খেলাপি জেনেও গ্রাহককে ঋণ দিয়েছে এনআরবিসি

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০১৭      

ওবায়দুল্লাহ রনি

জেনেশুনেই খেলাপি গ্রাহককে ঋণ দিয়েছে বেসরকারি এনআরবি কমার্শিয়াল (এনআরবিসি) ব্যাংক। কার্যক্রম শুরুর চার বছর না পেরোতেই ৭৫০ কোটি টাকার ঋণে গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। বিধিবহির্ভূত সুদ মওকুফ, বেনামে পরিচালকদের ঋণ দেওয়াসহ নানা অনিয়ম হয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মালিকানার নতুন এ ব্যাংকে। তিন প্রবাসী বাংলাদেশির নামে শেয়ার কিনেছেন অন্যরা। তারা কখনও দেশে না এলেও পর্ষদ সভায় তাদের উপস্থিত দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে এসব অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। অনিয়মের কারণে সম্প্রতি ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এনআরবিসি ব্যাংকে অনিয়মের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে প্রস্তুত করা প্রতিবেদনের আলোকে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ঋণের শ্রেণিমান বিবেচনায় তা খেলাপি করে দেওয়া হবে। অন্যদিকে, বেনামি শেয়ার ধারকরা কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে থাকলেও শেয়ার কেনার অর্থ দুবাই থেকে এসেছে। এসব শেয়ার বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী সমকালকে বলেন, এনআরবিসি ব্যাংকে অনিয়মের ধরন বা সম্পৃক্ততার বিভিন্ন পর্যায় যাচাই করা হচ্ছে। সেখানে কোন পর্যায়ে কার কী সম্পৃক্ততা রয়েছে, তা জানার পর সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। পরিচালনা পর্ষদের কেউ জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আবার এমডি দায়ী হলেও অগ্রণী বা বেসিক ব্যাংকের মতো পরিণতি ভোগ করতে হবে। অনিয়ম করে কেউ পার পাবে না।
সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য নিতে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ফরাছত আলী ও এমডি দেওয়ান মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা করা হয়। বক্তব্য নিতে প্রধান কার্যালয়ে গেলে ব্যস্ততা দেখিয়ে এমডি কথা বলেননি। এর আগে ও পরে কয়েক দফা টেলিফোন ও এসএমএস করেও তাদের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অনেক চেষ্টার পর গত ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় এমডি টেলিফোন রিসিভ করলে তার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উত্থাপিত সুনির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয় তুলে ধরে এ বিষয়ে বক্তব্য
চাওয়া হয়। তিনি বলেন, অফিসের বাইরে থাকায় এসব বিষয়ে কথা বলা সম্ভব নয়। পরে সাক্ষাতের সময় চাইলে তিনি তাতেও রাজি হননি। এর পর আবার এমডি ও চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগ
থেকে এ প্রতিবেদককে টেলিফোন করে কারণ জানতে চাওয়া হয়। কারণ বলার পর আর সাড়া মেলেনি।
খেলাপি ঋণ অধিগ্রহণ, দফায় দফায় মেয়াদ বৃদ্ধি :মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ধানমণ্ডি শাখার গ্রাহক গোল্ডেন স্টার ইন্ডাস্ট্রিজের পাঁচ কোটি ৪০ লাখ টাকা ঋণের মধ্যে আড়াই কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয় ২০১৪ সালের মার্চে। জেনেশুনে এই ঋণ অধিগ্রহণসহ প্রথমে পাঁচ কোটি ৬৯ লাখ টাকার ঋণ দেয় এনআরবিসির প্রিন্সিপাল শাখা। দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে গত বছরের জানুয়ারিতে ঋণসীমা বাড়িয়ে সাড়ে আট কোটি টাকা করা হয়। এর বাইরে গৃহনির্মাণ খাতে গ্রাহককে দেওয়া হয়েছে আরও চার কোটি টাকার ঋণ। ২০১৫ সালের এপ্রিলে এক্সিম ব্যাংকের গ্রাহক প্রতিষ্ঠান ফাস্ট করপোরেশনের আট কোটি ৭৭ লাখ টাকার ঋণ অধিগ্রহণসহ প্রতিষ্ঠানটিকে ২০ কোটি টাকার ঋণ দেয় এনআরবিসি। প্রতিষ্ঠানটির পানির নিচে থাকা জমির মূল্যায়নসহ মাত্র সাত কোটি ৮২ লাখ টাকা সমমূল্যের জামানতের বিপরীতে এ ঋণ দেওয়া হয়। ওই বছরের ডিসেম্বরে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কিস্তি না দেওয়ার পরও তা খেলাপি না করে বেআইনিভাবে গত বছরের ১৫ জুলাই পর্যন্ত ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে দেন এমডি।
