'আমার বাবা শাহজাহান বাচ্চু আজ মরে গেছে। আমাদের গ্রামে। বাবাকে কারা যেন দুইটা গুলি করে মেরে ফেলেছে।' লেখক, প্রকাশক ও বাম নেতা শাহজাহান বাচ্চুকে (৬৫) হত্যার পর তার মেয়ে দূর্বা জাহান ফেসবুকে এমন পোস্ট দেন। সেখানে অনেকে মন্তব্য করেছেন- এ খবর তারা বিশ্বাস করতে পারছেন না। হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অনেকে তার পরিবারকে ধৈর্য ধরতে পরামর্শ দেন।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানের কাকালদী এলাকায় শাহজাহানকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডের পরপরই ঘাতকরা মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়।

নিহত লেখক শাহজাহান বাচ্চু সিরাজদীখানের কাকালদী গ্রামের মরহুম মমতাজউদ্দিনের ছেলে। তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মুন্সীগঞ্জ জেলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ঢাকার বাংলাবাজার এলাকার 'বিশাকা প্রকাশনী'র স্বত্বাধিকারী ছিলেন তিনি। প্রকাশকের পাশাপাশি শাহজাহান বাচ্চু একজন লেখক, কবি, সাংবাদিক, ব্লগার ও সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মুন্সীগঞ্জ থেকে প্রকাশিত 'আমাদের বিক্রমপুর' নামে পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকও ছিলেন শাহজাহান। তার বেশ কয়েকটি কবিতার বই রয়েছে। কে বা কারা এবং কী কারণে গুলি করে হত্যা করেছে তাকে, তা  তাৎক্ষণিক পুলিশ ও পরিবার জানাতে পারেনি। হত্যার কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তবে প্রাথমিক আলামত দেখে পুলিশের ধারণা- এ হামলার সঙ্গে জঙ্গিরা জড়িত থাকতে পারে। এরই মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) ও বোমা নিষ্ফ্ক্রিয়করণ দলের সদস্যরা ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধার করেছে। এ ধরনের ডিভাইস সাধারণত উগ্রপন্থিরা ব্যবহার করে বলে জানায় পুলিশ। তাই তাদের প্রাথমিক অনুমান, এটি জঙ্গি হামলা। তবে শতভাগ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত হামলার অন্য উদ্দেশ্যও উড়িয়ে দিচ্ছে না পুলিশ। সংশ্নিষ্ট একাধিক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা গতকাল রাতে সমকালকে এসব তথ্য জানান।

নিহত শাহজাহানের দুই স্ত্রী, এক ছেলে ও তিন মেয়ে। প্রথম স্ত্রী লুৎফা আক্তার কাননী নারায়ণগঞ্জে সমাজসেবা অফিসে কর্মরত। তিনি সেখানে বসবাস করেন। তার দুই মেয়ের মধ্যে বিপাশা বিবাহিত ও আরেক মেয়ে দূর্বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্রী। দ্বিতীয় স্ত্রী আফসানা বেগমের মেয়ে শাম্মী জাহান আঁচল ও ছেলে বিশাল জাহান। আফসানা গ্রামে থাকেন। শাহজাহান কখনও ঢাকা ও আবার কখনও মুন্সীগঞ্জে থাকতেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পূর্ব কাকালদী (মুন্সীগঞ্জ-শ্রীনগর সড়কের) তিন রাস্তার মোড়ে আনোয়ার হোসেনের ফার্মেসির সামনে বসে কথা বলছিলেন শাহজাহান বাচ্চু। এ সময় দুটি মোটরসাইকেলে চার ব্যক্তি এসে তাকে জোর করে টেনেহিঁচড়ে দোকানের বাইরে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে তিনজন হেলমেট পরিহিত ছিল। এ সময় অন্যদের তারা সরে যেতে বলে। এর পরই হাত বোমা ফাটিয়ে আতঙ্ক তৈরি করে মোটরসাইকেল আরোহীরা। এক পর্যায়ে শাহজাহান বাচ্চুকে কাছ তার বুকের ডান পাশে একটি গুলি করে। ঘটনার সময় সিরাজদীখান থানার এএসআই মাসুম ওই রাস্তা দিয়ে মুন্সীগঞ্জ থেকে থানার দিকে যাচ্ছিলেন।

বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ সমকালকে বলেন, বিশাকা থেকে কবিতার বই বেশি বের হতো। অনেক দিন ধরে বিকাশার কর্ণধার শাহজাহানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ নেই। তিনি এই সংগঠনের সদস্য নন।

