বিতর্কিত বিচারপতি জয়নুলের পক্ষ নেন সুপ্রিম কোর্ট

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৭

সমকাল প্রতিবেদক

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনের দুর্নীতির তদন্ত না করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) চিঠি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে_ 'বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে দুদকের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা সমীচীন হবে না।' সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের এ ভূমিকায় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অবশ্য দুদকের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ খুরশীদ আলম খান সমকালকে বলেন, 'যত বাধাই আসুক; বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে তদন্ত হবে এবং তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর অবশ্যই পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।' দুদক কোনোভাবেই থেমে থাকবে না। সরকারি সফরে দেশের বাইরে থাকা দুদক চেয়ারম্যান তাদেরকে এমন নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
বিচারপতি জয়নুল আবেদীন ২০০৪ সালে বহুল আলোচিত ২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলা মামলার এক সদস্যবিশিষ্ট বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি ওই ঘটনায় বিতর্কিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা গেছে, দুর্নীতির অভিযোগে গত ২ মার্চ বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য তথ্য চেয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনকে একটি চিঠি দেয় দুদক। পরে ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অরুণাভ চক্রবর্তী স্বাক্ষরিত একটি চিঠি
দুদকে পাঠানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়_ 'বিচারপতি জয়নুল আবেদীন অনেক মামলায় রায় প্রদান করেছেন। অনেক ফৌজদারি মামলায় তার প্রদত্ত রায়ে অনেক আসামির ফাঁসিও কার্যকর করা হয়েছে। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুসারে বিচারপতি কর্তৃক প্রদত্ত রায় সবার জন্য বাধ্যতামূলক। এ পরিস্থিতিতে আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে বিচারক হিসেবে তার দেওয়া রায়গুলো জনমনে প্রশ্নবিদ্ধ হবে ও জনমনে বিভ্রান্তির উদ্রেক ঘটাবে। এ অবস্থায় বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে দুদকের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা সমীচীন হবে না।'
আইনজ্ঞরা বলছেন, আদালতের আদেশের বাইরে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট যে ভাষায় চিঠি ইস্যু করেছেন, তা লজ্জাজনক। সাবেক রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বর্তমান সরকারের অনেক শীর্ষ মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও আদালতে দুর্নীতির মামলা চলছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলাগুলো দুদকই তদন্ত করেছে। এ বিষয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক সমকালকে বলেন, 'আইনের চোখে সবাই সমান। যে কোনো অভিযোগ বিষয়েই দুদক তদন্ত করতে পারবে_ দুদক আইনে সেটাই বলা আছে। এ ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে পুলিশও যে কোনো বিষয়ে তদন্ত করতে পারে। দুদক বা পুলিশকে কোনো ধরনের তদন্তে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা আইন কাউকেই দেয়নি।' সুপ্রিম কোর্টের চিঠিকে 'ফেইল্যুর দ্য রুল অব ল' বলেও মন্তব্য করেন সাবেক এই প্রধান বিচারপতি।
বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক সমকালকে বলেন, 'সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুসারে পদে থাকা অবস্থায় শুধু রাষ্ট্রপতিকে যে কোনো আইনগত প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের আর কোনো ব্যক্তি আইনের ঊধর্ে্ব নন। অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার বা বিচারপতি যিনিই হোন; দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তার বিরুদ্ধে দুদক বা এখতিয়ারসম্পন্ন যে কোনো প্রতিষ্ঠান তদন্তসহ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। এর পরও সুপ্রিম কোর্ট থেকে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে, তাতে আমি হতভম্ব না হয়ে পারছি না।'
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, 'জয়নুল আবেদীন একা রায় দেননি; বেঞ্চে আরও বিচারপতি ছিলেন। আর দুর্নীতি ও বিচার করা দুটো ভিন্ন বিষয়। দুর্নীতি যে-ই করুক, তাকে তদন্ত ও বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। সুুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন কীভাবে এ ধরনের চিঠি দিয়েছেন, তা বোধগম্য নয়।'
কে এই জয়নুল আবেদীন :১৯৯১ সালে হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান জয়নুল আবেদীন। তিনি ২০০৯ সালে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে অবসরে যান। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় তাকে চেয়ারম্যান করে এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। পরে বিচারপতি জয়নুল আবেদীন এ ঘটনায় বহুল আলোচিত ১৬২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেনেড হামলার সঙ্গে একটি শক্তিশালী বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে কোনো গোয়েন্দা সংস্থার নাম বলা হয়নি। পরে জজ মিয়া নাটকসহ বিভিন্ন কারণে বিতর্কিত ওই প্রতিবেদনটির সত্যতা প্রমাণিত হয়নি। বর্তমানে ঢাকার আদালতে এ ঘটনায় করা মামলার বিচার কাজ চলছে।
এদিকে অবসরে যাওয়ার পর ২০১০ সালে ফের আলোচনায় আসেন এই বিচারপতি। ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল তিনি রাজধানীর শাহবাগ থানায় তার ব্যক্তিগত সহকারী লোকমান হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় লোকমানের বিরুদ্ধে বাদীর (বিচারপতি) স্বাক্ষর জাল করে সোনালী ব্যাংকের সুপ্রিম কোর্ট শাখা থেকে ৬৯ লাখ ৭৩ হাজার ৮৬৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়। জানা গেছে, ওই মামলার সূত্র ধরে বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের সম্পদের উৎস অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। প্রাথমিক তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ পাচারসহ নামে-বেনামে অর্থ ও সম্পদের তথ্য পাওয়ার পর ২০১০ সালের ১৮ জুলাই তাকে আয়-ব্যয়ের তথ্য জানাতে নোটিশ দেয় দুদক। পরে ওই নোটিশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। একই বছরের ২৫ জুলাই হাইকোর্ট রিটটি খারিজ করে দেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনকে চিঠি দেয় দুদক।