প্রধানমন্ত্রীকে জাতিসংঘ মহাসচিবের ফোন

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পদক্ষেপের প্রশংসা

গুতেরেসকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ - মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়নে সহযোগিতা চান শেখ হাসিনা

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। গতকাল শুক্রবার রাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করেন গুতেরেস। এ সময় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়নে জাতিসংঘের সহযোগিতা চান শেখ হাসিনা। এ ছাড়া তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবকে বাংলাদেশ সফরেরও আমন্ত্রণ জানান। তাদের মধ্যে ১২ মিনিট কথা হয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান। এর আগে গত ২১ অক্টোবর রাতেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করেছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিব।

গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে সহিংসতার শিকার হয়ে এ পর্যন্ত প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। রাখাইন এখন কার্যত রোহিঙ্গাশূন্য। মিয়ানমারের সেনারা হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে অকল্পনীয় বর্বরতা চালিয়ে হত্যা করেছে। রোহিঙ্গাদের ওপর এই হত্যাযজ্ঞকে 'জাতিগত নিধনের উদাহরণ' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে জাতিসংঘ।

রোহিঙ্গা সংকটে জোরালো ভূমিকা নিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। জাতিসংঘের শরণার্থী, শিশু, মানবাধিকারসহ বিভিন্ন সংস্থা রোহিঙ্গাদের জন্য ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে।

রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর গুতেরেস নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ চেয়ে এক নজিরবিহীন চিঠি দেন। এরপর নিরাপত্তা পরিষদে এ নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হয়। চীন ও রাশিয়ার বিরোধিতার কারণে নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো প্রস্তাব পাস হয়নি, তবে নেপিদো প্রচণ্ড কূটনৈতিক চাপে পড়েছে। গুতেরেসও বহুবার রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সরব হয়েছেন। মিয়ানমারের সমালোচনাও করেছেন তিনি।

ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের সভায় বক্তৃতাকালে গুতেরেস বলেন, নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত প্রস্তাব শুধু তখনই অর্থবহ হতে পারে যখন তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়। মার্চের শেষের দিকে গুতেরেস বলেছেন, মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ বাসভূমিতে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে বৈঠকে গুতেরেস এ কথা বলেন।

রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন। এ সময় রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।

সমস্যা সমাধানে তিনি কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবও তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে মিয়ানমারে 'সেফ জোন' গঠন। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে আরও ছিল- কোনো শর্ত আরোপ ছাড়াই অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের ওপর সব ধরনের সহিংসতা ও জাতিগত নিধন স্থায়ীভাবে বন্ধ করা; অবিলম্বে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মহাসচিবের নিজস্ব একটি অনুসন্ধানী দল পাঠানো, সব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা; কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার নিঃশর্ত, পূর্ণ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন।

শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক চাপে চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চুক্তি স্বাক্ষর করে মিয়ানমার। চুক্তি অনুযায়ী, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আগামী দুই বছরের মধ্যে ফেরত নেওয়া শেষ হবে। প্রথম পর্যায়ে প্রতিদিন ৩০০ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে মিয়ানমার। তিন মাস পর এ সংখ্যা পর্যালোচনা করে বাড়ানো হবে। তবে এখন পর্যন্ত রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিপীড়ন বন্ধ হয়নি এবং রোহিঙ্গারা এখনও পালিয়ে আসছে। এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পুরো প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়ে সারাবিশ্বের অকুণ্ঠ প্রশংসা কুড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্যদিকে এক সময়ের নন্দিত মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি রোহিঙ্গা নিধনে নীরব থেকে সহযোগীর ভূমিকা পালন করে ধিকৃত হয়েছেন।