প্রশাসনে ধীরগতি

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৪      

শরীফুল ইসলাম ও ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

ধীরগতিতে চলছে জনপ্রশাসন। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ও সচিবদের মধ্যে দেখা দিয়েছে সমন্বয়হীনতা। এরই মধ্যে কয়েকজন মন্ত্রী তার দপ্তর থেকে সংশ্লিষ্ট সচিব বদল করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের দ্বারস্থ হয়েছেন। আবার সচিবদের কেউ কেউ স্বেচ্ছায় দপ্তর বদলে বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির চালাচ্ছেন। এতে মন্ত্রী-সচিবদের মধ্যে দিন দিন এক ধরনের দূরত্ব বাড়ছে। মন্ত্রণালয়ের অনিষ্পন্ন কাজ মাসের পর মাস ফেলে রাখা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, শীর্ষ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও অবহেলাসহ নানাবিধ কারণে জনপ্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না। মন্ত্রী ও সচিবের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পও বাস্তবায়নে দেখা গেছে ধীরগতি। মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজেও ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী সমকালকে বলেন, সমন্বয়হীনতার বিষয় তার জানা নেই। তবে তিনি বলেন, প্রশাসনে গতি আনার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জনকল্যাণার্থে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সচিবদের আরও আন্তরিক হতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রশাসনের এমন অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের কাজকর্ম খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এসব কর্মকর্তা কতটুকু আন্তরিক, সে ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ কাজে একটি গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। আগামী দু'সপ্তাহের মধ্যে সচিবদের কাজকর্মের আমলনামা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হবে। এর ভিত্তিতে তাদের দপ্তর পুনর্বণ্টন করা হতে পারে। যারা কাজে দক্ষতা ও আন্তরিকতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের ভাগ্যে জুটতে পারে ডাম্পিং বা ওএসডি। তাদের স্থলে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের। সরকারি একটি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
দলীয় আনুগত্য ও তদবিরে কোনো কোনো কর্মকর্তা সচিব পদে পদোন্নতি পেলেও তারা মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে সাফল্য আনতে পারছেন না। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো ফাইলের অধিকাংশেই নানা ত্রুটি ধরা পড়ছে। সম্প্রতি সচিবদের দক্ষতা ও উপস্থাপিত সারসংক্ষেপ দেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসন্তোষ প্রকাশ
করেছেন বলে জানা গেছে। তার পরও সচিবদের কাজের চেহারা পাল্টেনি। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক চিঠিতে বলা হয়, 'মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে সচিবরা গতি সঞ্চার করতে পারছেন না। সরকারের প্রত্যাশিত গতি যেভাবে আসার প্রয়োজন ছিল, তার চেয়ে আর্থিক ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক সময় এসব প্রস্তাবনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে।'
সম্প্রতি সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সচিবদের অদক্ষতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সঙ্গেও বনাবনি হচ্ছে না সচিবদের। ওই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরাও সংশ্লিষ্ট সচিবদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে সচিবের সঙ্গে মন্ত্রীদের সমন্বয়হীনতা চলছে।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রাণিসম্পদ বিভাগের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা/সমপর্যায়, মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা/সমপর্যায় ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার পদোন্নতি, বদলি, টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড নিয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে সচিবের বিরোধ দেখা দেয়। মন্ত্রণালয়ের প্রধান হলেও মন্ত্রীর অনুমোদন না নিয়ে বিভিন্ন পদের প্রায় ৪০০ কর্মকর্তার পদোন্নতি, বদলি-সংক্রান্ত সরকারি আদেশ জারি করা হয়। ঘটনাটি ঘটে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে। এ সময় মন্ত্রী ঢাকার বাইরে ছিলেন। তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে সচিব পদোন্নতি, পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতার আদেশ জারি করেন। বিষয়টি জানতে পেরে সচিবের ওপর ক্ষুব্ধ হন মন্ত্রী। এসব আদেশ স্থগিত করার জন্য সচিবকে