চার সিটি করপোরেশনে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচিত মেয়ররা গত তিন বছরে আটবার সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। সর্বোচ্চ তিনবার বরখাস্ত হয়েছেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র এম এ মান্নান। উচ্চ আদালতের নির্দেশে গত ১৮ জুন পদ ফিরে পাওয়ার ১৮ দিনের মাথায় গত বৃহস্পতিবার একটি দুর্নীতি মামলায় আদালতে চার্জশিট গৃহীত হওয়ায় আবারও বরখাস্ত হলেন। ২০১৩ সালের ১১ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর গত চার বছরে ১৯ মাস মেয়রের চেয়ারে বসতে পেরেছেন তিনি। ২২ মাস কেটেছে জেলে।
চার বছর আগে পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হয়ে হৈচৈ ফেলে দিলেও বস্তুত তাদের চারজন কাজ
করারই সুযোগ পাননি। রাজপথে সন্ত্রাস, রাজনৈতিক হত্যা ও দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগে মামলার পর মামলায় তারা পর্যুদস্ত। কার্যকালের অনেকটা সময় কারাগারে এবং অনেকটা সময় সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় কেটেছে। আবার সরকারের আর্থিক বরাদ্দের ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বলে তাদের অভিযোগ।
আগামী বছর শেষ হবে তাদের মেয়াদ। এই এক বছর নির্বিঘ্নে পার করতে পারবেন কি-না সেই দুশ্চিন্তাও তাদের। মেয়ররা কাজ করতে না পারায় ওই নগরগুলোর ব্যবস্থাপনায়ও ভগ্নদশা। অর্থাৎ ভোটদাতা নাগরিকরাই বঞ্চিত।
২০১৩ সালের ১৫ জুন রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়। ৬ জুলাই হয় গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচন। এই পাঁচটিতে আওয়ামী লীগের সমর্থিত ক্ষমতাসীন মেয়রসহ নামজাদা প্রার্থীদের ধরাশায়ী করে জয়ী হন বিএনপির যথাক্রমে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, মো. মনিরুজ্জামান মনি, আহসান হাবিব কামাল, আরিফুল হক চৌধুরী ও এম এ মান্নান।
কোনো জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) গৃহীত হলে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের ১২(১) ধারায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারে সরকার। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সমর্থনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে এই আইন প্রয়োগ করা হয়। উচ্চ আদালতের নির্দেশে পদ ফিরে পাওয়ার আট মিনিটের মাথায় ফের বরখাস্তের নজির রয়েছে।
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় স্থানীয় সরকার আইন প্রণয়ন কমিটির সদস্য ছিলেন 'সুশাসনের জন্য নাগরিক' (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি সমকালকে বলেন, 'কল্পনাতেও ছিল না, ১২(১) ধারার এমন অপব্যবহার হবে।' তিনি জানান, স্থানীয় সরকার কমিশন গঠনে আইন করা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে আইনটি সংসদে না তোলায় তামাদি হয়ে যায়। স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের রক্ষাকবচ বাতিল হয়ে যায়।
চারের মধ্যে আড়াই :মেয়রের চেয়ারে বসে দায়িত্ব পালন করার চেয়ে কারাগারেই বেশি দিন কেটেছে গাজীপুরের মেয়র এম এ মান্নানের। তার বিরুদ্ধে ২৯টি মামলা দায়ের হয়েছে। ২০১৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নাশকতার মামলায় গ্রেফতার হন। ১২ মাস ১৮ দিন হাজতবাস করে পরের বছরের ২ মার্চ জামিনে মুক্তি পান। ৪২ দিনের মাথায় ২০১৬ সালের ১৫ এপ্রিল আবারও গ্রেফতার। ৮ মাস ২২ দিন কারাবন্দি থাকার পর গত ৭ জানুয়ারি জামিনে মুক্তি পান।
