চট্টগ্রাম বন্দরে লুটপাট

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৪

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

লুটপাটের স্বর্গরাজ্য যেন চট্টগ্রাম বন্দর। ২০ শতাংশ কাজ বাকি থাকলেও পুরো কাজের বিল নিয়ে বিদেশ পালিয়েছেন ২২৯ কোটি টাকার ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের ঠিকাদার। প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার ছাড়াই কাজ হচ্ছে বন্দরের সর্ববৃহৎ প্রকল্প নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে (এনসিটি)। এরই মধ্যে এ টার্মিনালের অপারেটর নিয়ে গেছেন ৩৭ কোটি টাকার বিল। বিদেশ সফরের বিনিময়ে নিম্নমানের যন্ত্রপাতিকে দেওয়া হচ্ছে মানোত্তীর্ণ সনদ। আবার চুক্তি স্বাক্ষরের ১৮ মাস পরও কমলাপুর আইসিডিতে কাজ শুরু করেননি ঠিকাদার। প্রকাশ্যে এমন শর্ত ভঙ্গের পরও বাতিল হচ্ছে না ঠিকাদারের সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে সংঘটিত অনিয়মের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করছেন সাবেক মেয়র এবিএম
মহিউদ্দিন চৌধুরী। নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে নিয়মিত লিফলেট ও পথসভা করছেন তিনি। ২৭ আগস্ট বন্দর ভবন ঘেরাও করে সমাবেশ করার কর্মসূচিও ঘোষণা করেছেন তিনি। বন্দরের বিভিন্ন অনিয়ম খতিয়ে দেখতে মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও। তাদের চাপে এরই মধ্যে এনসিটিতে এক হাজার ১২০ কোটি টাকা মূল্যের ৬১টি সরঞ্জাম কেনার প্রক্রিয়া স্থগিতও করেছে মন্ত্রণালয়।
বন্দরের বিভিন্ন প্রকল্পে সংঘটিত অনিয়ম প্রসঙ্গে চট্টগ্রামে এসে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, 'ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের ঠিকাদার বিদেশ পালিয়ে যাওয়ায় তার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষকে। এরই মধ্যে জরিমানাও আরোপ করা হয়েছে তাদের ওপর। যেসব যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অনিয়ম হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে তদন্ত চলছে। আর এনসিটির সরঞ্জাম কেনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সেটিও আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। বিদেশ সফর করে কেউ যেন অন্যায় সুবিধা নিতে না পারে, সে জন্য মনোনীতদের তালিকা আগেভাগে মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে।' একই প্রসঙ্গে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম বলেন, 'চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন অনিয়ম সম্পর্কে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। এনসিটির যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অনিয়মের ইঙ্গিত পাওয়ায় সেটিও স্থগিত করতে বলা হয়েছে মন্ত্রণালয়কে। তারা আপাতত প্রক্রিয়াটি স্থগিত রাখলেও এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ এ টার্মিনাল পরিচালনার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।'
২২৯ কোটি টাকার ক্যাপিটাল ড্রেজিং শেষ না করেই পালালেন ঠিকাদার
বহুল আলোচিত কর্ণফুলী নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের ২০ দশমিক ৩০ শতাংশ কাজ শেষ না করেই বিদেশে পালিয়েছেন এ প্রকল্পের স্থানীয় এজেন্ট জাফর আলম। ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল মালয়েশিয়ান মেরিটাইম অ্যান্ড ড্রেজিং করপোরেশনের সঙ্গে ২২৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকায় ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের চুক্তি করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তারা সরাসরি কাজটি না করে সাব-কন্ট্রাক্ট দেয় সালেহ মো. জাফরের প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক মেরিন সার্ভিসকে। ২০১৩ সালে এ প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তা করতে ব্যর্থ হয়েছে প্যাসিফিক মেরিন। উল্টো বন্দর থেকে অতিরিক্ত বিল তুলে নিয়ে বিদেশ পালিয়েছেন মো. জাফর। বন্দরের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশেই সংঘটিত হয়েছে এ অনিয়ম। তাই ঝুলে আছে ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের ভবিষ্যৎ। এখনও প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করতে টেন্ডার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে পারেনি বন্দর কর্তৃপক্ষ। জাফরের প্রতিষ্ঠানকে ৫ কোটি টাকা জরিমানা করা হলেও আদায় হয়নি সেই টাকা। চুক্তি অনুযায়ী ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত ব্রিজের ৩০০ মিটার ওপর থেকে বিআইডবি্লউটিসি জেটি পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকা থেকে ১২ কোটি ঘনফুট (৩৬ লাখ ঘনমিটার) পলি মাটি অপসারণ করার কথা। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ১০০ মিটার দৈর্ঘ্যের নতুন চারটি জেটিও তৈরি করার কথা ছিল; কিন্তু মাটি অপসারণের কাজ শেষ না হওয়ায় ঝুলে আছে জেটি তৈরির কাজ।
