ডিআইএতে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৪      

সাবি্বর নেওয়াজ

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন 'পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর' (ডিপার্টমেন্ট অব ইন্সপেকশন অ্যান্ড অডিট_ডিআইএ)। সারাদেশের এমপিওভুক্ত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসার দুর্নীতি তদন্ত এ সংস্থার প্রধান কাজ। অথচ এ প্রতিষ্ঠানেই এখন দানা বেঁধেছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। ডিআইএর যথাযথ তদারকি না থাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আর্থিক দুর্নীতি বেড়েছে। এ ছাড়া শিক্ষক-কর্মচারী পদে অবৈধ নিয়োগ, ভুয়া এমপিওভুক্তি, জাল সনদে চাকরিসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও দপ্তরটি রয়েছে অনেকটা চোখ-কান বুজে। তাদের পরিদর্শন প্রতিবেদনে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হচ্ছে না। দেখা গেছে, ভুয়া এমপিওভুক্তির প্রমাণ পেয়েও তাদের ছাড় দিচ্ছেন ডিআইএ কর্মকর্তারা।
এ অধিদপ্তরে কেউ একবার পদায়ন পেলে আর অন্যত্র বদলি হতে চান না। আবার কাউকে বদলি করা হলেও তদবিরের
চাপে তা বাতিল করতে বাধ্য হয় মন্ত্রণালয়। এমনই অবস্থা চলছে বছরের পর বছর। জানা গেছে, সরকারি ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তাদের একই স্টেশনে তিন বছরের বেশি থাকার বিধান নেই। অথচ ডিআইএতে ঘুরেফিরে ১০ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত কর্মকর্তাদের কেউ কেউ চাকরি করছেন। তারা কিছুতেই ডিআইএ ছাড়তে চান না। অনেকে আবার পদোন্নতিও নিতে চান না অন্যত্র বদলি হতে হবে বলে। এ ছাড়া পদোন্নতি পাওয়ার পরও নিম্নপদে কাজ করছেন কেউ কেউ।
ডিআইএর বিরুদ্ধে যত অভিযোগ :বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার অনিয়মের খবর পেয়ে টিম গঠন করে ডিআইএ তদন্ত করে থাকে। প্রতিটি টিমে পাঁচজন করে কর্মকর্তা থাকেন। দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে গিয়ে দুর্নীতি ধরার পরিবর্তে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কর্মকর্তারা 'ম্যানেজ' হয়ে যান। অনেক ক্ষেত্রে তারা 'অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি' মর্মে প্রতিবেদন দেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অডিট ও আইন শাখা থেকে তথ্য নিয়ে এর প্রমাণও মিলেছে। দেখা গেছে, ডিআইএ বছরে কমবেশি এক হাজার ৮০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে থাকে। এর মধ্যে গুরুতর দুর্নীতির তথ্য তুলে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয় মাত্র ২০-৩০টির। গত কয়েক মাসের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে ১৩২ থেকে ১৫৩টি পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছে।
ডিআইএতে ১৩০ জন জনবল থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন ৮০ জন। এর মধ্যে ৩৫ জন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার থেকে প্রেষণে কর্মরত। বাকিরা প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব জনবল। একজন পরিচালক, একজন যুগ্ম পরিচালক (বর্তমানে পদশূন্য), চারজন উপপরিচালক, ১২ জন শিক্ষা পরিদর্শক, ১২ জন সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক ও চারজন অডিট অফিসার রয়েছেন।
মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া কয়েকটি লিখিত অভিযোগে জানা গেছে, গত মাসে নেত্রকোনা জেলার আটপাড়া উপজেলার একটি মাদ্রাসার চারজন শিক্ষকের সনদ ভুয়া হিসেবে ধরা পড়ে। কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সনদ সঠিক কি-না তা যাচাই-বাছাইয়ের নামে বর্তমানে কালক্ষেপণ করছেন। রাজধানীর মনিপুর স্কুলে তদন্তে গিয়েও ডিআইএ টিম সঠিক প্রতিবেদন দেয়নি বলে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে ওই প্রতিষ্ঠানেরই কয়েকজন শিক্ষক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। ২০১২ সালে রাজধানীর একটি খ্যাতনামা স্কুল অ্যান্ড কলেজে এসএসসির প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। অথচ ওই প্রতিষ্ঠানে ডিআইএর তদন্তের কোনো নামগন্ধও নেই। দীর্ঘ ১৮ বছর ডিআইএতে কর্মরত এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া থানার আলিয়া মাদ্রাসা থেকে তিন লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তার প্রভাবের কাছে কমিটির সদস্যরা অসহায় হয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে। তদন্তকাজ বর্তমানে পুরোপুরি স্তিমিত।
এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক মফিজ উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, 'আমাদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ সত্য নাকি মিথ্যা, তা নিয়ে কিছু বলব না। তবে যে বা যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অনিয়মে অভিযুক্ত হয়, তারা তদন্তকারীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করতেই পারে।' তিনি বলেন, 'ডিআইএর কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে আমরা তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্বারা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিই।' অতীতে এমন কোনো উদাহরণ নেই বলা হলে তিনি বলেন, 'অনেকে হয়তো বদলি হয়ে যান। কেউ কেউ অবসরে চলে যান। তাই হয়তো ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে ওঠে না।'
ভুয়া এমপিওভুক্তি ও জাল সনদের ছড়াছড়ি :ডিআইএর কর্মকর্তাদের অবহেলা আর ছাড় দেওয়ার কারণে সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভুয়া এমপিওভুক্ত ও জাল সনদধারী শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা বেড়ে গেছে । প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রে জেনেবুঝেই অবৈধ সুবিধার বিনিময়ে জাল সনদধারীদের চাকরিতে নিয়োগ দিচ্ছেন। আর তাদের এমপিওভুক্তি বাবদ সরকারের প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা গচ্চা যাচ্ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ও ডিআইএর যৌথ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশজুড়ে মাধ্যমিক স্তরের কমপক্ষে ৫০ হাজার শিক্ষক জাল সনদে শিক্ষকতা করছেন। এ তদন্তে এরই মধ্যে দেশের ৪৩টি জেলার শতাধিক কলেজ, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা পরিদর্শন করে মোট ১০৬ জন জাল সনদধারী শিক্ষক চিহ্নিত করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, জাল সনদধারী হিসেবে চিহ্নিত ১০৬ শিক্ষক তিন কোটি ৩৪ লাখ ৮৭ হাজার ৭১৯ টাকা সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা তুলে নিয়েছেন। তাদের এসব টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়ার সুপারিশও করে তদন্ত কমিটি।
এ বিষয়ে ডিআইএর পরিচালক বলেন, জাল সনদের বিরুদ্ধে ডিআইএ কর্মকর্তারা সজাগ নন_ এ কথা সত্য নয়। এরই মধ্যে তাদের তদন্তে প্রচুর জাল সনদধারী ধরা পড়েছেন। তবে জাল সনদ চিহ্নিত করার বিষয়টি একটু জটিল। সনদ ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষ থেকে সনদ যাচাই করে আনার ক্ষেত্রে অনেক সময় দীর্ঘসূত্রতা হয়। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে তারা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেন। শুধু জাল সনদের অংশটুকু পরে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, 'ভুয়া এমপিওভুক্তি ধরার দায়িত্ব মাউশির। এটি তাদের কাজ নয়।'
কী জাদু ডিআইএতে :পদায়ন পেলেও কর্মকর্তাদের কেউই আর ডিআইএ ছাড়তে চান না। যে কোনোভাবে তারা এখানে টিকে থাকতে চান। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১০ সালে সাবেক শিক্ষা সচিব সৈয়দ আতাউর রহমান একসঙ্গে ডিআইএর সাত কর্মকর্তাকে বদলি করেন। প্রভাবশালীদের চাপে মাত্র দু'দিনের মাথায় তা স্থগিত করতে বাধ্য হয় মন্ত্রণালয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমানে কর্মরতদের মধ্যে ২৫ জন ঘুরেফিরে এ প্রতিষ্ঠানটিতে ১০ থেকে ১৯ বছর পর্যন্ত চাকরি করছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক মফিজ উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, বদলির বিষয়টি তাদের হাতে নয়। পুরো বিষয়টি মন্ত্রণালয় দেখভাল করে। কে এখানে কত দিন চাকরি করবে, তা সরকারের ব্যাপার।
জানা গেছে, ডিআইএর পরিদর্শকের পদটি সহকারী অধ্যাপক পদমর্যাদার। কিন্তু সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেলে ডিআইএ ছাড়তে হবে_ এমন শঙ্কায় শিক্ষা পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ, সুলতান মোহাম্মদ একে সাব্রী, সেলিম মোল্লা ২০১২ সালে প্রথম দফা পদোন্নতি নেননি। তারা পদোন্নতির আবেদনও করেননি। একইভাবে সহকারী শিক্ষা পরিদর্শকের পদটি প্রভাষক পদমর্যাদার। এ পদ থেকেও পদোন্নতি নিতে চান না অনেকে। জানা গেছে, ডিআইএর কর্মকর্তা (শিক্ষা ক্যাডার নন) গাজী কুদরত উল্লাহ, সিরাজুল ইসলাম, সঞ্জয় মিস্ত্রি, মাহমুদুল হকের মধ্যে কেউ কেউ ১৫ থেকে ২৫ বছর শুধু অডিটর পদেই ছিলেন। কিন্তু সরকার জোরপূর্বক তাদের ২০১১ সালে সুপার পদে পদোন্নতি দেয়।