গভর্নরের পদত্যাগ

দুই ডেপুটিকে অব্যাহতি সরিয়ে দেওয়া হলো ব্যাংকিং সচিবকেও

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০১৬

বিশেষ প্রতিনিধি

গভর্নরের পদত্যাগ

পদত্যাগের পর বিকেলে প্রেস ব্রিফিং করেন ড. আতিউর রহমান সমকাল

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির স্পর্শকাতর ঘটনা জানাতে দেরি করায় সরকারের উচ্চপর্যায়ে সৃষ্ট অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে পদত্যাগ করলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান। গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। এদিকে সরকার এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের দু'জন ডেপুটি গভর্নর আবুল কাসেম ও নাজনীন সুলতানাকে অব্যাহতি দিয়েছে। এ ছাড়া ওএসডি করা হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসলাম আলমকে। পাশাপাশি গতকালই গভর্নর পদে সাবেক অর্থ সচিব ফজলে কবিরকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ
ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। থানায় মামলাও হয়েছে।
সোমবার রাতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গভর্নর ড. আতিউরকে সরে যেতে সরকারের ইচ্ছার কথা জানান। ড. আতিউর মঙ্গলবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। এর পর গতকাল সকালে নিজ বাসভবনে আতিউর রহমান সাংবাদিকদের জানান, তিনি পদত্যাগের জন্য প্রস্তুত। পদত্যাগপত্র লিখেও রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী চাইলে তিনি যে কোনো মুহূর্তে পদত্যাগ করবেন। দুপরে আতিউর রহমান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে পদত্যাগপত্র দেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ড. আতিউরের পদত্যাগ সাহসী পদক্ষেপ, যা নৈতিক মনোবল ও সৎ সাহসের বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে আতিউর রহমানের ভূমিকার প্রশংসাও করেন প্রধানমন্ত্রী।
পদত্যাগের পর দুপুর ৩টায় তার বাসভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ড. আতিউর রহমান বলেন, তিনি নৈতিক দায় নিয়ে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। দেশের ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাবমূর্তি রক্ষায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান ২০০৯ সালের ১ মে চার বছর মেয়াদে বাংলাদেশ ব্যাংকের দশম গভর্নর হিসেবে যোগ দেন। পরে সরকার তার মেয়াদ বাড়ায়। আগামী ২ আগস্ট পর্যন্ত তার চাকরির মেয়াদ ছিল। মাত্র ১০ টাকায় কৃষকদের অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ, মোবাইল ব্যাংকিং ও গ্রিন ব্যাংকিংয়ের প্রসারে তার নেওয়া উদ্যোগের কারণে তিনি বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হন এবং আন্তর্জাতিক বেশ কিছু পুরস্কার পান। তবে হলমার্ক, বিসমিল্লাহসহ কয়েকটি ঋণ কেলেঙ্কারির জন্য কমবেশি সমালোচিতও হন।
যেভাবে পদত্যাগ :রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হওয়ার ঘটনা তাকে জানাতে দেরি করাকে 'ধৃষ্টতা' উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী গত রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সাংবাদিকদের জানান। গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর মুহিত বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে বড় পরিবর্তন আসছে। অর্থমন্ত্রীর এ মন্তব্যে ধরে নেওয়া হয়, ড. আতিউর রহমানকে হয়তো সরে যেতে হচ্ছে। আতিউর রহমান ভারতে আইএমএফের একটি সম্মেলন শেষে সোমবার বিকেলে ঢাকায় আসেন। ওই দিন সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর কার্যালয়ে তাকে ডেকে পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি যাননি। রাতে অর্থমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় অর্থমন্ত্রী তাকে বলেন, 'আপনি (আতিউর) চলে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক ভালো থাকবে।' ড. আতিউর সোমবারই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করেন।
এদিকে মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন বেলা ১১টার পরিবর্তে দুপুর আড়াইটায় করা হয়। পরে গভর্নরের পদত্যাগের খবরের পর তা বাতিল করেন অর্থমন্ত্রী।
প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি গত কয়েকদিন ধরে রিজার্ভ থেকে অর্থ লোপাটের ঘটনায় সরকারের সমালোচনা করে পদত্যাগেরও দাবি করে আসছে।
কেন গোপন রেখেছিলেন আতিউর :পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে আতিউর রহমান বলেন, সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে রিজার্ভ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক অনুসন্ধানচিত্র স্পষ্ট হলে বিষয়টি সরকারের উচ্চমহলকে জানানো হয়। সমস্ত কার্যক্রম প্রাথমিকভাবে গোপনীয়তার সঙ্গে পরিচালনার উদ্দেশ্য ছিল, যাতে এ বিষয়ে জনমনে কোনো আতঙ্ক সৃষ্টি না হয়। কেননা একই সময়ে বিভিন্ন এটিএম নেটওয়ার্কে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। এ জন্য বিষয়টি জানাতে তিনি সময় নেন।
পদত্যাগের আগে গতকাল সকালে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, দুর্ঘটনাটি ঘটেছে অনেকটা জঙ্গি আক্রমণের মতো, ভূমিকম্পের মতো। কোনদিক থেকে এসেছে, কে করেছে, কেমন করে হয়েছে_ তা তিনি সহজে বুঝে উঠতে পারেননি। এ আক্রমণ যাতে সমগ্র অর্থনীতিকে ভেঙে না ফেলে, সে ভয়ে তাড়াতাড়ি বিশেষজ্ঞদের মতামত নেন। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে এনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানান। পরে লিখিতভাবে অর্থমন্ত্রীকে জানানো হয়। তিনি বলেন, একটু সময় লেগেছে; কিন্তু সময়টা তিনি নেন দেশের অর্থনীতির স্বার্থে। কীভাবে অর্থ ফেরত আনা যায় এবং ব্যাপক কোনো ক্ষয়ক্ষতি যাতে না হয় তার স্বার্থে।