মেয়র মান্নান কারাবন্দি থাকা অবস্থায় ২০১৫ সালের ১৯ আগস্ট প্রথমবারের মতো বরখাস্ত হন। ২৮ মাস পর উচ্চ আদালতের রায়ে মেয়র পদ ফিরে পেয়েছিলেন। কিন্তু চেয়ারে বসতে না বসতেই তাকে গত ১৮ এপ্রিল দ্বিতীয়বারের মতো বরখাস্ত করা হয়। ওই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে গেলে তার পক্ষে আদেশ পান। গত ১৮ জুন আবার মেয়রের চেয়ারে বসেন তিনি। সিটি করপোরেশনের ত্রাণের অর্থ আত্মসাতের মামলায় আবারও গত বৃহস্পতিবার, কাকতালীয়ভাবে চার বছর আগে তার নির্বাচিত হওয়ার তারিখ ৬ জুলাই বরখাস্ত হয়েছেন।
গাজীপুরের সর্বত্রই আবর্জনার স্তূপ। সদ্য বরখাস্ত হাওয়া মেয়রও স্বীকার করলেন নগরীর পূতিগন্ধময় অবস্থার কথা। তিনি দাবি করেন, কাজ করার সুযোগই পাননি। নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই পদ রক্ষায় তাকে দৌড়াতে হচ্ছে আদালতের বারান্দায় বারান্দায়। অধ্যাপক মান্নান বলেন, 'আমাকে জেলে আটকে রেখে সিটি করপোরেশনের টাকা বারোভূতে লুটেপুটে খেয়েছে। প্রতিবাদ করারও তো কেউ নেই।'
অফিস ছেড়ে হাজতবাস :সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে অফিসের চেয়ে বেশি দিন হাজতে কাটাতে হয়েছে। ২০১৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। পরের বছরের ৩০ ডিসেম্বর সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। অসুস্থ মায়ের পাশে থাকতে ২০১৬ সালের ২৮ মার্চ উচ্চ আদালতের নির্দেশে ১৫ দিনের জন্য জামিনে বেরিয়ে আবার কারাগারে। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি সব মামলায় জামিনে মুক্তি পান তিনি। দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ৪৫ মাসের মধ্যে ২৩ মাস ১৯ দিন হাজত বাস করতে হয়েছে তাকে।
কারাগারে যাওয়ার পর, ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো বরখাস্ত হন আরিফুল হক। ২৭ মাস পর গত ২ এপ্রিল আদালতের রায়ে পদ ফিরে পান। চেয়ারে বসার দুই ঘণ্টার মধ্যে ফের বরখাস্ত হন। দু'দিন পরে আদালতের রায়ে আবারও পদ ফিরে পান।
মেয়র আরিফুল বলেন, নগরের উন্নয়নের চেয়ে চেয়ার সামলাতেই ব্যস্ত থাকতে হয়েছে তাকে। কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি সিলেটের। অনেক পরিকল্পনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এ ছাড়া পদমর্যাদা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকায় সরকারের বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে কাজ করতেও সমস্যা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের সমর্থনে জয়ী মেয়র বদরউদ্দিন কামরান প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা পেয়েছেন। কিন্তু এখন মেয়রের পদমর্যাদা নির্ধারিত নেই।
উল্লেখ করা যায়, সিটি করপোরেশনগুলোর বর্তমান মেয়রদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সমর্থনে নির্বাচিত চট্টগ্রামের আ জ ম নাছির উদ্দীন ছাড়া সবাই মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রীর পদমর্যাদা ভোগ করছেন। কিন্তু বিএনপির মেয়ররা তা পাননি।
নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্ব পালন করতে না পারার সমস্যা সম্পর্কে সিলেটের মেয়র সমকালকে বলেন, গাভিয়ার খালসহ অন্যান্য খাল উদ্ধারের ফলে সিলেটে জলাবদ্ধতা কমেছিল। কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে না পারায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। যানজট নিরসনে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ছোট ছোট ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন। করতে পারেননি। প্রবাসীদের বিনিয়োগে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেটিও আলোর মুখ দেখেনি।