নামে-বেনামে দুই পরিচালকের ২৫ কোটি টাকার ঋণ :ব্যাংকের পরিচালক সৈয়দ মুনসেফ আলীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মাল্টিপ্ল্যান ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের নামে রাজধানীর পশ্চিম আগারগাঁওয়ে দুটি ভবন নির্মাণের জন্য ২০১৩ সালের আগস্টে ১৫ কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুর করে ব্যাংক। এর আট মাসের মাথায় ঋণটি ২০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। ২০১৪ সালের এপ্রিলে তা খেলাপি হয়ে যায়। পরে কোনো ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই এমডির একক ক্ষমতায় ঋণের মেয়াদ বাড়ানো হয়। গত জুনে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখার পাওনা দাঁড়িয়েছে ২২ কোটি ৩২ লাখ টাকা। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নে একটি এগ্রো ফিশারিজ প্রকল্পের তিন কোটি ৫০ লাখ টাকার আবেদন আসে। কোনো যাচাই-বাছাই না করেই মাত্র দু'দিনের মাথায় প্রতিষ্ঠানটিকে তিন কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। এই ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক আদনান ইমাম। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করে পরিচালকের বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দেশের বাইরে থাকায় ব্যাংকের এ দুই পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
দুবাই থেকে আনা অর্থে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীর শেয়ার :বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে এসেছে, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে তিনজনের নামে ৬৩ কোটি ৭১ লাখ টাকার বেনামি শেয়ার রয়েছে। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের গুলশান শাখায় খোলা বৈদেশিক মুদ্রা (এফসি) হিসাবের মাধ্যমে প্রত্যেকের অর্থ দেশে আসে। তাদের মধ্যে কানাডা প্রবাসী কামরুন নাহার সাখী ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এ বি এম আবদুল মান্নানের অর্থ এসেছে দুবাই থেকে, যার প্রকৃত মালিক মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চেয়ারম্যান শহীদুল আহসান বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, বেনামি অন্য শেয়ার ধারক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মো. আমির হোসেনের শেয়ারের সব টাকা যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা থেকে পাঠান রতনপুর গ্রুপের এমডি মাকসুদুর রহমান। শহীদুল আহসান ও মাকসুদুর রহমান এসব শেয়ারের বিপরীতে লভ্যাংশ নিয়ে আসছেন। ব্যাংকটিতে সাখীর নামে ১৩ কোটি ৩০ লাখ, মান্নানের নামে ৩০ কোটি ৪১ লাখ ও আমির হোসেনের নামে ২০ কোটি টাকার শেয়ার রয়েছে।
এ বিষয়ে রতনপুর গ্রুপের এমডি মাকসুদুর রহমান সমকালকে বলেন, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে আমির হোসেনের নামে শেয়ার কেনার তথ্য শতভাগ মিথ্যা। ওই নামের কাউকে তিনি চেনেনই না। তার দাবি, ব্যাংকটি থেকে যেসব পরিচালককে বের করে দেওয়া হয়েছে তারাই এমনটি ছড়াচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একেবারে ভুয়া একটি বিষয়কে এভাবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। শেয়ার কিনলে সেটা তো তার নামেই থাকত।
