নাইকোর সঙ্গে চুক্তি অবৈধ সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৭

সমকাল প্রতিবেদক

এক দশকেরও আগে কানাডীয় তেল-গ্যাস কোম্পানি নাইকোর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের করা দুটি চুক্তি অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ওই দুই চুক্তির অধীনে নাইকো বাংলাদেশের সব সম্পত্তি এবং ৯ নম্বর ব্লকে থাকা নাইকোর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে জব্দ করার নির্দেশ দেন আদালত। বাপেক্সের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তেল-গ্যাস উৎপাদন এবং পেট্রোবাংলার সঙ্গে ওই গ্যাস ক্রয় চুক্তি করা হয়েছিল।
জনস্বার্থে করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর জারি করা রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে অবৈধ চুক্তির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশ দেন আদালত।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম ওই দুই চুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত বছরের মে মাসে জনস্বার্থে এই রিট করেছিলেন।
রায়ে আদালত বলেছেন, সুনামগঞ্জের টেংরাটিলায় নাইকোর গ্যাসক্ষেত্রে ২০০৫ সালের বিস্ফোরণের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিম্ন আদালতে বিচারাধীন দুটি মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নাইকোকে কোনো অর্থ পরিশোধ করা যাবে না।
অ্যাটর্নি জেনারেল :রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, নাইকোর সঙ্গে বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার করা দুটি চুক্তি অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। একই
সঙ্গে বাংলাদেশে থাকা নাইকোর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, দুর্নীতির মাধ্যমে চুক্তি করে দেশের অনেক ক্ষতি করা হয়েছে। এখন জনগণের পক্ষেই রায় হয়েছে। রায়ের মাধ্যমে জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো। মাহবুবে আলম বলেন, ওই সময় সরকারের কিছু দুর্নীতিবাজ লোক অবৈধভাবে নাইকোকে এ কাজ দিয়েছিল। এ অবৈধ চুক্তির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন আদালত। রিটকারীর আইনজীবী ব্যারিস্টার তানজিব-উল আলমও জানান, এই অবৈধ চুক্তির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
চুক্তির সঙ্গে জড়িত যারা :নাইকোর সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়া জড়িত এমন ২৬ জনের একটি তালিকা গত বছরের জুন মাসে আন্তর্জাতিক আদালতে (ইকসিড) উপস্থাপন করে বাংলাদেশ সরকার। তালিকায় রয়েছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ওই সময়ের আইনমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ, সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী একেএম মোশাররফ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব কামাল সিদ্দিকী, সাবেক জ্বালানি সচিব খন্দকার শহীদুল ইসলাম, নাইকো রিসোর্সেস (বাংলাদেশ) লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট কাশেম শরিফ, ভাইস প্রেসিডেন্ট পিটার জে মার্সিয়ের, ব্রায়ান জে অ্যাডলফ, জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক অমিত গয়াল, সৈয়দ আর কবিরসহ প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়, জ্বালানি মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের সাবেক কর্মকর্তারা।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সাংবাদিকদের বলেন, রায়ের সত্যায়িত কপি হাতে পেলে সরকার আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে। বাংলাদেশ ও কানাডায় নাইকোর সম্পদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে সেগুলো জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, দুর্নীতির মাধ্যমে চুক্তি সম্পাদন সম্পর্কিত বাংলাদেশের দায়ের করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক আদালতে (ইকসিডে) নাইকোর করা মামলাগুলো স্থগিত রয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগের শুনানি শেষ। এখন তারা রায়ের অপেক্ষায় আছেন। প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, হাইকোর্টের রায়ের কপিটি এখন আন্তর্জাতিক আদালত ইকসিডে পাঠানো হবে। তিনি আশা করছেন ইকসিডের রায়ও বাংলাদেশের পক্ষে আসবে।
বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশে গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহের জন্য ২০০৩ ও ২০০৬ সালে নাইকোর সঙ্গে দুটি চুক্তি করে বাপেক্স ও পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে একটি ছিল বাপেক্সের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বের (জয়েন্ট ভেনচার) চুক্তি। অন্যটি ছিল গ্যাস সরবরাহ ও কেনাবেচার জন্য পেট্রোবাংলার সঙ্গে।
