হৃদয় জিতে ফিরেছে টাইগাররা

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

ক্রীড়া প্রতিবেদক

হৃদয় জিতে ফিরেছে টাইগাররা

ফাইল ছবি

রাত ১০টা বাজতেই লোকেলোকারণ্য শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ১১টায় টাইগারদের বহনকারী বিমান অবতরণের খবরে যেন হুড়োহুড়ি পড়ে গেল গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে ঠিক রাত সাড়ে ১১টায় গণমাধ্যমের মুখোমুখি হলেন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা ও কোচ স্টিভ রোডস। দুবাইয়ের ফাইনালে শেষ বলে ভারতের কাছে হেরে যাওয়ার হতাশাটা দু'জনের চেহারাতেই ছিল স্পষ্ট। তবে দু'জনেই জানিয়েছেন, দলের পারফরম্যান্সে তারা খুশি। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও যেভাবে এশিয়া কাপে বাংলাদেশ লড়াই করেছে তাতে কোচ-অধিনায়ক সন্তুষ্ট।

মাশরাফির মতে, এবারের এশিয়া কাপে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন লড়াই করার অদম্য মানসিকতা, সাকিব-তামিম ছাড়া আমরা যে লড়াইটা করেছি সেটা অনেক বড় ব্যাপার। তারা খেললে হয়তোবা ফলাফল অন্যরকম হতেও পারত, আবার নাও হতে পারত। তবে যারা খেলেছে তাদের মধ্যে স্পিরিটটা ছিল দুর্দান্ত। ব্যস্তসূচির কারণে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়াই অনেক ম্যাচ খেলতে হয়েছে। প্রচণ্ড গরম ছিল। ছিল ইনজুরি। হারি-জিতি যাই হোক, একজন না একজন প্রতিনিয়তই ইনজুরিতে পড়েছে। সেগুলো নিয়ে চিন্তা করতে হয়েছে। তাই শিরোপা জিততে না পারলেও দলের পারফরম্যান্সে আমি খুশি। তারপরও এভাবে তীরে এসে বঞ্চিত হওয়ার হতাশা কি কাজ করছে না? দলের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্টির কথা বললেও ফাইনালে হারের হতাশাটা গোপন করেননি মাশরাফি, 'ফাইনালে হারায় হতাশা তো আছেই। ফাইনালে আমরা যেভাবে শুরু করেছিলাম তাতে স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারলেই ২৭০-২৮০ করতে পারতাম। কিন্তু প্রতি ম্যাচে যে মিডল অর্ডার হাল ধরেছে, তারাই এ দিন ব্যর্থ হলো। এরপরও আমাদের কিছু চিন্তা দূর হয়েছে এ টুর্নামেন্টে। মিঠুন দুটি চমৎকার ইনিংস খেলেছে। লিটন তো ফাইনালে অসাধারণ ব্যাটিং করেছে। আর বোলাররা পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফর্ম করেছে।'

মাশরাফি সবচেয়ে মুগ্ধ দলের লড়াকু মানসিকতায়। ভবিষ্যতে সেটা ধরে রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তিনি, 'ফাইনাল জিততে পারিনি বলে আমি হতাশ নই। তবে হতাশ হব তখন যদি ভবিষ্যতে দেখি যে ছেলেদের মধ্যে এই স্পিরিটটা নেই। তাদের মধ্যে যদি এভাবে শতভাগ উজাড় করে দেওয়ার মানসিকতা না দেখি, তখন হতাশ হব।'

কোচ স্টিভ রোডসও দলের পারফরম্যান্সে খুশি, 'ফাইনালে হারের হতাশা তো থাকবেই। এটা খুবই স্বাভাবিক। তবে পুরো টুর্নামেন্টের দিকে তাকালে দলের পারফরম্যান্সে আমি খুশি। পাকিস্তান, শ্রীলংকার মতো দলকে হারিয়ে আমরা ফাইনালে উঠেছি। এটা অবশ্য বড় অর্জন। প্রচণ্ড গরম, ইনজুরির সঙ্গে আমাদের প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়েছে। এরপরও মিঠুন যেভাবে টুর্নামেন্টে ব্যাটিং করেছে সেটা আমাদের বেশ স্বস্তি দিয়েছে। আর ফাইনালে লিটন যে ব্যাটিং করেছে সেটা আসলে দুর্দান্ত। তাই সার্বিকভাবে আমি খুশি।' ফাইনালে সেঞ্চুরি করা লিটন দাসের আউটের প্রসঙ্গও গতকাল উঠেছিল। কোচ এখানে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত মেনে সামনের দিকে তাকানোর পরামর্শ দিয়েছেন, ম্যাচ শেষে আমরা আউটটি নিয়ে ম্যাচ রেফারির সঙ্গে কথা বলেছি। স্টাম্পিংয়ের সিদ্ধান্তটি খুবই ক্লোজ ছিল। 'অন দ্য লাইন' হলে আউট। তাদের কাছে মনে হয়েছে এটা আউট। তবে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত যাই হোক সেটা মেনে নিয়ে সামনের দিকে এগোতে হবে। তবে লিটন এভাবে আউট না হলে নিশ্চিতভাবেই আরও কিছু রান হতো।