নির্দেশ দেন তিনি। এর পর থেকে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম গতি হারিয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, এই মেগা পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে চিহ্নিত বিএনপি-জামায়াত ঘরানার কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে তৎকালীন এক যুগ্ম সচিব নেপথ্য ভূমিকা রেখেছেন। এসব ঘটনা প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় পর্যন্ত গড়ালে ওই যুগ্ম সচিবকে অন্যত্র বদলি করা হয় বলে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক বলেন, রুলস অব বিজনেস অনুসারে সংসদীয় সরকারের একটি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীই হচ্ছেন প্রধান। মন্ত্রী পর্যায়ে অনুমোদনযোগ্য যে কোনো ফাইল নিষ্পত্তি করতে হলে মন্ত্রীর অনুমোদন নিতে হবে। এর ব্যত্যয় হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এ ধরনের ঘটনা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অহরহ ঘটছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। কয়েক মাস আগে মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী সরকারি কাজে দেশের বাইরে থাকায় সচিব তার ইচ্ছামতো কয়েকজন ডাক্তারকে বদলি ও পদায়ন করেছেন। অথচ রুলস অব বিজনেস অনুসারে মন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে এসব বদলি করার কথা। দেশে আসার পর বিষয়টি জানার পর মন্ত্রী ক্ষুব্ধ হন। পরে সেটি বাতিল করা হয়। ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানাজানি হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারাও স্বাস্থ্য সচিবের কর্মকাণ্ডে নাখোশ। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, মন্ত্রী ও সচিবের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব রয়েছে। তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে ওই মন্ত্রণালয়ের সচিবের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। সচিব ওই মন্ত্রণালয় বদল করতে বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির করছেন বলেও জানা গেছে। এতে মন্ত্রণালয়ের দাপ্তরিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটছে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে সচিবদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রীদের সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের কাজকর্মে গতি আনতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও একাধিকবার নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এরই মধ্যে সচিবালয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে তিনি মন্ত্রণালয়গুলোর সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চান। পাশাপাশি কাজে আরও আন্তরিক হতে সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মন্ত্রণালয়ের কাজে গতিশীলতা নির্ভর করে মন্ত্রী ও সচিবের পারস্পরিক দক্ষতা ছাড়াও সুসম্পর্কের ওপর। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে মন্ত্রণালয়ে কর্মরত কর্মকর্তাসহ সহায়তা প্রদানকারী অন্য কর্মচারীদের। এ দুটি বিষয় আইন বা বিধি দ্বারা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তারা সবাই একে অন্যের পরিপূরক। মন্ত্রীর যেমন রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, তেমনি সচিব ও বড় কর্মকর্তাদের রয়েছে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা। তাদের নিজ নিজ অধিক্ষেত্রও মোটামুটি সুস্পষ্ট করা আছে। সরকারের রুলস অব বিজনেস বা কার্য সম্পাদন পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া নামক পুস্তিকায় এ বিষয়টি রয়েছে। এতে সচিব ও মন্ত্রীর পারস্পরিক অধিক্ষেত্রও চিহ্নিত।
এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবদুস সোবহান সিকদার সমকালকে বলেন, সচিবদের কাজের গতি আরও বাড়াতে বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনামূলক চিঠি দেওয়া হচ্ছে। সঠিক সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করা হচ্ছে। তাদের নানা ধরনের দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে কেউ অদক্ষতার পরিচয় দিলে সেটিও সরকার নজরে আনবে। এটি তো স্বাভাবিক।
সূত্র জানায়, অনেক সচিবই দাপ্তরিক কাজের চেয়ে নিজের পদপদবি ঠিক রাখার জন্য সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে তোষামোদিতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সচিব পদের দায়িত্বে থেকেও অনেকেই সে সম্পর্কে সচেতন নন। শুধু তাই নয়, সরকারের 'রুলস অব বিজনেস' সম্পর্কে অনেকের ধারণা খুবই কম। তাই প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সচিবদের দক্ষতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।