রাজধানীতে খাল দখল ৪

জিরানীর বুকে বহুতল ভবন, টংঘরের সারি

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

রাজীব নূর ও অমিতোষ পাল

জিরানীর বুকে বহুতল ভবন, টংঘরের সারি

জিরানী খালের ওপর বহুতল ভবন - মাহবুব হোসেন নবীন

উচ্ছেদের পর কেটে গেছে এক বছরেরও বেশি সময়। এখনও খালের মধ্যেই রয়ে গেছে ইট, রডসহ সব উচ্ছিষ্ট। এ সময়ের মধ্যে নতুন করে দখল হয়েছে খালপাড় ও খালের জমি। জিরানীর বুকে উঠেছে বহুতল ভবন ও টংঘরের সারি।

নন্দীপাড়া এলাকায় খালটির জমি দখল করে একটি মার্কেট করা হয়েছিল এরশাদ সরকারের আমলে, আশির দশকের শেষ দিকে। কাগজ-কলমে জেলা পরিষদ মার্কেট নামে পরিচিত হলেও স্থানীয় লোকজন এটিকে এরশাদ মার্কেট বলে ডাকত। গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি অবৈধ এ মার্কেটটি উচ্ছেদ করা হয়েছে। মার্কেটে দোকান ছিল ৫২টি। তবে নন্দীপাড়া থেকে ত্রিমোহনী সেতু পর্যন্ত ২২২টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছিল সেদিন। ঢাকা জেলা প্রশাসন ও ঢাকা ওয়াসার সহযোগিতায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পরিচালিত ওই উচ্ছেদ অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্বয়ং মেয়র সাঈদ খোকন।

জেলা পরিষদ মার্কেটের ৫২টি দোকান ছাড়াও মার্কেটের সামনে গড়ে ওঠা কাঁচাবাজারে ছিল ৪০টির মতো দোকান। জানা যায়, জেলা পরিষদ মার্কেটের কিছু প্রভাবশালী নেতার সহায়তায় মার্কেটের সামনে সড়কের ওপর এই কাঁচাবাজার তৈরি হয়েছিল। পাকা মার্কেট ও কাঁচাবাজারের কারণে শুধু খাল নয়, সড়কের ড্রেনেজ লাইনও বন্ধ হয়ে যেত এবং সামান্য বৃষ্টি হলেই এলাকার রাস্তাঘাটে জলাবদ্ধতা দেখা দিত।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আবদুল মালেক বলেন, নন্দীপাড়ায় খালের জায়গা দখল করে জেলা পরিষদের নামে মার্কেট করা হয়েছিল। আমরা তা উচ্ছেদ করে দিয়েছি। শুধু তাই নয়, ওই এলাকার আরও অনেক দখল উচ্ছেদ করা হয়েছে। উচ্ছেদের পর ইট, রড ইত্যাদি খাল থেকে অপসারণ করা হয়নি কেন জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ওই রকম কিছু থেকে থাকলে অচিরেই তা অপসারণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরেজমিনে নন্দীপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, খালের যেখানটায় জেলা পরিষদ মার্কেট ছিল সেখানেই বসে গেছে কিছু ছাপরা দোকান। রাস্তার বিপরীতে চালের দোকানি মোহাম্মদ রোমান জানান, উচ্ছেদের সময় ওই লোকগুলোই মার্কেটের সামনের অস্থায়ী দোকানে ব্যবসা করতেন। রোমানের সহযোগিতায় খুঁজে পাওয়া গেল জামাল ভাই ভাই বস্ত্রবিপণির আলী আকবরকে। উচ্ছেদ হওয়া এরশাদ মার্কেটে আকবরদের দুটি দোকান ছিল। একটিতে তারা তৈরি পোশাক এবং অন্যটিতে থান কাপড় বিক্রি করতেন। এখন বিপরীত দিকের একটি দোকান ভাড়া নিয়ে সেখানেই ব্যবসা করছেন। আকবর জানান, উচ্ছেদ হওয়া ওই মার্কেটের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী ছিলেন হতদরিদ্র। উচ্ছেদের পর ক্ষতিপূরণ না পেয়ে তাদের অনেকেই গ্রামে ফিরেছেন।

ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) মো. শাহিদুজ্জামান বলেন, উচ্ছেদের পর কেউ কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করেননি। অবশ্য ক্ষতিপূরণ দাবির কোনো সুযোগও নেই। কারণ ওখানকার ব্যবসায়ীরা সবাই ছিলেন অবৈধ দখলদার। ঢাকা জেলা পরিষদের সদস্য জামাল হোসেনও একই কথা বললেন। তিনি বলেন, নন্দীপাড়া থেকে ত্রিমোহনী বাজার পর্যন্ত এমন অনেক দখলদার মিলে খালটিকে মরণাপন্ন করে তুলেছিল। যেকোনো খালে জেলা পরিষদের আর কোনো স্থাপনার খবর পেলে, সেগুলো তিনি নিজ দায়িত্বে অপসারণের ব্যবস্থা করবেন।

