এসএমজি, রকেট লঞ্চার, টমিগান, রাইফেলসহ আটক অস্ত্রের সংখ্যা এক হাজার ৯৪০। ম্যাগাজিন ছয় হাজার ৩৯২। গুলি ও গ্রেনেড ১১ লাখ ৬৫ হাজার ৫১৬। জাহাজ বোঝাই করে ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল মধ্যরাতে এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ এসেছে বাংলাদেশে। পরিবহনে ট্রাক লেগেছে ১০টি। চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আজ, ১০ বছর পর। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে পাঁচবার। চার্জশিট হয়েছে তিন দফা। বদলে গেছে আসামিও। এ মামলার প্রথম চার্জশিটে কুলি, মজুর ও শ্রমিকরা আসামি থাকলেও সর্বশেষ চার্জশিটে যোগ হয়েছেন বাঘা বাঘা সব লোক_ সাবেক শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ অনেকে। স্মরণকালের সর্ববৃহৎ এ অস্ত্র মামলার রায়ে অনেক রাঘববোয়ালের চোখে অমানিশার অন্ধকার নেমে আসতে পারে। চোরাচালান
মামলায় সর্বনিম্ন দুই বছর কারাদণ্ড থেকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তিন দিন আগে আদালত ভবনে লেগেছে রহস্যময় আগুন। সে আগুনে পুড়েছে মালখানায় থাকা বিভিন্ন আলামত। এর আগে মামলার বিচারক এসএম মজিবুর রহমানের বাড়ি লক্ষ্য করে ছোড়া হয় পেট্রোল বোমা। রায়ের দিনক্ষণ পেছাতে আসামিদের আইনজীবীরা দৌড়ঝাঁপ করেছিলেন উচ্চ আদালতেও। দায়ের হয়েছিল একাধিক রিটও। আদালতে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি পয়েন্টে বসানো হয়েছে চেকপোস্টও। এভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা।
যেভাবে আটক ১০ ট্রাক অস্ত্র
সর্ববৃহৎ এই অস্ত্রের চালান ধরা পড়েছিল ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল মধ্যরাতে। রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজারের (সিইউএফএল) জেটিঘাটে খালাস করার সময় ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালানটি আটক করে টহল পুলিশ। বন্দর থানার এসআই হেলাল উদ্দিন এবং কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির এসআই আলাউদ্দিন সর্বপ্রথম বোট থেকে এসব অস্ত্রের চালান খালাস করতে দেখে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেন। এর পর সিএমপির ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে নাটকীয় সব ঘটনার জন্ম দেন। সিএমপির তৎকালীন উপকমিশনার (উত্তর) আবদুল্লাহেল বাকী ও সহকারী কমিশনার (বন্দর) মাহমুদুর রহমান ঘটনাস্থলে গিয়ে উলফা নেতা পরেশ বড়ূয়াসহ মূল হোতাদের ছেড়ে দেন। অস্ত্র ছাড়ানোর জন্য বিপুল পরিমাণ টাকাভর্তি ব্যাগটিও গায়েব হয়ে যায়। পরদিন এ ঘটনায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইন এবং চোরাচালান আইনে দুটি মামলা দায়ের করেন কর্ণফুলী থানার ওসি আহাদুর রহমান।
কোথায় যাচ্ছিল অস্ত্র
বিপুলসংখ্যক এসব অস্ত্র বাংলাদেশ হয়ে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার হাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল বলে আদালতে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। তাদের দাবি, বাংলাদেশকে অস্ত্র পরিবহনের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করেন তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
কেন লাগল ১০ বছর
