সিএজির প্রতিবেদন

ভেজালবিরোধী অধিকাংশ আইন অকার্যকর

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

আবু কাওসার

ভেজালবিরোধী অধিকাংশ আইন বর্তমানে অকার্যকর। খাদ্যপণ্যে বিষাক্ত ফরমালিন ও কারবাইড ব্যবহারের ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক ফরমালিন ও কারবাইডের অবৈধ ব্যবহার রোধে ইতিমধ্যে সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা যথাযথভাবে কার্যকর নয়। খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনগুলো খুবই দুর্বল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রয়োগ নেই। এমন কি যেসব সরকারি সংস্থা ভেজাল প্রতিরোধে কাজ করছে তাদের মধ্যে সমন্বয় নেই। ফলে বাজার তদারকি ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভেজালপণ্য তৈরির অপরাধে শাস্তির বিধানও পর্যাপ্ত নয়। মাঠ পর্যায়ে বাজার তদারকি ঠিকমতো চলছে না। সক্ষমতা এবং অবহেলার অভাব রয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থার। এসব কারণে ভেজাল প্রতিরোধে আশানুরূপ ফল আসছে না। সরকারের অন্যতম প্রধান সংস্থা কম্পট্রোলার অডিটর জেনারেল (সিএজি) কার্যালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করা হয়েছে।
সিএজির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তদারকি ব্যবস্থা দুর্বল হলে কখনই ফরমালিন ও কারবাইডের ব্যবহার কমানো যাবে না। এ দুটি পণ্যের ব্যবহার কমিয়ে আনতে না পারলে খাদ্যে ভেজাল রোধ করা সম্ভব নয়। ফরমালিন আমদানিতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও এর যথার্থ কার্যকারিতা নেই।
সিএজির অধীনে পারফরম্যান্স অডিট অধিদপ্তর এই প্রথমবারের মতো প্রতিবেদনটি তৈরি করে। পঞ্চাশ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদনে ফরমালিন ও ক্যালসিয়াম কারবাইডের অবৈধ ব্যবহারের ফলে খাদ্যে যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে ভেজাল প্রতিরোধে যে সব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার কার্যকারিতা সম্পর্কেও মন্তব্য করা হয়েছে। এ ছাড়া ভেজাল
নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
পারফরম্যান্স অডিট দপ্তরের তিন সদস্যের এক প্রতিনিধি দল সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। প্রতিবেদনটি সিএজি মাসুদ আহমেদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য শহরের ২৮টি বাজার পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। পরিদর্শনকালে বিভিন্ন বাজার থেকে খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। এতে ফরমালিন ও কারবাইড ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। উল্লেখ্য, মাছ, মাংস, শাকসবজিসহ বিভিন্ন খাবার যাতে না পচে যায় সে জন্য ফরমালিন এবং ফলমূল পাকানোর জন্য ক্যালসিয়াম কারবাইড ব্যবহার করা হয়। ফরমালিনযুক্ত খাদ্য গ্রহণে ফুসফুস, যকৃত, কিডনিসহ নানা রোগ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে জনগণকে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে ফরমালিন ও কারবাইডের মতো বিষাক্ত দ্রব্য খাবারে না মেশায়। এ জন্য প্রচলিত আইন আরও কঠোর করে যথাযথ প্রয়োগ এবং জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা দাবি করছেন, ফরমালিন আমদানিতে কঠোর বিধিনিষেধ এবং তদারকি শক্তিশালী করার ফলে খাদ্যে ভেজাল আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। সমকালের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, খাদ্যে ফরমালিন ও কারবাইডের ব্যবহার আগের চেয়ে কিছুটা কমলেও বেশকিছু পণ্যে এখনও মেশানো হচ্ছে।