শাহজানের ঘনিষ্ঠ কবি মুজিব রহমান জানান, শাহজাহান তাকে বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন মৌলবাদীদের হিটলিস্টে তার নাম রয়েছে। এ থেকে তার ধারণা, উগ্রবাদীরা তাকে খুন করেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী এএসআই মাসুম সমকালকে জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই একটি বিকট আওয়াজ পান, সামনে এসে দেখেন একটি লোক পড়ে আছে। প্রথম ভাবছিলেন বিদ্যুতের তারে সমস্যা হয়েছে কি-না। পাশের রাস্তা থেকে তাকে উদ্দেশ করে বলছে, 'শালাকেও গুলি কর।' এমন সময় একজন ব্যাগ থেকে একটি ককটেল ছুড়ে তার দিকে দৌড়ে আসে। মাসুম পিস্তল বের করতেই আরেকজন তাকে উদ্দেশ্য করে গুলি ছোড়ে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি বসে গুলি করার চেষ্টা করলে বিপরীত রাস্তা ধরে চার দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়।

জানা গেছে, ঘটনার পরপরই সিসিটিসির সদস্যরা মুন্সীগঞ্জে যান। ঘটনাস্থলে বিস্ম্ফোরিত বোমার আলামত দেখে পুলিশের ধারণা, এর সঙ্গে উগ্রপন্থিরা সম্পৃক্ত থাকতে পারে। ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

সিরাজদীখান থানার ওসি মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ঘটনার পর থেকে ঘটনাস্থলে অবস্থান করে হত্যাকাণ্ডের কারণ উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। তবে কী কারণে এবং কারা তাকে গুলি করে হত্যা করেছে, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে লাশ।

ফেসবুকে আকাশ ইকবাল নামে একজন পোস্ট দেন- 'শাহজাহান বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় তিন বছরের। তিনি অসাধারণ একজন লেখক ও মানুষ। আজ কে বা কারা তাকে গুলি করে হত্যা করেছে। অথচ তিনি আমাকে সব সময় সাবধান করতেন। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে কখনও ভাবেননি।'

ফেসবুকে সিদ্ধার্থ তপু নামে একজন লেখেন- 'শাহজাহান কোরআন ও হাদিদের বিজ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করতেন। এটাই তার অপরাধ ছিল। এসব নিয়ে মৌলবাদীদের হুমকি-ধমকির পরে একজন ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী বেশ কিছু দিন তার পাশে রাখতে বাধ্য হন তিনি।'

জানা গেছে, শাহজাহানের প্রকাশনা সংস্থা থেকে নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহার মতো প্রখ্যাত কবিদের কাব্যগ্রন্থ বের হতো। প্রকাশক হিসেবে সজ্জন ছিলেন বাচ্চু। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি জাপানে ছিলেন। এরপর দেশে ফিরে প্রকাশনা সংস্থা খোলেন। এখন পর্যন্ত তার প্রকাশনা সংস্থা থেকে ছয় শতাধিক বই বেরিয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে তিনি ফেসবুকে সক্রিয় হন। ২০১৩ সালে দেশে ব্লগার হত্যা শুরু হলে ফেসবুকে এর নিন্দা জানান তিনি। বিভিন্ন সময় তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে।

২০১৩ সাল থেকে শুরু করে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় উগ্রপন্থি জঙ্গিদের হাতে একের পর এক ব্লগার, মুক্তমনা লেখক ও অনলাইনে সক্রিয় ভিন্নমতের বেশ কয়েকজন হত্যার শিকার হন। এর মধ্যে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় খুন হন বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়। একই বছরের অক্টোবরে শাহবাগের আজিজ মার্কেটে নিজের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে জঙ্গিরা খুন করে জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ফয়সল আরেফিন দীপনকে। একই দিন লালমাটিয়ায় নিজের কার্যালয়ে ঢুকে জঙ্গিরা প্রকাশনা সংস্থা শুদ্ধস্বরের স্বত্বাধিকারী আহমেদুর রশীদ টুটুলকে হত্যাচেষ্টা চালায়। একইভাবে ব্লগার নীলাদ্রি নিলয়, অনন্ত বিজয় দাশ ও ওয়াশিকুর বাবুকে একই কায়দায় কুপিয়ে হত্যা করে জঙ্গিরা। একের পর এক এমন টার্গেট কিলিংয়ের পর দেশজুড়ে সক্রিয় হয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিভিন্ন অভিযানে নিহত হতে থাকে জঙ্গিরা। অনেক দুর্ধর্ষ জঙ্গি ধরাও পড়ে। তবে প্রকাশক দীপন হত্যার তিন বছরের মাথায় আরেক প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চু প্রায় একই কায়দায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন। এর আগেও বিভিন্ন জায়গায় এই আদলে টার্গেট করা ব্যক্তিকে হত্যা করেছে নব্য জেএমবি।

মন্তব্য করুন