তিনি বলেন, 'আমি ২৮ বিলিয়ন ডলার রক্ষার জন্য কিছুটা সময় নিয়েছি। প্রথমেই খবরটা যদি বলে দিতাম, তাহলে যে টাকাটা আনতে পেরেছি, তা পারতাম না। হ্যাকাররা আরও বেশি সাবধান হয়ে যেত। বাংলাদেশ ব্যাংক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। জনগণের স্বার্থে আমার বিচার, বিবেক ও দেশপ্রেম মিলিয়ে কাজটি করেছি। এতে যদি অন্যায় করে থাকি, দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাই। দেশবাসীর কাছে অনুরোধ, তারা যেন আমাকে ভুল না বোঝেন।'
দুই ডেপুটি গভর্নরকে অব্যাহতি : রিজার্ভ চুরির ঘটনায় আতিউর রহমানের পদত্যাগের পর দুই ডেপুটি গভর্নর আবুল কাসেম ও নাজনীন সুলতানাকে সরিয়ে দিয়েছে সরকার। গতকাল আবুল মাল আবদুল মুহিত এনইসি সম্মেলন কক্ষে এক অনুষ্ঠানের আগে সাংবাদিকদের বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই ডেপুটি গভর্নর আবুল কাসেম ও নাজনীন সুলতানাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই দুই পদে শিগগিরই নতুন নিয়োগ দেওয়া হবে। নাজনীন সুলতানার দায়িত্বে যেসব বিভাগ ছিল, তার মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি অন্যতম। হ্যাকাররা তথ্যপ্রযুক্তির নিরাপত্তা দেয়াল ভেঙে টাকা চুরি করে। আর আবুল কাসেমের দায়িত্বে ছিল অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগ। এ বিভাগ বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবের দায়িত্বে। বাংলাদেশের প্রথম নারী ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানার চাকরির মেয়াদ সম্প্রতি শেষ হওয়ার পর তা চলতি বছরের ১৪ জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। আবুল কাসেমের চাকরির বাড়তি মেয়াদও আগামী আগস্টে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
ব্যাংকিং সচিব ওএসডি :বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সচিব ড. এম আসলাম আলমকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে ওএসডি করা হয়েছে। আসলাম আলম পদাধিকারবলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, উনি ওই ব্যাংকিং বিভাগের সচিব ছিলেন, তাই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অর্থ চুরি ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ : ফিলিপাইনের ডেইলি ইনকোয়েরারে ২৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সে দেশে ১০ কোটি ডলার পাচার হয়ে এসেছে। এ অর্থ বাংলাদেশের কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হতে পারে। এর পর ৭ মার্চ সমকালে এ বিষয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করে হ্যাকাররা ফিলিপাইনে স্থানান্তর করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ৪ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট সংযোগে সাইবার আক্রমণ ঘটে। হ্যাকাররা ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে থাকা হিসাব থেকে মোট ৩৫টি ভুয়া পরিশোধ নির্দেশ দেয়। মোট ৯৫ কোটি ১০ লাখ ডলার (প্রায় ৭৫০০ কোটি টাকা) পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হলেও ৩০টি নির্দেশের বিপরীতে ৮৫ কোটি ডলার পরিশোধ শুরুতেই প্রতিহত করা গেছে। পাঁচটি নির্দেশের মাধ্যমে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার (প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা) ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকে স্থানান্তর করে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। আর ২ কোটি ডলার শ্রীলংকার প্যান এশিয়া ব্যাংকিং করপোরেশনে যায় এবং সেখান থেকে আটকে দেওয়া সম্ভব হয়। ফিলিপাইনে যাওয়া অর্থ চারটি ব্যাংক হিসাবে ঢুকে তা এরই মধ্যে অন্য দেশে চলে গেছে বলে সে দেশের গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরির ঘটনাটি তদন্ত করছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি নিরাপত্তায় ঘাটতি ছিল বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। ঘটনার পর বাংলাদেশ ব্যাংক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও উন্নত করার জন্য একজন বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করেছে। রাকেশ আস্তানা নামে এ বিশেষজ্ঞ এরই মধ্যে তার টিম নিয়ে কাজ শুরু করেছেন।
তদন্ত কমিটি গঠন : রিজার্ভের অর্থ চুরির বিষয়ে গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সরকার। কারা এ ঘটনায় জড়িত, কীভাবে অর্থ চুরি হয়েছে_ এসব বিষয়ে তদন্ত করে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেবে কমিটি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী এক মাসের মধ্যে কমিটি তাদের প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেবে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন_ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মো. কায়কোবাদ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব গোকুল চন্দ্র দাস। এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে আপাতত তিনজন রাখা হয়েছে।
ঘটনা জানতে চেয়েছে ৩০ দেশ : রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় বিশ্বের অনেক দেশ এর কারণ সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারের কাছে জানতে চেয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক উত্তর দেওয়া হয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একটি সূত্র বলেছে, চুরির ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর থেকে গতকাল পর্যন্ত ৩০টি দেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রকৃত ঘটনা জানতে চায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র বলেছে, সরকারের পক্ষ থেকে ঘটনার আনুষ্ঠানিক জবাব না পাওয়ায় বিদেশি রাষ্ট্রগুলো বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে আছে। তারা জানতে চাচ্ছে রিজার্ভের টাকা নিয়ে সত্যিকারভাবে বাংলাদেশে কী ঘটেছে। ফলে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।