যোগাযোগ করা হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এম আবদুর রউফ সমকালকে বলেন,বাণিজ্যিকভাবে ফরমালিন আমদানির জন্য অনুমতি দেওয়া হয় না। শুধু শিল্পে ব্যবহারের জন্য শর্তসাপেক্ষে ফরমালিন আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। তিনি মনে করেন, খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ করা শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ১৫টি প্রতিষ্ঠানকে বৈধভাবে ফরমালিন আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। মেলামাইন, সিরামিক, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ফরমালিন ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর দেশে শিল্প খাতে চাহিদার তুলনায় চার গুণের বেশি ফরমালিন আমদানি হয়েছে। জানা গেছে, শিল্প খাতে ফরমালিনের বার্ষিক চাহিদা ৪০ থেকে ৫০ টন। সেখানে গত বছর ২ শতাধিক টন ফরমালিন আমদানি হয়েছে। বাড়তি ফরমালিন খাদ্যে ব্যবহার হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গ্গ্নোবাল ফুড সিকিউরিটি ইনডেক্স-২০১২-এর তথ্য অনুযায়ী, নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থায় বিশ্বের ১০৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮১তম। অপরদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। ২০১৫ সালে করা ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির এক গবেষণায় বলা হয়, দেশে খাদ্যপণ্যের ৪০ শতাংশই ভেজাল। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, খাদ্যে ভেজাল আরও বেশি হবে।
সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়, খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে ফুড সেফটি অ্যাক্ট-২০১৩ নামে নতুন একটি আইন করা হলেও তাতে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহফুজুল হক সমকালকে বলেন, প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে তারা পুরোমাত্রায় কাজ করতে পারছেন না। বিদ্যমান আইন পূর্ণাঙ্গ কার্যকর করতে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে খাদ্যে ভেজাল বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। ভারতে এ-সংক্রান্ত আইন কার্যকর করতে পাঁচ বছর সময় লেগেছে_ এ কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আমাদের দুই বছর হয়েছে। হতাশ হওয়ার কারণ নেই।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) শফিকুল ইসলাম লস্কর সমকালকে বলেন, পণ্য পরীক্ষার জন্য আমাদের নিজস্ব কোনো পরীক্ষাগার নেই। এর জন্য বিএসটিআই ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআরে) পাঠাতে হয়। এতে করে কাজের ব্যাঘাত ঘটছে। খাদ্যে ভেজাল রোধে বিদ্যমান আইনের সংশোধন করে আরও কঠোর করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক এবিএম ফারুক সমকালকে বলেন, খাদ্যে ভেজাল রোধে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধির যথাযথ প্রয়োগ ও প্রচলিত আইন সংশোধন করে শাস্তির মেয়াদ আরও বাড়াতে হবে। জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি এমন রাসায়নিক দ্রব্য আনা বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, ছোট মাছ, ফলমূল, সবজি, দুধে ফরমালিনের ব্যবহার কমেছে। তবে টেক্সটাইল খাতে ব্যবহৃত অনেক রাসায়নিক ব্যবহার হচ্ছে যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হড়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্য নামে ফরমালিন আসছে :সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফরমালিন আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপের জন্য ২০১৩ সালের মার্চে একটি আদেশ (এসআরও) করা হয়েছিল। ওই আদেশে দেওয়া বিভিন্ন শর্ত পালন করে ফরমালিন আমদানির কথা বলা হলেও তা মানা হচ্ছে না। ফলে ফরমালিন আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে ফরমালডিহাইড, মরবিগিড পলিক্সিমিথিলনসহ বিভিন্ন নামে ফরমালিন আসছে। ফরমালিন আমদানির ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও কারবাইড আমদানিতে কোনো বিধিনিষেধ নেই বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক এবিএম ফারুক বলেন, অন্য নামে কী আসছে সে সম্পর্কে সরকার জানে না। কারণ এগুলো সম্পর্কে বোঝার কোনো উপায় নেই। শনাক্ত করার মতো সক্ষমতাও নেই। ফরমালিনের নামে আসা অন্য সব রাসায়নিক পদার্থ আমদানির ক্ষেত্রে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাহমুদুর রহমান বলেন, খাদ্যে রাসায়নিকের ব্যবহার পরীক্ষার দায়িত্ব একক কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া উচিত।