২০০৪ সালের ১ এপ্রিল চারদলীয় জোট সরকারের আমলে অস্ত্রের চালান আটকের ঘটনা ঘটলেও তখন মূল হোতাদের বাদ দিয়েই দেওয়া হয় চার্জশিট। সাজানো হয়েছিল কল্পকথা। তাই ২০০৭ সালের ২০ নভেম্বর আদালত সাতটি পয়েন্ট চিহ্নিত করে চাঞ্চল্যকর এ মামলা অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে সিআইডি অস্ত্র এবং চোরাচালান মামলায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ মোট ৫৬ জনকে আসামি করে ২০১১ সালের ২৬ জুন আদালতে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করে। ওই বছরের ১৫ নভেম্বর ভিআইপি এসব আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়। ২৯ নভেম্বর শুরু হয় সাক্ষ্য গ্রহণ। ২০১৪ সালের ১৩ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক পর্ব শেষে ৩০ জানুয়ারি মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন আদালত। চাঞ্চল্যকর এ মামলা চলাকালে সরকার পরিবর্তন হয়েছে তিন দফা। এর প্রভাব পড়েছে মামলার তদন্তকাজে। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দেওয়া প্রথম চার্জশিটে সিইউএফএল জেটিঘাটের কুলি-মজুরদের আসামি করা হয়। মূল ভিআইপি আসামি, যারা এই অস্ত্র চালানের সঙ্গে যুক্ত বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিল, তাদের সম্পূর্ণ আড়াল করা হয়। ওয়ান-ইলেভেনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে মামলা অধিকতর তদন্ত করতে বলেন আদালত। অতঃপর আসামির তালিকায় যুক্ত হন বাবর, নিজামীসহ অনেক ভিআইপি। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে চাঞ্চল্যকর এ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়। তারপরও আদালতে দীর্ঘ শুনানি হওয়ার পরও রায় ঘোষণা হয়নি মহাজোট সরকারের আমলে। এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এএসপি মনিরুজ্জামানকে আসামিপক্ষ টানা ৩৪ দিন ও রাষ্ট্রপক্ষ দুই দিন জেরা করে।
যে ১৭ জনের বিরুদ্ধে আছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ
আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র ও চোরাচালান মামলার সম্পূূরক চার্জশিটে সাবেক মন্ত্রী, এমপি থেকে শুরু করে অনেক ভিআইপিকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন_ সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম, মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার, পরিচালক উইং কমান্ডার (অব.) শাহাবুদ্দিন আহমেদ, উপপরিচালক মেজর (অব.) লিয়াকত হোসেন, মাঠ কর্মকর্তা আকবর হোসেন খান, সিইউএফএলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহসিন উদ্দিন তালুকদার ও মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) এনামুল হক, হাজি আবদুস সোবহান, আরজু মিয়া, দ্বীন মোহাম্মদ, হাফিজুর রহমান, সানোয়ার হোসেন, মো. আজিজ, মরিয়ম বেগম ও জসিম উদ্দিন। শিল্প সচিব নুরুল আমিন, ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফা নেতা পরেশ বড়ূয়াসহ আসামি হিসেবে আছেন আরও ৩৭ জন। ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের দুটি মামলায় ৫৬ জনকে আসামি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। মামলা চলাকালে মারা যান চার আসামি।
সাক্ষীরাও সব ভিআইপি
অস্ত্র আটকের দুটি মামলায় ২৬৫ সাক্ষীর মধ্যে ২০ জন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় বিচারিক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন ডিজিএফআইর তৎকালীন প্রধান মেজর (অব.) সাদিক হাসান রুমী, তৎকালীন শিল্প সচিব ড. শোয়েব আহমেদ, বিসিআইসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ইমামুজ্জামান, এসবির তৎকালীন ডিআইজি শামসুল ইসলাম, সিআইডির তৎকালীন ডিআইজি ফররুখ আহমেদ চৌধুরী, এনএসআইর সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এনামুর রহমান চৌধুরী, সিএমপির তৎকালীন কমিশনার সাবি্বর আলী, পুলিশের তৎকালীন ডিসি আবদুল্লাহেল বাকী, সার্জেন্ট আলাউদ্দিন, সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিন প্রমুখ।
জবানবন্দিতে যা বলেছেন সাক্ষীরা