অধ্যাপক শামসুল আলমের রিটের ওপর শুনানি শেষে গত বছরের ৯ মে চুক্তির কার্যকারিতা স্থগিত করে দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ওই চুক্তি কেন বাতিল করা হবে না_ তা জানতে চেয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ অন্যদের প্রতি রুল জারি করেন আদালত। ওই রুলের ওপর উভয় পক্ষের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গতকাল রায় দেন হাইকোর্ট। আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার তানজীব-উল আলম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেসুর রহমান। অন্যদিকে নাইকোর পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান খান। আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের আইনজীবী ব্যারিস্টার মঈন গণিও উপস্থিত ছিলেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, এটা প্রতীয়মান হয় যে, নাইকো দুর্নীতির মাধ্যমে ২০০৩ সালে যৌথ অংশীদারিত্ব এবং গ্যাস ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি করে। এ কাজে নাইকো বাংলাদেশে তাদের তৎকালীন এজেন্ট কাসেম শরীফকে চার মিলিয়ন ডলার দেওয়ার একটি চুক্তি করেছিল। পরে কাসেম শরীফকে নাইকো বাংলাদেশের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, ওই কাজ পাওয়ার জন্য বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী একেএম মোশাররফ হোসেনকে উৎকোচ দেওয়া হয়েছিল। যদিও নাইকো বলেছে যে, উৎকোচ নয়, উপহার হিসেবে তারা তা দিয়েছিল। কিন্তু এ ধরনের উপহারসামগ্রী দেওয়া বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
পরে আইনজীবী মঈন গণি সাংবাদিকদের বলেন, এটি স্বীকৃত যে দুর্নীতি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওই দুটি চুক্তি করেছিল নাইকো। ওই সময় এ কাজে নাইকোর সাবেক এজেন্ট কাসেম শরীফের সঙ্গে নাইকোর চার মিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়েছিল। নাইকো একজন মন্ত্রীকে ঘুষও দিয়েছিল।
রিটে বলা হয়, ২০০৩ ও ২০০৬ সালের নাইকোর সঙ্গে বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার চুক্তি যথাযথভাবে হয়নি, দুর্নীতির মাধ্যমে হয়েছে। এ ছাড়া ২০০৫ সালের ছাতক গ্যাসফিল্ডে যে বিস্ফোরণ বা ব্লো-আউট হয়েছিল এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাংলাদেশে থাকা নাইকোর সব সম্পত্তি জব্দের জন্যও আবেদন করা হয়।
প্রেক্ষাপট :কানাডীয় কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেস ২০০৩ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাপেক্সকে সঙ্গে নিয়ে ফেনী ও ছাতকে গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের দায়িত্ব পায়। ওই দুই গ্যাসক্ষেত্রে নাইকোর ৮০ শতাংশ এবং বাপেক্সের ২০ শতাংশ মালিকানা ছিল। এ ঘটনার আগে থেকেই নাইকো ফেনী গ্যাসক্ষেত্র থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করে আসছিল। কিন্তু নাইকোর অদক্ষতা ও অবহেলার কারণে সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন দুই দফা গ্যাস বিস্ফোরণ হলে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে যায় এবং পরিবেশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
ওই ব্লো-আউটের কারণে নাইকোকে দায়ী করে আদালতে যায় পেট্রোবাংলা। সেই মামলায় ৭৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়। নাইকো কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকার করে। এ সময় নিম্ন আদালত ফেনী গ্যাসক্ষেত্র থেকে নাইকোর সরবরাহ করা গ্যাসের দাম পরিশোধ করা বন্ধ করে দিতে নির্দেশ দেন। ওই অর্থ পরিশোধের দাবি নিয়ে নাইকো আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মামলা করলে ২০১৪ সালে নাইকোর পক্ষে রায় দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, নাইকোর পাওনা ২১৬ কোটি টাকা বাংলাদেশকে সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।
এরপর ২০১৬ সালের ২৫ মার্চ ইকসিডে চুক্তি সম্পাদনে নাইকোর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনে বাংলাদেশ। দাবির সপক্ষে তারা কানাডার আদালতে নাইকোর বিরুদ্ধে সেদেশের করা সরকারের মামলার নথিপত্র সংগ্রহ করে, যাতে প্রমাণিত হয়, এ গ্যাসক্ষেত্রের ইজারা পেতে কোম্পানিটি দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছিল। ইকসিডের চাহিদা মোতাবেক নাইকো-বাপেক্স যৌথ উদ্যোগ (জেভিএ) ও গ্যাস ক্রয় চুক্তি প্রক্রিয়ায় জড়িত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদসহ ২৬ জনের নামের তালিকা আন্তর্জাতিক আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
দুর্নীতির মাধ্যমে নাইকোকে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগে সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২০০৭ সালে একটি মামলা করে দুদক। ওই মামলা বর্তমানে ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে অভিযোগ গঠনের শুনানি পর্যায়ে রয়েছে।