নন্দীপাড়া থেকে ত্রিমোহনী পর্যন্ত খালটিকে এলাকাবাসী ত্রিমোহনী খাল নামে ডাকে। তবে নন্দীপাড়া থেকে ত্রিমোহনী বাজারে যাওয়ার পথে দাসেরকান্দি হাজীপাড়া এলাকায় বায়তুল মামুর মসজিদের কাছে ওয়াসার টানানো সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে এটিকে জিরানী খাল বলে লেখা রয়েছে। সায়েদাবাদ থেকে মুগদাপাড়া হয়ে ডেমরা এলাকার দিকে প্রবাহিত হওয়া খালটি একেক এলাকায় একেক নামে পরিচিত। খালটি দক্ষিণ মাণ্ডা এলাকায় মাণ্ডা খাল নামে পরিচিত। আবার উত্তর মাণ্ডা এলাকার দিকে যাওয়ার পর নাম হয়েছে জিরানী খাল। এটিই ডেমরার দিকে গিয়ে নাম হয়েছে দেবধোলাই খাল। রাজধানীর পূর্বাংশের এ জিরানী ও মাণ্ডা খালের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মেরাদিয়া-গজারিয়া, কসাইবাড়ি, শাহজাহানপুর, শাহজাদপুর, সুতিভোলা, ডুমনি, বোয়ালিয়া, রামপুরা, গোবিন্দপুর, খিলগাঁও-বাসাবো ও সেগুনবাগিচা খালও।

হাজীপাড়া এলাকার বাড়ির দুই মালিক আলমগীর হোসেন ও মমতাজউদ্দিন জানান, এক সময় এ খালটির শাখা-প্রশাখা ধরে নৌকায় কমলাপুর হয়ে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত যাওয়া যেত। তাদের দু'জনই এই এলাকায় জমি কিনে বাড়ি করেছেন বলে জানালেন। আলমগীরের বাড়িটি পাঁচতলা। মমতাজের দোতলা পর্যন্ত উঠেছে। তবে দু'জনকেই খুঁটির ওপর যার যার বাড়ি দাঁড় করাতে হয়েছে। খালে পানি বাড়লেই বাড়ির নিচে পানি থৈথৈ করে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখলেই বোঝা যায় ওটা খালের জমি। আলমগীর তার বাড়িতে যাওয়ার জন্য খালের ওপর স্টিলের ছোটখাটো একটা ব্রিজ তৈরি করে নিয়েছেন। মমতাজের বাড়িতে যাওয়ার সেতুটা বাঁশ দিয়ে তৈরি। তাদের দু'জনই নিজের জমি খালের বাইরে রয়েছে বলে দাবি করেন। আলমগীর হোসেন বলেন, ছাত্রজীবনে জমানো টাকা দিয়ে ২০০৩ সালে এখানকার দুই কাঠা জমি কিনেছিলেন। দাম পড়েছিল দুই লাখ টাকা। পরে দীর্ঘদিন সৌদি আরবে কাটিয়ে ফেরার পর পাঁচতলা বাড়িটি করেছেন। জাবেদ আলী নামে যার কাছ থেকে আলমগীর হোসেন জায়গাটি কিনেছিলেন, তিনি আর নেই।

মমতাজ উদ্দিন জানান, তিনি ১৯৮৯ সালে কবিরউদ্দিনের কাছ থেকে ৮ শতাংশ জমি কিনেছিলেন ১১ লাখ টাকায়। তিনি ৭ ফুট জায়গা ছেড়েই বাড়িটি তৈরি করেন। অবশ্য খালের বিভিন্ন স্থানের প্রশস্ততা বিভিন্ন রকম দাবি করে তিনি বলেন, কোথাও কোথাও খালের প্রশস্ততা ৫০ ফুট পর্যন্ত। কিন্তু তার বাড়ির সামনের প্রশস্ততা ৩০ ফুট। তার জায়গা থেকে আরও ৭ ফুট দূরে সরে মূল বাড়িটি তুলেছেন বলে তার দাবি।