উইং কমান্ডার (অব.) সাহাবুদ্দিন আহাম্মদ ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে আদালতে বলেন, 'বাংলাদেশস্থ একটি হাইকমিশন অফিসের সহযোগিতায় ভারতের উলফার জন্য অস্ত্রগুলো আনা হয়েছে। এসব অর্থ ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে পেঁৗছে দিতে আর্থিক, কারিগরি ও অস্ত্র সরবরাহে সহায়তা করেছে হাইকমিশন।' আদালতে যুক্তিতর্কের সময় রাষ্ট্রপক্ষের পিপি কামাল উদ্দিন আহম্মদ বলেন, 'বাংলাদেশে ভারত ও পাকিস্তানের দুটি হাইকমিশন আছে। তাই আমরা নিশ্চিত, অস্ত্র পাচারের সঙ্গে পাকিস্তান হাইকমিশন জড়িত।'
চোরাচালানি হাফিজুর রহমান ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে আদালতকে বলেন, সিঙ্গাপুর থেকে আসা একটি কালো কাপড়ে মোড়ানো জাহাজ থেকে অস্ত্রগুলো বহির্নোঙরে খালাস করা হয়। তিনি এবং উলফা নেতা আসিফ একসঙ্গে সেই জাহাজে যান। জাহাজের দায়িত্ব পালনরতদের সঙ্গে কথা বলে অস্ত্রগুলো যে উলফার জন্য আনা হয়েছিল, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হন তিনি। উলফা নেতা পরেশ বড়ূয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, 'ঢাকায় জাতীয় পার্টির সাংস্কৃতিক সম্পাদক আজমল হুদা মিঠু, গোলাম ফারুক অভি ও আমানের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে জানতে পারি, আমানই উলফার পরেশ বড়ূয়া। পরে আরেক বৈঠকে পরেশ বড়ূয়া বলেন, ডিজিএফআই ও আইএসআইর তত্ত্বাবধানে আমরা বাংলাদেশ থাকি। অস্ত্রগুলো নিরাপদে আনতে তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।'
আরেক চোরাচালানি দীন মোহাম্মদ ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে বলেন, সিইউএফএল ঘাটে জিএমের অনুমতি ছাড়া কোনো কাকপক্ষীও ঢুকতে পারে না। বহির্নোঙর থেকে উলফার জন্য আনা অস্ত্রগুলো অনুমতি নিয়ে সিইউএফএল ঘাটে খালাস করা হচ্ছিল। অস্ত্র খালাসের সময় তিনি আরজু পাগলাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। শুধু এ তিনজনই নয়, এ মামলার সম্পূূরক চার্জশিটভুক্ত সাত আসামিসহ মোট ২০ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাতে স্পষ্ট_ তৎকালীন সরকারের ওপরমহলের জ্ঞাতসারেই ওই ১০ ট্রাক অস্ত্র এসেছে।
আইনজীবীরা কী বলেন
১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার সরকারি কেঁৗসুলি অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন আহম্মদ বলেন, 'তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ অস্ত্র চালানের সঙ্গে জড়িত থাকায় আদালত সতর্কতার সঙ্গে রেকর্ড করেছেন সবার সাক্ষ্য।' তার আশা, চাঞ্চল্যকর এ মামলার আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করবেন আদালত। তবে সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম বলেন, অস্ত্র আইনে কোনো মামলা দায়ের করলে আসামিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকতে হয়। বাবর ওই সময় ঢাকায় ছিলেন। তাই অস্ত্র কিংবা চোরাচালান কোনো মামলাতেই তাকে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করতে তাকে আসামি করা হয়েছে। আশা করি, তিনি মুক্তি পাবেন।
সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড
চট্টগ্রামের চাঞ্চল্যকর ১০ ট্রাক অস্ত্র ও চোরাচালান মামলায় চারটি পৃথক ধারায় মোট ৫২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে চোরাচালান মামলায় ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫ (খ) উপধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও সর্বনিম্ন শাস্তি ২ বছর কারাদণ্ড। একই অপরাধের পৃথক ২৫(ঘ)-এর উপধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি ১৪ বছর ও সর্বনিম্ন ২ বছর নির্ধারণ করা আছে। অন্যদিকে অস্ত্র আইনের ১৯ (ক) ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন ও সর্বনিম্ন শাস্তি ১০ বছর। একই আইনে গোলাবারুদ রাখা সংক্রান্ত ১৯ (চ) ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন ও সর্বনিম্ন ১০ বছর।

মন্তব্য করুন