প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে :সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাণিজ্য, খাদ্য, শিল্প, মৎস্য, স্বরাষ্ট্র, সিটি করপোরেশনসহ বর্তমান ১১টি মন্ত্রণালয় খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। বাস্তবতা হচ্ছে কোন সংস্থা কী কাজ করছে, কার দায়িত্ব কী সে সম্পর্কে কিছুই জানে না সংশ্লিষ্টরা। তাদের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় অবৈধ ফরমালিন ও কারবাইডের ব্যবহার রোধে বিভিন্ন সময়ে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপসমূহ কার্যকর হচ্ছে না। এতে আরও উল্লেখ করা হয়, খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে ফুড সেফটি অ্যাক্ট-২০১৩, ন্যাশনাল ফুড পলিসি-২০০৬, কনজ্যুমার্স রাইটস প্রোটেকশন অ্যাক্ট-২০০৯, ন্যাশনাল হেলথ পলিসি-২০১০, লোকাল গভর্নমেন্ট অর্ডিন্যান্স-২০০৮, বিএসটিআই অর্ডিন্যান্স ১৯৮৫সহ মোট ২৩টি আইন ও বিধি বলবৎ আছে। এগুলোর বেশিরভাগই অকার্যকর। অনেক আইনের দুর্বলতা আছে_ এ কথা উল্লেখ করে সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রযুক্তিগত সমস্যা, জনবলের অভাবে অনেক সরকারি সংস্থার পক্ষে আইন কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিএসটিআই ও মৎস্য অফিসে খাদ্যপণ্য পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগার ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। এ ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে খাদ্যপণ্য পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ ছাড়া আমদানি করা খাদ্যপণ্যে ফরমালিন ও কারবাইড শনাক্ত করতে শুল্ক স্টেশনগুলোতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষারগার নেই। সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়, ভেজাল মেশানোর অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে এমন কোনো ঘটনার নজির এখন পর্যন্ত নেই। লঘুদণ্ড ও তদারকির অভাব খাদ্যে ভেজাল বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়।
সুপারিশ :খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে সিএজির প্রতিবেদনে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে_ প্রযোজনীয় আইন ও বিধি প্রণয়ন করে তা কার্যকর করা, যে সব ক্ষেত্রে আইনের সংশোধন প্রয়োজন সে সব ক্ষেত্রে সংশোধন করা, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ দপ্তরকে আরও শক্তিশালী করা, মাঠ পর্যায়ে জেলা-উপজেলায় ভেজাল রোধে গঠিত কমিটিগুলোকে আরও সক্রিয় করে তোলা, শুল্ক স্টেশনগুলোতে আমদানি করা পণ্য পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি স্থাপন করা, দ্রুত খাদ্য আদালত গঠন ও ভেজালপণ্য নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা।
সরেজমিন বাজার পরিদর্শন :রাজধানীর কারওয়ান বাজারের আলআমিন ফল বিতানের সাজ্জাদ হোসেন সমকালকে জানান, এখন কলা পাকাতে কোনো ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার হয় না। ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। একই বাজারের দুলাল ট্রেডার্সের দুলাল হোসেন জানান, তারা ফরমালিন মেশান না। মোকামে কিংবা যেখানে খাদ্যপণ্য উৎপাদন হয় সেখানে ফরমালিন মেশানো হয়। কারওয়ান বাজারে টমেটোর আড়তদার আবুল হোসেন বলেন, কাঁচা টমেটো দ্রুত পাকানো এবং রঙ লাল করার জন্য ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। তিনি জানান, কাঁচা টমেটোতে ফরমালিন মেশালে এক মাস পর্যন্ত রাখা যায়।