বক্তব্য নিতে শহীদুল আহসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে সময় দেবেন বলে জানান। পরে বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা করা হলেও তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তবে গত ৩০ ডিসেম্বর এ বিষয়ে সমকালে অন্য একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর তিনি দাবি করেন, তার নামে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে কোনো শেয়ার নেই। কামরুন নাহার সাখী ও এ বি এম আবদুল মান্নান তার পরিবারের কেউ নন। তাদের শেয়ারের বিপরীতে লভ্যাংশ নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
৩০১ কোটি টাকার অনৈতিক ঋণ-সুবিধা :আইন অনুযায়ী ব্যাংকের পর্ষদ সভায় পরিচালক ছাড়া অন্য কেউ উপস্থিত থাকতে পারেন না। শহীদুল আহসান ও তার মালিকানার এজি গ্রুপের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সভায় উপস্থিত হয়ে নামে-বেনামে অনৈতিকভাবে ৩০১ কোটি ৩৫ লাখ টাকার ঋণসীমা অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন, যা ব্যাংকটির মোট মূলধনের ৫৬ শতাংশ। এর মধ্যে প্রিন্সিপাল শাখা থেকে মেসার্স এজি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের নামে ১৮৩ কোটি ৩৫ লাখ ও বেগমগঞ্জ ফিড মিলসের নামে নোয়াখালীর চন্দ্রগঞ্জ শাখা থেকে ১১৮ কোটি টাকার সীমা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের একজন বিকল্প পরিচালকের আপত্তির পরও কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই না করেই ঋণ অনুমোদন করা হয়। এ বিষয়ে শহীদুল আহসানের বক্তব্য হলো- এনআরবিসির 'কথিত গ্রাহক' বেগমগঞ্জ ফিড মিলসের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তার মালিকানার এজি এগ্রো এই ব্যাংকের গ্রাহক। প্রতিষ্ঠানটিকে উপযুক্ত জামানত নিয়ে ৬৫ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। ঋণ মঞ্জুরের সময় তিনি কখনও এনআরবিসিকে প্রভাবিত করেননি।
ব্যাংকটির বেনামি শেয়ার ধারক আবদুল মান্নানের বিকল্প পরিচালক শহীদুল আহসানের মালিকানাধীন আহসান গ্রুপের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সৈয়দ গোলাম ফারুক। পরিচালক হওয়ার আগেই বেআইনিভাবে পর্ষদের চারটি সভায় উপস্থিত ছিলেন তিনি। আবার গত বছরের ১৮ এপ্রিল ব্যাংকের এজিএমে কামরুন নাহার সাখীর বিকল্প হিসেবে শহীদুল আহসান নিজেই উপস্থিত হন। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এ থেকে বোঝা যায়, এনআরবিসির পর্ষদ সভায় শহীদুল আহসানের প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি সুস্পষ্ট।
আরও ৩২৬ কোটি টাকার অনিয়ম :মেসার্স গুল্ডবার্গ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ২৪ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে ব্যাংকের ধানমণ্ডি শাখা। এর মধ্যে ১৮ কোটি টাকার ফান্ডেড ঋণের বিপরীতে মাত্র ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার পণ্য মজুদ রয়েছে। ব্যাংকের এমডি একক ক্ষমতাবলে অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহককে অনৈতিক সুবিধা দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের নামে ব্যাংকের প্রধান শাখায় ২০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। ২০১৫ সালের মার্চে নতুন করে এই শাখায় আরও ৪০ কোটি টাকার ঋণ আবেদন আসে। ব্যাংকের প্রধান শাখা ২০ কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুরের সুপারিশ করে প্রধান কার্যালয়ে পাঠালে এই শাখা থেকে পুরো ঋণ না দিয়ে ধানমণ্ডি শাখা থেকে ১০ কোটি টাকা বিতরণ করতে বলে প্রধান কার্যালয়। শাখার সুপারিশ ছাড়াই বিভিন্ন সময়ে এই গ্রাহকের সুদ কমানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন এমডি। গুলশান শাখার গ্রাহক সালাউদ্দিন চৌধুরী, এমএ আজিজ চৌধুরী ও তারেক চৌধুরীর গৃহনির্মাণ খাতের জন্য ৩৪ কোটি টাকার ঋণ আবেদন আসে। আবেদনের কোথাও স্টাইলিশ গার্মেন্টের নাম না থাকলেও পর্ষদ থেকে এ প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণ অনুমোদন করা হয়। অন্যদিকে, সহায়ক জামানত না নিয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ২৫৮ কোটি টাকার ঋণসীমা অনুমোদন করা হয়েছে।