আর শিরোপা জিততে না পারলেও বাংলাদেশ তো পুরো ক্রিকেট বিশ্বের হৃদয় জিতে নিয়েছে এবারের এশিয়া কাপে। পাকিস্তান, শ্রীলংকার মতো দলকে বাংলাদেশ আগেও হারিয়েছে। এশিয়া কাপ, ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালও বাংলাদেশ আগেই খেলেছে। সেসব ফাইনালে আবার শেষ বলে হেরে যাওয়ার যন্ত্রণাও পুরনো। তাহলে এতসব অতীত-পুনরাবৃত্তির এশিয়া কাপ থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি কী? ভারতের কাছে ফাইনালে স্বপ্নের সমাধিতে যে ক্ষত আরও তীব্র হলো, তার প্রলেপ হওয়ার মতো কী আছে, আর যে রানার্সআপের একই অর্জন আগেও দু'বার আছে, তাতে 'উচ্চ তবু শির'ই বা বলা যায় কীভাবে?

উত্তর দেওয়ার পালায় পাল্টা কিছু প্রশ্ন পরখ করে দেখা যাক। পঞ্চ স্তম্ভ (মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহ) মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো বাংলাদেশ দল এর আগে কবে এমন দুটো স্তম্ভ (সাকিব, তামিম) ছাড়া টানা সাফল্য পেয়েছে? ঘণ্টা পনেরোর ব্যবধানে দুটি ম্যাচ, চার দিনের মধ্যে তিন কিংবা নয় দিনের মধ্যে পাঁচ ম্যাচ এশিয়া কাপে আর খেলেছেই বা কোন দল? ৪১ ডিগ্রি বা তার ঊর্ধ্ব তাপমাত্রার মধ্যে খেলে দুবাই টু আবুধাবি, আবুধাবি টু দুবাই যাতায়াত করতে করতে শরীরের শক্তি এতটা নিংড়ে গেছে আর কোন দলের? অধিনায়ক আর মিডল অর্ডারের মূল ব্যাটসম্যানের তীব্র চোটসহ দলের অর্ধেকেরই বেশি জর্জরিত হয়ে ছোটখাটো 'হসপিটাল কক্ষ' হয়েছিল আর কোন দলের ড্রেসিংরুমে? কন্ডিশন, আবহাওয়া, চোট আর ঠাসাঠাসি সূচির বেড়াজালে আটকে পড়ার প্রতিকূলতা ঠেলে ফাইনালে ওঠা, অতঃপর প্রতিপক্ষকে ২২৩ রানের লক্ষ্য দিয়ে ৩০০তম বলটি পর্যন্ত খেলতে বাধ্য করা- এ কি শুধু ক্রিকেটীয় সামর্থ্য আর গায়ের জোরেই সম্ভব ছিল? উত্তরগুলো যদি 'না' হয় তবে শুরুর ওই 'প্রাপ্তি' 'প্রলেপ' আর 'উচ্চ শিরে'র জবাবও এতক্ষণে পেয়ে যাওয়ার কথা। বাংলাদেশ বিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত পাকিস্তানি ধারাভাষ্যকার রমিজ রাজা তো রীতিমতো মুগ্ধ বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফিকে নিয়ে। ফাইনাল শেষে টিভি ধারাভাষ্যের বিশ্নেষণে বললেন, 'আমার দৃষ্টিতে এশিয়া কাপের সেরা অধিনায়ক মাশরাফি। ভারতের সঙ্গে সমানে সমান লড়াই করে দেখিয়েছেন।'