তবে এ দুই বাড়ির মালিকের জমির উত্তরসূরিদের কাউকে খুঁজে পাওয়া গেল না। দেখা গেল খালের জমিতে এ রকম বেশকিছু বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে। এ ছাড়া আছে অসংখ্য টিনশেড ঘর। এসব অবকাঠামোর প্রত্যেকটিই দেখে মনে হয় খুঁটির ওপর ভর করে অবকাঠামোগুলো দাঁড়িয়ে আছে। যার নিচে এখনও কোথাও কোথাও কচুরিপানায় ভরা। এ কারণে যাতায়াতের জন্য কেউ কেউ তৈরি করে নিয়েছেন বাঁশের সাঁকো বা লোহার ব্রিজ। যদিও ত্রিমোহনী জোরভিটা এলাকায় ওয়াসার সাঁটানো এক পুরনো সাইনবোর্ডে খালের ওপর সাঁকো, ঘরবাড়ি, টয়লেট, দোকানপাট নির্মাণ না করার কঠোর ঘোষণা রয়েছে। 'দণ্ডনীয় অপরাধে'র হুমকির কথা বোঝা গেলেও দেখা যায় প্রায় প্রতিটি ভবনের স্যুয়ারেজ লাইনও খালের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া। সরেজমিন দেখা যায়, খালটি যেখানটায় গিয়ে বালু নদীতে মিলেছে, সেখানে এখনও কিছুটা পানির প্রবাহ রয়েছে। অবশ্য ত্রিমোহনীর তেরমুখ ব্রিজের নিচে বালু নদীর মরণদশা দেখা গেল। নন্দীপাড়া থেকে ত্রিমোহনী বাজার পর্যন্ত যেতে ছোট-বড় দখলদারের দৌরাত্ম্যের কোনো শেষ নেই। গত বছর ৬ ফেব্রুয়ারির উচ্ছেদ অভিযানে তাদের অনেকেই উচ্ছেদ হয়ে গেছে বলে এলাকাবাসী জানান। ২০১৬ সালে ওয়াসা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় মিলে ঢাকায় খালের জমি দখলদারদের যে তালিকা করেছিল, তার মধ্যে নন্দীপাড়া ও ত্রিমোহনীর মধ্যে ঢাকা জেলা পরিষদ, স্থানীয় জাতীয় পার্টি, জেলা পরিষদ মার্কেট মসজিদের সচিব, নবীয়াবাদ মসজিদ কমিটির সচিব, নন্দীপাড়া যুব সংঘ, নন্দীপাড়া ক্রীড়া সংসদ, নন্দীপাড়া মলিল্গকা ক্লাব, নন্দীপাড়া খালপাড়া পাঞ্জেখানা মসজিদ, মো. আলম, হাবিব উলল্গাহ, জাকির হোসেন, নোমান, পলাশ, বিল্লাল, হাবিবুর, মজিবুর, বাবু, ইদ্রিস আলী, ছালেহ আহম্মেদ, মালেক ভাণ্ডারী, ইয়াদ আলী, কবির উদ্দিন, হাফিজুর, ইউনুস মোলল্গা, সুজাত ভাণ্ডারী, হানিফ, হাসেম মেম্বার, শাহ আলম, টগর, খোকা, মাইন উদ্দিন, বাচ্চু, আবুল হোসেন, মো. টগর, মো. সাইদ, বাদশা, আকরাম, জাকির হোসেন, আমেনা, আলী আকবর, হুমায়ুন কবীর, ফায়েজুল হক, রহমান আলী, মনির হোসেন, খুরশেদ আলম, আবুল বারেক, আতাউর রহমান, জাহাঙ্গীর হোসেন, আবদুস সালাম, মাইদুল, হাফেজ হাওলাদার, আবুল কাসেম, মুসলেম, আবুল হাসেম হাছান, রইছ মিয়া, জমির আলী, কাদির, কবির, বিল্লাল হোসেন, আলমগীর হোসেন, মমতাজউদ্দিন, রিপন, আজিজ, নজরুল ইসলাম, মতি তালুকদার, মোহাম্মদ আলী, শাহাদাৎ হোসেন, হারেছ, শাহজাহান, সিদ্দিক মোল্লা, সফিকুল, আবু বকর, আবু সাঈদ, মোক্তার হোসেন, কুদ্দুস, মফিজুল, নাছির, মিছির আলী, আবদুল হক, মীর জাহাঙ্গীর হোসেন, মোশারফ, মোফাজুল হোসেন, নাছির রাসেল, আলেয়া বেগম, মহসিন, সাগর, মেজু, কাজল, গিয়াস উদ্দিন, এয়াকুব, জোহর আলী, চান মিয়া, আনোয়ার, আইয়ুব খান, ওমর আলী, ঝর্না বেগম, শাহজাহান, বসির মিয়া, কাসেম, মাইন উদ্দিন ও ছিদ্দিকের নাম রয়েছে।