চেয়ারে বসাই হয় না :দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ৪৫ মাসের মধ্যে ২৩ মাসই বরখাস্ত অবস্থায় ছিলেন রাজশাহীর মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। কারাবন্দি ছিলেন এক বছরের বেশি সময়। ২০১৫ সালের ৭ মে প্রথমবার বরখাস্ত হন। গত ২ এপ্রিল আদালতের রায়ে পদ ফিরে পেয়ে দায়িত্ব গ্রহণের আট মিনিটের মাথায় নাটকীয়ভাবে দ্বিতীয়বারের মতো বরখাস্ত হন। দু'দিন পর আবার আদালতের রায়ে পদ ফিরে পেলেও মেয়র বুলবুল অভিযোগ করেন, সরকারের সহযোগিতা পাচ্ছেন না। আগের মেয়র নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের সময় রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) বছরে ৩০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ (অতিরিক্ত বরাদ্দ) পেত। এখন তা পাচ্ছে না। বুলবুল বরখাস্ত থাকা অবস্থায় মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত নির্বাচিত কাউন্সিলর নিযাম উল আযামী। তার সময়েও বরাদ্দ আসে ৩২ কোটি টাকা। বুলবুল দায়িত্ব নেওয়ার পর তা নেমে এসেছে ১২ কোটি টাকায়।
করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক জানিয়েছেন, নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডেই রাস্তা এখন ভাঙাচোরা।
স্বস্তি নেই :খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) মেয়র ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান মনি অপর তিন মেয়রের তুলনায় বেশি দিন দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন। হরতালে গাড়ি পোড়ানোর মামলায় তার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র গৃহীত হলে ২০১৫ সালের ২ নভেম্বর বরখাস্ত হন। ওই মামলায় ২৮ দিন হাজত খাটেন। উচ্চ আদালতের রায়ে গত বছরের ২১ নভেম্বর মেয়রের দায়িত্ব ফিরে পান।
তবে আর্থিক চাপে স্বস্তি নেই বলে দাবি করেন খুলনার মেয়র। তিনি জানান, গত প্রায় চার বছরে নগরীর উন্নয়নে ৫০২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি প্রকল্পে অনুমোদন দিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে একটিতে ভারত সরকারের অনুদান ১৬ কোটি টাকা এবং আরেকটিতে জার্মান সরকার দিচ্ছে ৪৫ কোটি টাকা। সরকারি বরাদ্দ মেলেনি।
তিনি দুঃখ করে বলেন, নির্বাচনের আগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সিটি হল, পার্ক, সুইমিং পুল ও মার্কেট নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা পূরণ করতে পারেননি বরাদ্দ কমে যাওয়ার কারণে।
'মিলেমিশে' থাকা :২০১৩-এ বিজয়ী বিএনপির পাঁচ মেয়রের মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম বরিশালের মেয়র আহসান হাবিব কামাল। তাকে বরখাস্ত হতে হয়নি, জেলে যেতে হয়নি, মামলাও নেই। এখন তিনি বিএনপির কোনো পদেও নেই। এ মেয়র সরকারি দলের সঙ্গে 'মিলেমিশে' থেকে 'রক্ষা' পেয়েছেন বলে দাবি করে বিএনপির নেতাকর্মীরাও তাকে অবজ্ঞা করেন।
তবে মেয়র বলেছেন, তাকে পদে পদে চাপ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। তিনিও শিকার হয়েছেন উন্নয়ন বৈষম্যের।
আহসান হাবিব কামাল সমকালকে বলেন, আগের মেয়র শওকত হোসেন হিরন তিন মাস পর পর ৮-১০ কোটি টাকা করে থোক বরাদ্দ পেতেন। তার আমলে থোক বরাদ্দ নেমে এসেছে দু'-তিন কোটি টাকায়। আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়রের সময় উন্নয়ন প্রকল্পের বিপরীতে ২০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ এসেছিল। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ পেয়েছেন মাত্র পাঁচ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সাহায্য করেছেন বরিশাল ব্যুরোপ্রধান পুলক চ্যাটার্জি, সিলেটের চয়ন চৌধুরী, রাজশাহীর সৌরভ হাবিব, খুলনার মামুন রেজা ও গাজীপুরের ইজাজ আহমেদ মিলন

মন্তব্য করুন