বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২ শিক্ষার্থী রিমান্ডে

গ্রেফতার আরও ৩

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০১৮      

সমকাল প্রতিবেদক

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নয় দিনব্যাপী আন্দোলনের সময় রাজপথে গাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও অন্যান্য সহিংসতার ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় আরও ছয়টি মামলা হয়েছে। এ নিয়ে সহিংসতায় মোট ৩৩টি মামলা হলো। নতুন ছয়টি মামলা সোমবারের সহিংসতার ঘটনায় হয়েছে। এসব মামলায় আসামিদের সংখ্যা বলা না থাকলেও বাড্ডা থানা পুলিশ ১৪ ও ভাটারা থানা পুলিশ আটজনকে গ্রেফতার করেছে। তারা সবাই বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পুলিশ তাদের আদালতে হাজির করে প্রত্যেককে দুই দিন করে রিমান্ডে নিয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন মামলায় মোট গ্রেফতারের সংখ্যা দাঁড়াল ৪১ জন।

অবশ্য পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, মামলাগুলোতে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করা স্কুল-কলেজের কোনো শিক্ষার্থীকে আসামি করা হয়নি। যারা হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরে অংশ নিয়েছে, নেপথ্যে উস্কানি দিয়েছে- তদন্ত করে তাদেরই আইনের আওতায় নেওয়া হবে।

পুলিশ জানায়, নিরাপদ সড়কের ৯ দফা দাবি সরকার মেনে নিলেও সোমবার রাজধানীর আফতাবনগরে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের একটি দল ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এআইইউবি ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। শাহবাগ এলাকায়ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থীর সঙ্গে এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে আহ্‌ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থীর সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাংচুর করা হয়। এতে মামলা হয়েছে বাড্ডা, ভাটারা, শাহবাগ ও শিল্পাঞ্চল থানায়।

বাড্ডা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জানান, পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাংচুর, জননিরাপত্তা বিঘ্ন ও পুলিশের কর্তব্য পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। অপরাধ সংঘটনের সময় ঘটনাস্থল থেকে হাতেনাতে ১৪ জনকে আটক করা হয়।

ভাটারা থানার ওসি এস এম কামরুজ্জামান বলেন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে আটক আটজনের নামে মামলা হয়েছে। শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান জানান, শাহবাগে সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে।

গত ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে বাসের ধাক্কায় নিহত হয় দুই শিক্ষার্থী। ওই দিন থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। পরের দিন থেকে ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে। তারা নিরাপদ সড়কের জন্য ৯ দফা দাবি জানিয়ে আসছে। এর মধ্যেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ভাংচুর করা হয় তিন শতাধিক গাড়ি।

রিমান্ডে ২২ শিক্ষার্থী :বাড্ডা থানা ও ভাটারা থানার মামলায় ২২ শিক্ষার্থীকে পুলিশ গতকাল আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের সাত দিন করে রিমান্ড আবেদন করে। শুনানি শেষে আদালত তাদের দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আদালতে তোলার সময়ে শিক্ষার্থীদের হাতকড়ার সঙ্গে রশি বাঁধা ছিল। তারা তাদের স্বজনদের দেখে এজলাসে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

শিক্ষার্থীদের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেন, পুলিশ তাদের নির্যাতন করেছে। ক্লাস শেষে বাসায় ফেরার পথে কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। এই শিক্ষার্থীরা অপরাধী নয়। সামনে তাদের পরীক্ষা রয়েছে। এজন্য তাদের জামিন দেওয়া প্রয়োজন।

তবে বাড্ডা থানার মামলায় পুলিশ আদালতে বলেছে, গ্রেফতার আসামিরা ওসির গাড়ি ভাংচুর করে ও বাড্ডা পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন দেওয়ার চেষ্টা চালায়। এ ঘটনার ইন্ধনদাতাদের খুঁজে বের করতে তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।

অন্যদিকে ভাটারা থানার মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা এসআই হাসান মাসুদ আদালতে বলেন, আসামিরা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার অ্যাপোলো হাসপাতাল ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় লোহার রড, লোহার পাইপ ও ইট দিয়ে পুলিশের ওপর হামলা করে। পলাতক আসামিরা জঙ্গি গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য। তাদের অবস্থান চিহ্নিত করে গ্রেফতারের জন্য আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।

আরও ৩ জন গ্রেফতার :এদিকে সাইবার স্পেস ব্যবহার করে গুজব সৃষ্টির অভিযোগে আইসিটি অ্যাক্টের মামলায় আরও তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল রাতে গ্রেফতার করা হলেও আসামিদের নাম জানা যায়নি।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, গ্রেফতার তিনজনের মধ্যে 'তারেক জিয়া সাইবার পোস্ট' ও 'বাঁশের কেল্লা' নামের ফেসবুক পেইজের একজন করে অ্যাডমিন রয়েছেন। অপরজন ইউটিউবে গুজব ছড়ান।

৫৭ ধারায় মামলা, বিভিন্ন স্থানে গ্রেফতার আরও ৭ :এদিকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে ফেসবুকে শিক্ষার্থীদের উস্কে দেওয়ার অভিযোগে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য করায় চট্টগ্রাম, বরিশাল ও সিরাজগঞ্জে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার মামলা হয়েছে। এসব মামলায় শিক্ষার্থী, আইনজীবী ও কলেজ কর্মকর্তাসহ সাতজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:

চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার পুলিশ জানায়, কোতোয়ালি থানায় ছাত্র ফেডারেশন চট্টগ্রাম নগর কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মারুফ হোসেন, রাজনৈতিক শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক আজিউর রহমান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিদ্যা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইমদাদুর হক আশিক ও মেট্রোপলিটন সায়েন্স কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল্লাহ আল শাহেদকে ৫৭ ধারায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

বরিশালের বানারীপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. খলিলুর রহমান জানান, ৫৭ ধারায় মামলায় বাইশারী সৈয়দ বজলুল হক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের হিসাবরক্ষক মিজান মজুমদারকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

রাজশাহীর পবা থানার ওসি এসএম মাসুদ পারভেজ জানান, ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য করায় মাহাবুব আলম নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এ ছাড়া গত সোমবার মধ্য রাতে সিরাজগঞ্জ শহরের মাহমুদপুর মহল্লার ওপেল গার্ডেনের বাসা থেকে সাখাওয়াত হোসেন শাকিল নামে এক আইনজীবীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।