প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার ছাড়াই কাজ চলছে এনসিটিতে
আইনি জটিলতার কারণে এনসিটিতে সরাসরি ক্রয় (ডিপিএম) পদ্ধতিতে কাজ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ার টেক। এ প্রতিষ্ঠান এনসিটি পরিচালনা বাবদ এরই মধ্যে বন্দর থেকে বিল পেয়েছে সাড়ে ৩৮ কোটি টাকা! জানা গেছে, ২০০৭ সালের ১৬ মে থেকে ২০১১ সালের ১৫ মে পর্যন্ত সাইফ পাওয়ার টেক ডিপিএম ছাড়াই কাজ করেছে এনসিটিতে। তখন প্রতিটি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য তাদের দিতে হয়েছে ৭৩০ টাকা। ডিপিএমের অধীনে তারা কাজ করে পরবর্তী দুই বছর। ৭৩০ টাকা থেকে কমে তখন দর নামে ৪০৪ টাকা। একই দরে তারা ডিপিএমের মেয়াদ বাড়ায় ২০১৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। চলতি বছরের মার্চ থেকে আবার সাইফ পাওয়ার টেক কনটেইনার পরিচালনা করছে বক্সপ্রতি ৪৯৯ টাকায়। সম্প্রতি সাইফের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ আরও বাড়িয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার হলে সর্ববৃহৎ এ টার্মিনালে ব্যবসায়ীদের খরচ আরও কমত।
অনিয়ম চলছে কমলাপুর আইসিডিতেও
প্রতি বছর গড়ে ৬০ হাজার টিইইউএস (প্রতিটি ২০ ফুট একক দৈর্ঘ্যের) কনটেইনার হ্যান্ডেল হয় কমলাপুর আইসিডিতে। চট্টগ্রাম থেকে রেলপথে কমলাপুর নিয়ে তা খালাস করেন ঢাকা ও আশপাশের ব্যবসায়ীরা। গুরুত্বপূর্ণ এ আইসিডি পরিচালনা করতে ১৮ মাস আগে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে চুক্তি হয় সাইফ পাওয়ার টেকের। শর্ত অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের সাত মাসের মধ্যে নিজস্ব যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ করার কথা সাইফের। কোনো কারণে তা সম্ভব না হলে জরিমানা দিয়ে সর্বোচ্চ সময় পাওয়ার কথা তার ১৭ মাস। ১৮ মাস পরও কাজ শুরু করেনি সাইফ পাওয়ার টেক। অথচ নিয়ম অনুযায়ী কাজ শুরু করতে না পারায় প্রতি মাসে তাদের চুক্তিমূল্যের এক শতাংশ জরিমানা দেওয়ার কথা। জরিমানার হার সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ হলে বাতিল হওয়ার কথা চুক্তি ও জামানত। অপারেটরের সঙ্গে বন্দর কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নিয়ম হেঁটেছে উল্টো পথে। অথচ শর্ত অনুযায়ী কাজ হলে কমলাপুরের অপারেটরকে জরিমানা হিসেবে এতদিনে গুনতে হতো ছয় কোটি ৯২ লাখ টাকা। আবার জামানত হিসেবেও বাজেয়াপ্ত হতো তার ছয় কোটি ৯২ লাখ টাকা। ঢাকার কমলাপুর কনটেইনার ডিপোটি যন্ত্রপাতি কিনে ১০ বছর পরিচালনা করতে সর্বনিম্ন ৬৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা দর দেয় সাইফ পাওয়ার টেক। এ ক্রয় প্রস্তাব সরকারি অনুমোদনের পর প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি হয় গত বছরের ৩১ জানুয়ারি।
সরঞ্জামাদি ক্রয় এবং সফরেও দুর্নীতি
কেনাকাটাকে সামনে রেখে বিদেশ সফরের সুযোগ থাকায় সরঞ্জামাদি ক্রয় বাবদও দুর্নীতি হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরে। আনুমানিক ৩০ কোটি টাকা মূল্যের দুটি জাহাজ ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনায় প্রশ্ন তুলেছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। প্রশ্ন তুলেছে এনসিটির যন্ত্রপাতি ক্রয়ের প্রক্রিয়া নিয়েও। দেখা গেছে, যন্ত্রপাতি ক্রয়সহ বিভিন্ন অজুহাতে ২১ মাসে বিদেশ সফরে গেছে চট্টগ্রাম বন্দরের ৩৫টি দল। এসব দলের বিদেশে কেটেছে ১৯১ দিন। প্রতিটি দলে নূ্যনতম দু'জন থেকে সাতজন কর্মকর্তা ছিলেন। এক কর্মকর্তা সর্বোচ্চ সাতবারও বিদেশ সফর করেছেন। এভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের ৬৭ কর্মকর্তা বিদেশ সফর করেছেন একাধিকবার। যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী ঠিকাদারের খরচেই বিদেশ গেছেন তারা।