ভারতে গ্রেফতার বোমা মিজান

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০১৮      

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা কলকাতা প্রতিনিধি

কারাগারে বসেই ময়মনসিংহের ত্রিশালে ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রিজনভ্যানে হামলা চালিয়ে জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিল মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজান ওরফে মুন্না ওরফে কাওসার। পরিকল্পনা অনুযায়ী সংগঠনের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়ে পুলিশকে হত্যা করে বোমা মিজানসহ তিনজনকে ছিনিয়ে নেয়। এর পরই বোমা মিজান ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী সালাউদ্দিন সালেহীন ওরফে সানি ভারতে পালিয়ে যায়। তাদের ধরিয়ে দিতে পুলিশ সদর দপ্তর ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে।

২০১৪ সালের ২ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের খাগড়াগড়ে বিস্ম্ফোরণের পর বোমা মিজানের নাম আবার আলোচনায় আসে। সর্বশেষ চলতি বছরে বুদ্ধগয়ায় হামলার পর বোমা মিজানকে গ্রেফতারের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালায় গোয়েন্দারা। শেষ পর্যন্ত ত্রিশালে প্রিজনভ্যানে হামলার চার বছর পর নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা'আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) পুরনো শাখার শীর্ষ নেতা বোমা মিজান ভারতে গ্রেফতার হলো। ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) শনিবার কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী বেঙ্গালুরুর রামনগর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করেছে। এরই মধ্যে গ্রেফতারের বিষয়টি বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের ডিসি মহিবুল ইসলাম সমকালকে বলেন, জেএমবির শীর্ষ নেতা বোমা মিজানের গ্রেফতারের বিষয়টি আমরা জেনেছি। কীভাবে তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরত আনা যায় সেটা নিয়ে এখন কাজ শুরু হবে।

জানা গেছে, ভারতের বুদ্ধগয়ায় এ বছরের শুরুর দিকে দালাইলামার সফরের সময় যে ধারাবাহিক বিস্ম্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে তার নেপথ্যে ছিল বোমা মিজান। এর আগে খাগড়াগড়ে সে কাওসার নামে বাসা ভাড়া নিয়েছিল। পরে জানা যায়, বাংলাদেশের এই নাগরিকের নাম মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজান। এনআইএ বোমা মিজানকে ধরিয়ে দিতে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে।

খাগড়াগড়ের বাবুর বাগান এলাকাতে কাওসার নামে পরিচয় দিয়ে থাকত শীর্ষ ওই জেএমবি নেতা। ২০১৪ সালের ২ অক্টোবরে খাগড়াগড়ে জেএমবির দুই জঙ্গির মৃত্যু হয়। তখন জানা যায় ওই বাড়ি ছিল জেএমবির আস্তানা। বিস্ম্ফোরণের পরেই বোমা মিজান গা ঢাকা দেয়। কলকাতা পুলিশের এসটিএফ এবং এনআইএ গোয়েন্দারা দাবি করেছিলেন, একাধিকবার বোমা মিজান ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে গোয়েন্দাদের জাল ছিন্ন করে বেরিয়ে যায়। ভারতীয় তদন্তকারীদের দাবি, সে এই সময়ে কয়েকবার বাংলাদেশে এলেও মূলত ভারতেই গা ঢাকা দিয়ে ছিল। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় সে ঘাঁটি তৈরি করে।

দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন শ্রমিক কলোনি থেকে নিয়মিত পশ্চিমবঙ্গে মালদহ ও মুর্শিদাবাদে যেত বোমা মিজান। সেখানে আবার সংগঠন তৈরি করার চেষ্টা করে সে। সেই সংগঠন নিয়েই বুদ্ধগয়ায় দালাইলামার সফরের সময় হামলার ছক করে। সেখানে ব্যবহার করা হয় এ রাজ্য থেকে নতুন রিক্রুট করা সদস্যদের। মিয়ানমারে বৌদ্ধদের দ্বারা রোহিঙ্গা হত্যার প্রতিশোধ নিতে বুদ্ধগয়ায় বিস্ম্ফোরণ ঘটানো হয়। তবে ২০১৪ সালে প্রিজনভ্যানে হামলার পর বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি হামলায় সোহেল মাহফুজের জড়িত থাকার প্রমাণ পায়নি পুলিশ। সে ভারতে বসেই সংগঠনকে শক্তিশালী করার অপচেষ্টা চালাচ্ছিল।

এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে ২০১৪ সালের অক্টোবরে বিস্ম্ফোরণের হোতা বোমা মিজান। বোমা মিজানকে গ্রেফতারের দুই দিন আগে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম থেকে গ্রেফতার করা হয় আবদুল করিম ওরফে ছোটা ও মুস্তাফিজুর রহমান ওরফে শাহীন ওরফে তুহিন নামে দুই জঙ্গিকে। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হয় বোমা মিজানকে। তাকে বেঙ্গালুরু থেকে ট্রানজিট রিমান্ডে আনা হচ্ছে কলকাতায়। খাগড়াগড় বিস্ম্ফোরণে বোমা মিজান, ছোটা ও তুহিন জড়িত ছিল।

গোয়েন্দাদের দাবি, বোমা মিজান গ্রেফতার হওয়ায় জেএমবিকে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া সম্ভব। ইতিমধ্যে সংগঠনের অন্যতম প্রধান নেতা সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা নাসিরুল্লাকে গোয়েন্দারা গ্রেফতার করেছে। তার বিরুদ্ধেও খাগড়াগড় বিস্ম্ফোরণ মামলায় চার্জশিট দিয়েছে এনআইএ। বোমা মিজানের গ্রেফতারের পর সংগঠনের শীর্ষ নেতা বলতে বাকি রইল সালাউদ্দিন সালেহীন। সেও ভারতের কোথাও লুকিয়ে আছে বলে ধারণা গোয়েন্দাদের।