আছেন ৫৯ জন। ১৬৩ জন ব্যবসায়ীর মধ্যে আওয়ামী লীগেই আছেন ১৩২ জন, জাপার ১৬ ও স্বতন্ত্রদের মধ্যে ১১ জন।
এবারের নির্বাচনে ১৫৩ আসনের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ফলে ১৪৭ আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এতে মোট প্রার্থী সংখ্যা ছিল ৫৪৩ জন। এর মধ্যে ২৮২ প্রার্থীর পেশা ছিল ব্যবসা। ব্যবসায়ী প্রার্থীদের অর্ধেকেরও বেশি বিজয়ী হয়েছেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১২ ধারা অনুযায়ী, সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কে যুক্ত প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য হলেও এ রকম অনেকেই এবার নির্বাচিত হয়েছেন।
বেশিরভাগ এমপি উচ্চশিক্ষিত :২৯৯ জনের মধ্যে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ২৪১ জন। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের ২৩৪ জনের মধ্যে ১৯৬ জন, জাতীয় পার্টির ৩৪ জনের মধ্যে ২৬ জন, জাসদের ৫ জনের মধ্যে ৩ জন, স্বতন্ত্র ১৬ জনের মধ্যে ৮ জন স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। এ ছাড়াও ওয়ার্কার্স পার্টির ৬ জন, জাতীয় পার্টির (জেপি) একজন এবং বিএনএফের একজনের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে। তবে স্কুলের গণ্ডি টপকাতে ব্যর্থ এমপি আছেন ৯ জন। যার মধ্যে আওয়ামী লীগে ৪ জন, জাপায় ২ জন এবং স্বতন্ত্র সদস্য ৩ জন। এ ছাড়াও ২৯৯ জনের মধ্যে এসএসসি বা তার চেয়ে কম শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন ২৪ জন। আওয়ামী লীগে ১৫, জাপার ৪ এবং স্বতন্ত্রদের মধ্যে ৫ জন। তরীকত ফেডারেশনের নির্বাচিত ২ সদস্যই এইচএসসি পাস।
মামলায় জর্জরিত এমপিরা :বর্তমান সংসদের আটজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা চলমান। ৪০ জনের বিরুদ্ধে অতীতে হত্যা মামলা ছিল। ৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা আগেও ছিল, এখনও আছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অপরাধে ফৌজদারি মামলা বিদ্যমান রয়েছে ৩১ জনের বিরুদ্ধে। অতীতে ফৌজদারি মামলায় আসামি ছিলেন ১৩৭ জন। যার মধ্যে ২৮ জনের বিরুদ্ধে অতীতেও ছিল, বর্তমানেও মামলা চালু আছে।
আওয়ামী লীগের এমপিদের মধ্যে অতীতে ১১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা থাকলেও এখন আছে মাত্র ২০ জনের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে অতীতে হত্যা মামলার আসামি ছিলেন ৩৫ জন। বর্তমানে রয়েছে মাত্র ৬ জনের বিরুদ্ধে।